প্রকাশিত: ১৬ মে, ২০২৬ ২২:৫৩
শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের বড়মোহা গ্রামের দরিদ্র কৃষক লুৎফুর রহমান। উপজেলার শংকাই হাওরে ৯ বিঘা জমি চাষ করেছিলেন তিনি। জমিতে ধান পাকলেও একমুষ্টি ধানও কাটতে পারেননি এই বর্গাচাষি। রোপণকৃত সব ধান তলিয়ে গিয়েছে জলাবদ্ধতার পানিতে। জমিতে এখন ঠাঁইহীন পানি। চোখের সামনেই সব তলিয়ে গিয়েছে লুৎফুর রহমানের। কথা ছিলো ধান তুলে ৩০ হাজার টাকা ধানী ও ১০ হাজার টাকার সাধারণ ঋণ পরিশোধ করবেন । কিন্ত সব হারিয়ে দিশেহারা দ্ররিদ্র লুৎফুর। ছয় জনের সংসারে সারা বছরের খোরাকি নাই, কিন্তু ৪০ হাজার টাকা ঋণের বোঝা মাথায়। সেজন্য এবছর তার সংসারে ঈদ আসবে এমন চিন্তাই যেনো বিলাসিতা।
একই অবস্থা জয়কলস ইউনিয়নের আস্তমা গ্রামের বাসিন্দা ও দেখার হাওরের কৃষক হাফিজুর রহমানের। তার সংসারে সদস্য সংখ্যা ৬ জন। হাওরে প্রায় ১২ বিঘা জমি চাষ করেছিলেন তিনি। এর মধ্য থেকে প্রায় ৭ বিঘা জমির ধান কেটে এনেছিলেন এই কৃষক। সেই ধান ভালোভাবে শুকাতে না পারায় পুরো ধানে চারা গজিয়ে নষ্ট হয়েছে। রং বদলে হয়েছে কালচে। বাকী প্রায় ৫ বিঘা ধান পানিতে তলিয়েছে চোখের সামনে। মাথা সমান পানিতে কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি ধান কেটে আনা। যে ৭ বিঘা জমি তিনি তুলেছেন সেই জমি থেকে প্রাপ্য প্রায় ১০০ মণ ধানের মধ্যে ৭০ মণে বর্গার ঋণ ও ধানী ঋণের পরিশোধ করেছেন। ৩০ মণ ধান তার বছরের খোরাকী। যা তার সংসারের জন্য একেবারেই অপ্রতুল। পানিতে ভিজে থাকার কারণে এই ধান দেখতে কালো হয়েছে। হয়নি স্বাস্থ্যবানও। বিক্রি করতে গেলে এসব ধানের দাম কম হবে। সব দিকে এবছর ক্ষতি হয়েছে।
দিনমজুর এই কৃষক জানিয়েছে, ঈদের আগে কিছু কাজ যদি পাই সন্তানদের নতুন জামা কিনে দেওয়ার চিন্তা করবো, নতুবা ঘরের ধান যাই আছে তা বেচতে হবে। সন্তানদের মন তো আর খারাপ করা যাবে না, আমরা খাই বা না খাই?
এমন গল্প শুধু দেখার হাওরের কৃষক হাফিজুর রহমান কিংবা শংকাই হাওরের লুৎফুর রহমানেরই নয়। উপজেলার জামখলা, রাঙামাটি, পুটিয়া, নাগডরা, কাঁচিভাঙা ও পাখিমারাসহ প্রায় সব হাওরের শত শত কৃষকের বুক ভাঙার গল্প এমন। তাদের বেশিরভাগের ঘরেই এবছর ঈদের আনন্দ আসবে না। অনেক পরিবারে ঈদের দিন থাকবে দীর্ঘশ্বাস আর মনমরা মুখের ছবি। যে ধান বিক্রি করে কৃষকরা আনন্দ ফুর্তি করার কথা, যে ধান বেচে বাজার থেকে নতুন পোষাক কিনার কথা সেই ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবারের ঈদ হবে নিরানন্দ।
এদিকে সাঁতারে জিরিয়ে নেওয়ার মতো যে ঘটনা ঘটেছে তাতেও আছে বিপত্তি। বৈরি আবহাওয়া ডিঙিয়ে যেসব ধান কৃষকরা তুলে এনেছিলেন, শুকানোর অভাবে সেসব ধানও স্তুপে থাকায় চারা গজিয়েছে। ভিতরে ফোকলা হয়েছে। কালো রং ধারণ করে ধানের প্রকৃত মান নষ্ট করেছে। যা বাজারে বিক্রির প্রায় অনুপযোগী, খেতেও স্বাদ হবে না। ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, এসব ধান মান খুবই নিম্নমানের হবে। চাল খাওয়া যাবে না। মাছের খাদ্য তৈরিতে ব্যবহার করতে হবে। খুঁদের মত হবে।
শান্তিগঞ্জ কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ১৯ হাজার ১৪ একর জমির ধান পানিতে তলিয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। তবে হাওরের প্রায় ৯০% ধান কাটা হয়েছে। লাগতার বৃষ্টিতে কিছু ধান নষ্ট হয়েছে। যেসব কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের সহযোগিতা করতে ইতোমধ্যে কাজ করছে সরকার।
পাগলা বাজারের চাল ব্যবসায়ী শিবুল মিয়া বলেন, ধান খুবই কালো রঙের হয়েছে। অনেক ধানে চারা গজিয়েছে। এসব ধানের চাল বিক্রয় উপযোগী নয়। মাছের খাদ্য তৈরির জন্য এগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো মানুষ খেতে পারবে না। বিকল্প চিন্তা করতে হবে। ধানকে ২ ভাগে ভাগ করতে হবে। পানিতে যেসব ধান নষ্ট হয়েছে সেই ধানগুলো আলাদা করতে হবে। ভালো ধান আলাদা করতে হবে।
পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের বিএনপির প্রবীণ নেতা ও কৃষক নূর মিয়া বলেন, আমাদের জেলার আবহাওয়া ও জলবায়ু গত কয়েক বছর ধরে এভাবেই যাচ্ছে। তাই দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। বাঁধ নির্মাণে বৈজ্ঞানিক চিন্তা মাথায় রাখতে হবে। হাওরে পানি আটকানোর চিন্তার পাশাপাশি হাওর থেকে পানি বের করে দেওয়ার বিষয়টিও নকশায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ধান শুকানোর জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে অন্তত একটি করে ড্রায়ার মেশিন রাখতে হবে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবীব বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলমান। সবাইকে কৃষি কার্ডের আওতায় আনা হবে। ড্রায়ার মেশিন সম্পর্কে আমরা বার বার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠাচ্ছি। আশাকরছি আগামী বছর এর একটি সুফল আমরা পাবো।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন