প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৫৩
সংগৃহীত ছবি
এটা কোন দেশ, আমি বাঁচব কীভাবে? আমার তো একটাই ছেলে। আমার জীবন কীভাবে কাটাব? ওকে ছাড়া জীবন পার করব কীভাবে? এই বিলাপ, এই আর্তনাদ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের। কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বাসায় গেলে কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলেন তিনি।
২২ ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর নাহিদা বেগম ও ব্যবসায়ী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার দম্পতির একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) মরদেহ গতকাল শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়।
একমাত্র সন্তান অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ভেঙে পড়েছে ড. নাহিদার পুরো পরিবার। এই মৃত্যু তার পরিবার, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গন ছাড়িয়ে যেন সারাদেশের মানুষকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছে। অন্তত সামাজিক মাধ্যম তা-ই বলছে।
নিহত অপ্রতিম কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
গতকাল বিকেলে কুমিল্লা কোটবাড়ি এলাকায় নাহিদার বাসায় যান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। এর আগে টেলিফোনে জনৈক কর্মকর্তার সঙ্গে এই সংসদ সদস্যের আবেগ-মথিত কথোপকথনের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি কোটবাড়ির গন্ধমতী (দক্ষিণ বাগমারা) এলাকার নুরজাহান ভিলার একটি ফ্ল্যাটে থাকেন নাহিদা ও শাহরিয়ার দম্পতি। সংসদ সদস্যের সামনে নাহিদা বেগম বলেন, ‘কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি! আমার ছেলেকে কেন হত্যা করা হলো? আমি এর জবাব চাই।’ ড. নাহিদা কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন; বারবার মূর্ছা যান। ফিরোজ শাহরিয়ারও পাগলপ্রায়।
পুলিশের ধারণা, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নিতে গিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে গতকাল প্রথমে তুহিন এবং পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতে আনাস ও ফাহিম নামে সন্দেহভাজন তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ।
রাতে জেলা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, চাঞ্চল্যকর এ হত্যায় জড়িতদের চিহ্নিত ও তাদের আটক করতে পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, সিআইডি, পিবিআই, এসআরবিসহ একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে।
কুমিল্লার কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মফিজ উদ্দিন ভূঁইয়া গত রাতে জানান, আটক তুহিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ওই আইফোনটি উদ্ধার করেছে জেলা পুলিশ।
রাত পৌনে ১১টায় কুমিল্লা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওসি মোহাম্মদ শামসুল আলম শাহ সমকালকে বলেন, অপ্রতিম হত্যারহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের আটক করা হয়েছে। আজ রোববার পুলিশ সুপার এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানাবেন।
অপ্রতিমের মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা সদর দক্ষিণ মডেল থানার এসআই সাইফুল ইসলাম সমকালকে বলেন, অপ্রতিমের মাথায় গুরুতর রক্তাক্ত আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, মাথায় আঘাতের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে আরও ছোটখাটো কিছু আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসার পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে।
পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার বিকেল ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে অপ্রতিম তার মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। এর পর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না। এ ঘটনায় তার বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করে পুলিশ। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কোটবাড়ি এলাকার গন্ধমতীতে তার অবস্থান শনাক্ত হয়। এর পর থেকে তার সঙ্গে থাকা ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
এ অবস্থায় মা নাহিদা বেগম ছেলেকে খুঁজে পেতে ফেসবুকের মাধ্যমে সবার সহযোগিতা চান। ফলে শুক্রবার রাত থেকেই অপ্রতিমের বিষয়টি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের নজরে ছিল। গতকাল দুপুরে তার লাশ পাওয়া গেলে তা দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়।
যেভাবে পাওয়া গেল মরদেহ
অপ্রতিমের মরদেহ প্রথম দেখতে পান স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল কাদের জিলানী। বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন সানন্দা এলাকার জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে তিনি ও তাঁর সঙ্গে থাকা কয়েকজন মরদেহটি পড়ে থাকতে দেখেন। খবর পেয়ে দুপুরে ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনাস্থলে যান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এস এম শরীফুল করিমসহ শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয় লোকজন। স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীও সেখানে যান। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি এ এলাকার এমপি হিসেবে লজ্জিত ও দুঃখিত। একটা মাসুম বাচ্চাকে রক্ষা করতে পারলাম না! প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলব। ৯০ দিনের মধ্যে এ ঘটনার বিচার শেষ করতে হবে।’ পরে তিনি মোবাইল ফোনে স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে কথা বলেন এবং এ বিষয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান।
কুমিল্লা পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কোটবাড়ি ও আশপাশ এলাকার সিসিটিভি ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে একজনকে শনাক্ত ও আটক করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে এবং আমরা কিছু ক্লু পেয়েছি। এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কে কে জড়িত, মোটিভ কী ছিল, শুধুই কি আইফোন নাকি অন্য কোনো বিষয় ছিল– তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।’
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, বিচার দাবি
অপ্রতিম হত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের প্রধান ফটকের সামনে আয়োজিত মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। তারা খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার নিশ্চিত করতে ১২ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। ১২ ঘণ্টার মধ্যে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে মহাসড়ক অবরোধের হুঁশিয়ারি দেন তারা।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এস এম শরীফুল করিম বলেন, ‘আমাদের একজন সহকর্মীর সন্তানের এমন দুঃখজনক মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত। ঘটনা জানতে পেরে আমরা পুলিশ, ডিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমরা ছেলেটিকে আর জীবিত পেলাম না।’
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ময়নাতদন্তের পর মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মোবাইল ফোনের জন্য এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।
ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, আজ জানাজা
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর রাতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। অপ্রতিমের বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার জানিয়েছেন, আজ রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এবং বেলা ১১টায় গন্ধমতী ঈদগাহ মাঠে তাঁর ছেলের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে স্থানীয় কবরস্থানে মরদেহ দাফন হবে।
কুবিতে সাধারণ শোক, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত
অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় আজ রোববার কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষা স্থগিত থাকবে। গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
ডাকসুর ভিপি ও বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর উদ্বেগ
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম। গতকাল এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী নিখোঁজ শিশু অপ্রতিমের পড়ে থাকা লাশ দেখে যে কোনো বিবেকবান মানুষই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়বেন। কিন্তু দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিবেককে কি এসব ঘটনা আদৌ নাড়া দেয়?’
গভীর উদ্বেগ, শোক ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ যুব মৈত্রী। গতকাল এক বিবৃতিতে বলা হয়, একটি শিশুকে সন্ত্রাস ও সহিংসতার শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হবে– এ বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়; গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গভীর লজ্জার।
শিশু নিখোঁজ ও হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকার প্রতিবাদ করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। গতকাল এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধারের হৃদয়বিদারক ঘটনা এবং দেশজুড়ে শিশু নিখোঁজ প্রমাণ করে– শিশুদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যের বরাত দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত শিশু নিখোঁজের ঘটনায় ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। এর মধ্যে এখনও ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান মেলেনি।
বিবৃতিতে বলা হয়, বয়সজনিত চপলতা, পারিবারিক অসন্তোষ কিংবা ঘর ছেড়ে যাওয়ার মতো সামাজিক কারণ দেখিয়ে শিশু নিখোঁজের ঘটনাকে হালকা করে দেখা বা দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ যা-ই হোক, প্রত্যেক শিশুকে উদ্ধার এবং তাদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে মনে করে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি।
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন