প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১৬
ধর্মপাশা উপজেলায় সরকারকে প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব দিয়েও উপজেলা প্রশাসনের বেআইনী হস্তক্ষেপে মৎস্য আহরণ করতে পারছেন না কালীজানা বিলের মৎস্যজীবীরা। জলমহালের অভ্যন্তরে থাকা খাস জলাশয় ইজারা দেয়ার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ অমান্য করে হাজার টাকার বিনিময়ে দেয়া হয়েছে ইজারা। ফলে কোটি টাকার জলমহালের ইজারদারদের সাথে তৈরি হয়েছে হাজার টাকার জলাশয় ইজারাদারের দ্বন্দ্ব।
জলমহালের মাছ ধরতে জাল ফেললে পুলিশ পাঠিয়ে মৎস্য আহরণ বন্ধ করে দিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কালীজানা বিল গ্রুপের মৎস্যজীবীরা। আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে জলমহাল সংলগ্ন খাস জলাশয় ইজারা দিয়ে দু’পক্ষের মধ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে দ্বন্দ্ব। উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে জলমহাল এলাকায়। মৎস্য আহরণ নিয়ে যে কোন সময় হতে পারে আইনশৃঙ্খলা অবনতি।
রবিবার সরেজমিনে কালিজানা জলমহালে গিয়ে দেখা যায়, ১৪টি মৌজা নিয়ে ২৮১ একরের উর্ধ্বের কালীজানা জলমহালের পানি নামতে শুরু করায় ভাটি এলাকা বাদশাগঞ্জ ডিগ্রি কলেজের সামনে কালীজানা নদীতে জালের বাঁধ দিয়ে মাছ আটকানো ও আহরণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন জলমহাল ইজারাদার। জাল ফেলার পর বাধা দেয় জলমহালের অভ্যন্তরে থাকা জলাশয় ইজারাপক্ষ। পরবর্তীতে পুলিশ এসেও জাল ফেলতে বাধা দেয়। এসময় তৈরি হয় উত্তেজনা। উপস্থিত পুলিশের হস্তক্ষেপে নিবৃত্ত হয় উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। এই জায়গায় জাল না ফেলে অন্য কোন জায়গায় মাছ আহরণের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন কালীজানা জলমহাল ইজারাদার। জাল না থাকায় ভাটির পানির টানে নদী হয়ে জলমহাল থেকে মাছ বেরিয়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
জানা যায়, বার্ষিক ৩৮ লক্ষ ৮৪ হাজার টাকায় ৩ বছরের জন্য জলমহালটি ইজারা পায় কালিজানা বিল গ্রুপ মৎস্যজীবী সমিতি। ২ বছর উন্নয়ন শেষে চলতি বছর মৎস আহরণের পর শেষ হবে মেয়াদ। ৩ বছরে ভ্যাটসহ প্রায় দেড় কোটি টাকা রাজস্ব পেয়েছে সরকার। বিল পাহাড়া, বাঁশ কাটা সহ আরও লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে ইজারাদারের। কয়েক কোটি টাকা খরচ শেষে মৎস্য আহরণের সময় ক্ষতির সম্ভাবনায় জলমহাল অভ্যন্তরে থাকা সরকারি জলাশয় খাস আদায়ের মাধ্যমে ইজারা না দিতে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়। প্রতিকার না পেয়ে হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করে জলমহাল ইজারাদারপক্ষ। ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর ৬ মাসের জন্য খাস আদায় না করতে আদেশ দেন আদালত। পরবর্তীতে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিতাদেশ আরও ৬ মাসের জন্য বৃদ্ধি করেন আদালত। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে বদলীর পূর্বমূহূর্তে জুলাই মাসে জলমহালের অভ্যন্তরে থাকা বিভিন্ন মৌজায় খাস আদায়ের ইজারা দেন উপজেলা সহকারী (ভূমি) কমিশনার সঞ্জয় ঘোষ। ইজারা আদেশ পেয়ে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় জলমহালের মাছ আহরণের বাধা দিচ্ছে জলাশয় ইজারাদার।
জলমহালের ইজারাদার কালিজানা মৎস্যজীবী গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মো বুলবুল বলেন, সরকারকে কোটি টাকার উপরে রাজস্ব দিয়ে বিল এনেছি। আরও কোটি টাকা দিয়ে দু’বছর উন্নয়ন করলাম। এবছর ফিসিং বছর। আমরা ফিসিং করার আগেই ছোট ছোট কয়েকটি জলাশয় ইজারা দিয়ে দিছে প্রশাসন। অথচ এর আগেই আমার রীটের আদেশে আদালত এসব খাস ইজারার উপর ৬ মাসের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। এখন মাছ ধরার সময়ে এসে ভাটিতে জাল ফেলতে দিচ্ছে না উপজেলা প্রশাসন ও তৃতীয় পক্ষ। ভাটিতে জাল না ফেলে কিভাবে মাছ ধরবো আমরা। এর আগে এই ছোট ছোট জলাশয় কোনোদিন ইজারা হয়নি। আদালতের আদেশ অমান্য করে নতুন করে এটি ইজারা দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা হচ্ছে। পুলিশ, প্রশাসন কোন স্বার্থে এটি করছে জানি না। এর কারণে আমাদের মৎস্যজীবী সমিতির জেলেরা মাছ ধরতে না পেরে অনাহার অর্ধাহারে জীবন পার করছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জনি রায় বলেন, আমার এসিল্যান্ড খাস জায়গার ভিত্তিতে ইজারা দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশনা জানার পর ইজারা বাতিল করা হয়েছে। জলমহালের ইজারাদার যদি প্রয়োজন মনে করেন খাস জায়গায় জলমহালের মৎস্য আহরণ করার তাহলে আদালতে তাদের রিটের প্রেক্ষিতে করা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করিয়ে আনলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নিবো।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে খাস আদায় আইন পরিপন্থী কাজ। জলমহালে মৎস আহরণের যে সমস্যা— আমরা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নিবো। সরকারকে যারা এতো টাকা রাজস্ব দিয়েছে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে এটা গ্রহণযোগ্য না।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো মতিউর রহমান খান বলেন, আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে খাস ইজারা দিয়ে থাকলে যারা দিয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সাহিত্য ও সংস্কৃতি থেকে আরো পড়ুন