প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:০০
তাহিরপুরে পারিবারিক কলহের জের ধরে তিন শিশুসন্তানকে বিষপানে হত্যার ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া শুরু করেছে পুলিশ। নিহত শিশুদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। তবে অভিযোগ না পেলেও পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে বলে জানানো হয়েছে। এদিকে বিষপান করে গুরুতর অসুস্থ বাবা সরাফত আলী সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পুলিশের নজরদারিতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও সিট খালি না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে এই ঘটনায় পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন ও এলাকাবাসীর মধ্যে বিরাজ করছে নীরবতা ও আতঙ্ক। নিহত তিন শিশু হলো— সরাফত আলীর মেয়ে মাওয়া আক্তার (১০), ছেলে শামিম মিয়া (৭) ও তামিম মিয়া (২)। শনিবার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যার দিকে তিন শিশুর লাশ তাহিরপুর সীমান্তবর্তী রজনী লাইন গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। লাশ বাড়িতে পৌঁছালে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। পরে নামাজে জানাজা শেষে বাড়ির পাশের কবরস্থানে পাশাপাশি এক সারিতে তিন শিশুকে দাফন করা হয়।
গ্রামবাসী জানান, একই পরিবারের তিন শিশুর একসঙ্গে জানাজা ও দাফনের এমন হৃদয়বিদারক দৃশ্য তারা আগে কখনো দেখেননি।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১২ বছর আগে উপজেলার শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের ভুট্টো মিয়ার মেয়ে ফাতেমা বেগমের সঙ্গে রজনী লাইন গ্রামের সরাফত আলীর বিয়ে হয়। তাদের সংসারে এক মেয়ে ও দুই ছেলে জন্ম নেয়। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে তিন বছর আগে ফাতেমা সৌদি আরবে যান। সেখানে থেকে তিনি স্বামীর কাছে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা পাঠান। ওই টাকা সরাফত আলী মাদক ও অনলাইন জুয়ায় শেষ করে ফেলেন। এ নিয়ে স্বামী—স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া—বিবাদ হতো।
প্রায় দুই বছর পর দেশে ফিরে সংসারের আর্থিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন না দেখে স্বামীর সঙ্গে ফাতেমার মনোমালিন্য আরও বেড়ে যায়। ঘটনার প্রায় চারদিন আগে তিনি আবার সৌদিআরবে চলে যান। শনিবার রাত ২টার দিকে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশে রওনা হন তিনি। এর কিছু সময় পরই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা।
নিহত শিশুদের এক দাদি জানান, সরাফত আলী প্রথমে তিন সন্তানকে লিচু জুসের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ান। পরে নিজেও বিষপান করেন। রাত আড়াইটার দিকে তিনি ঢাকায় থাকা স্বরূপা বেগম নামে এক ফুফুকে ফোন করে সন্তানদের বিষ খাওয়ানোর কথা বলেন। পরে ওই ফুফু বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানালে তারা ঘরের দরজা ভেঙে তিন শিশুকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন।
চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে শিশুদের উদ্ধার করে প্রথমে বাদাঘাট বাজারের একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে এবং পরে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তিন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর অসুস্থ সরাফত আলীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
রবিবার সকালে সরাফত আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো বাড়িতে সুনসান নীরবতা। স্বজনরা কান্নাকাটি করছেন। ঘরটি তালাবদ্ধ। আতঙ্কে কেউ ঘরের কাছেও যাচ্ছেন না। বাড়ির পাশেই পাশাপাশি তিনটি কবর খুঁড়ে শিশুদের দাফন করা হয়েছে। নতুন বাঁশের বেড়া দিয়ে কবরস্থানটি ঘিরে রাখা হয়েছে।
প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম বলেন, এমন ঘটনা এর আগে আমাদের এলাকায় কখনো ঘটেনি। গ্রামের অধিকাংশ মানুষ গত রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি। আমিও কয়েকবার আতঙ্কে ঘুম থেকে উঠেছি।
তাহিরপুর থানার ওসি ফারুক আহমেদ বলেন, এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নিহত শিশুদের পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। তবে তারা অভিযোগ না দিলেও পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।’
সরাফত আলীর চিকিৎসার বিষয়ে ওসি বলেন, বিষপানে তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকরা তাকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু আইসিইউতে সিট খালি না থাকায় তাকে সেখানে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। তিনি পুলিশের নজরদারিতে রয়েছেন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন