হিমালয়ে ভূমিধসে ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, নিহত ছাড়াল ৫৫০

প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট, ২০২৬ ০০:০১

হিমালয়ে ভূমিধসে অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে রেডক্রস। একইসঙ্গে ত্রাণ কর্মকর্তারা নতুন করে বন্যার আশঙ্কা করছেন। গত বুধবারের বন্যা ও ভূমিধসের কারণে নেপাল ও তিব্বতে নিহতের সংখ্যা এরইমধ্যে ৫৬২ জনের দাঁড়িয়েছে। তাদের মধ্যে ৫ জন তিব্বতের। স্থানীয় ও বিদেশি মিলিয়ে নিখোঁজ আছে সহস্রাধিক মানুষ। 

 


শুক্রবার আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিগুলোর ফেডারেশনের প্রতিনিধি দলের প্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘আমাদের ধারণা, অন্তত ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের ব্যাপক সহায়তা প্রয়োজন। তবে আমরা দ্বিতীয় দফার বন্যা নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।’


রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ফিশার বলেন, ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট একটি হ্রদের বাঁধ ভেঙে পানি উপচে পড়ায় ত্রাণবাহী ট্রাক আটকা পড়ে। এতে উদ্ধার অভিযান সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

 


জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দপ্তরের প্রধান কমল কিশোরও নতুন দুর্যোগের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, এক অর্থে দুর্যোগ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। কোনো কোনো দিক থেকে এটি এখনও ঘটেই চলেছে।
একই ব্রিফিংয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মুখপাত্র তারিক জাসারেভিচ জানান, ভূমিধসে ছয়টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিখোঁজ হয়েছেন আটজন স্বাস্থ্যকর্মী। (সূত্র : সমকাল)


কী ঘটেছিল?
গত বুধবার সকালে নেপালের উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় একটি আকস্মিক ও শক্তিশালী বন্যা আঘাত হানে। এটি রাসুওয়া জেলার ভোটেকোশী নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোকে তছনছ করে দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি ও আবর্জনা স্রোতের সাথে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। নেপাল—চীন সীমান্তের কাছে তিমুরে এবং শ্যাফ্রোবেসি এলাকায় আঘাত হানা এই বন্যায় রাস্তাঘাট, সেতু, ভবন ও অন্যান্য অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পরবর্তীতে পানি ত্রিশূলী নদী প্রণালীতে গিয়ে পড়ে। বন্যার তীব্র স্রোতে মানুষ, যানবাহন ও বাড়িঘর ভেসে যায় এবং এলাকার একাংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তিন দিন পরেও বিপর্যয় এখনও কাটেনি। উদ্ধারকারী দলগুলো নদীর তীর ও ভাটির এলাকাগুলোতে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, মূল দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে উদ্ধার হওয়া দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া মরদেহের ব্যবস্থাপনা সামলাতে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

 


নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা 'জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ'—এর মতে, ৫১৭ জন বিদেশী নাগরিকসহ প্রায় ৯৭৭ জন মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, দুর্যোগের সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ২৮ জন পুলিশ সদস্যেরও খোঁজ পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া বহু বেসামরিক নাগরিক, পর্যটক ও ভ্রমণকারীর সন্ধান এখনও মিলেনি। নিখোঁজ তালিকায় থাকা কেউ নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর পরও তাদের হিসাব বাদ পড়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখছে কর্তৃপক্ষ।

 


পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে, রাসুওয়ার বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ১১৭ জন বিদেশি পর্যটককে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৫ জন ভারতীয়, ১৬ জন চীনা, ৯ জন দক্ষিণ কোরীয়, ২ জন আমেরিকান এবং ২ জন ইতালীয় নাগরিক রয়েছেন। বাকি ৩ জনের জাতীয়তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলো থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে, আর স্থলভাগে নিরাপত্তারক্ষীরা লোকালয় ও নদীর তীরে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।

 


অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে ৪,৪০০—এরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি নেপালি সেনাবাহিনী এবং সশস্ত্র পুলিশ বলও অভিযানে অংশ নিচ্ছে। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, তারা নুয়াকোট, রাসুওয়া এবং ধাদিংয়ে ১,৪৭৩ জন মানুষকে উদ্ধার করেছে অথবা প্রাথমিক সহায়তা দিয়েছে। বন্যা ও ধসে রাস্তা ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়েছে, ফলে অনেক জায়গায় কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি হেলিকপ্টারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

 


সরকার এখন কী করছে?
প্রধানমন্ত্রী এবং সকল মন্ত্রী তাদের এক মাসের বেতন ও ভাতা ‘প্রধানমন্ত্রী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলে’ দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রিসভা। নেপাল—চীন সীমান্ত, ভোটেকোশী নদী এবং ভাটির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জন্য ত্রাণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ প্রস্তুত করতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছে সরকার। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য ভারত ইতোমধ্যে ওষুধ ও খাদ্য সামগ্রীসহ ৩৭.৫ টন মানবিক সহায়তার দ্বিতীয় চালান নেপালের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন মন্ত্রী মহাবীর পুন—এর কাছে হস্তান্তর করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রও সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন নেপালের সাথে যোগাযোগ করেছে এবং যেকোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর জানিয়েছে, তারা নিখোঁজ থাকা ৯০ জন আমেরিকান নাগরিকের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছে, আর ৩ জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ৫ লাখ ডলারের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে এবং একজন দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ক উপদেষ্টা পাঠাবে বলে জানিয়েছে।

 


সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে?
এই মুহূর্তের প্রধান কাজ হলো জীবিত ও নিখোঁজ মানুষদের খুঁজে বের করা। তবে তৃতীয় দিনে এসে এই দুর্যোগটি কেবল সাধারণ উদ্ধার অভিযানের গণ্ডি ছাড়িয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষকে এখন প্রতিনিয়ত উদ্ধার হওয়া লাশের ব্যবস্থাপনা, পরিচয় সনাক্তকরণ, স্বজনহারা পরিবারগুলোকে সহায়তা দেওয়া এবং বিভিন্ন জেলায় অস্থায়ী হিমাগার সচল রাখার মতো বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। একই সাথে ধ্বংসপ্রাপ্ত রাস্তা ও সেতুর কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হচ্ছে এবং ভোটেকোশী নদীর পানির স্তরের ওপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে।

 


চীন অংশে কৃত্রিম হ্রদের বিষয়ের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়েছে। নেপাল সীমান্ত দিয়ে নতুন করে কতটুকু পানি নামতে পারে, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। আপাতত, ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদী প্রণালীর তীরে বসবাসকারী মানুষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। বন্যা আঘাত হানার তিন দিন পরও এই দুর্যোগের পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে না। মৃতের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে, শত শত মানুষ নিখোঁজ এবং দুর্ঘটনাস্থল ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত জীবন ও উত্তরের সন্ধান এখনও চলছে। (সূত্র : দ্য কাঠমান্ডু পোস্ট)

আন্তর্জাতিক থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার