প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:১০
পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণদের জন্য নিরাপদ আবাসনের লক্ষ্যে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ‘শান্তি নিবাস’ এখন নিজেই যেন পরিত্যক্ত। অবকাঠামো নির্মাণের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি চালু হয় নি। ফলে অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান আসবাবপত্র, ব্যায়ামের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও মেডিকেল সরঞ্জাম।
পরিত্যক্ত ও অসহায় ষাটোর্ধ্ব প্রবীণদের জন্য যে ভবনটি হওয়ার কথা ছিল নিরাপদ আশ্রয়স্থল, সেই ভবনটিই এখন পড়ে আছে অযত্ন ও অবহেলায়। ভবনের ভেতরে নষ্ট হচ্ছে চেয়ার—টেবিল, ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাসামগ্রী। দেয়ালের বিভিন্ন স্থান থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা। মেঝেতে পড়ে আছে ইঁদুরের কঙ্কাল। প্রতিটি কক্ষেই ছড়িয়ে—ছিটিয়ে আছে ইঁদুরের মল ও আবর্জনা। দীর্ঘদিনের অযত্নে দেয়ালে জমেছে শ্যাওলা।
যে জায়গাটিতে অসহায় প্রবীণদের জন্য নিরাপত্তা, সেবা ও একটু স্বস্তির পরিবেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন বিরাজ করছে নীরবতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর অবহেলার চিহ্ন। মানুষের কল্যাণে ব্যবহারের জন্য নির্মিত এই স্থাপনা এভাবে পড়ে থাকায় একদিকে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ও সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে এর সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আশ্রয়প্রত্যাশী প্রবীণরা।
সুনামগঞ্জ শহরের হাছননগরে সরকারি শিশু পরিবারের অভ্যন্তরে প্রবীণদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে এই ‘শান্তি নিবাস’। অনাথ শিশুদের সঙ্গে প্রবীণদের সহাবস্থানের মাধ্যমে পারিবারিক আবহে শিশুদের বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যেই স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়। সিলেট বিভাগের একমাত্র এই শান্তি নিবাসের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। ২০২৩ সালের জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ধীরগতির কারণে পুরো নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৪ সালে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে নির্মিত এই ২৫ শয্যা বিশিষ্ট শান্তি নিবাসে ব্যয় হয়েছে ৬ কোটি ৯৬ লাখ ৫৩ হাজার ৯৪৪ টাকা। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি চালু না হওয়ায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাটি এখন পড়ে আছে অব্যবহৃত অবস্থায়।
বিশ^ম্ভরপুর দিগেন্দ্র বর্মন সরকারি কলেজের প্রভাষক সবিতা বীর বলেন, শান্তি নিবাস নামটি শুনলেই মনে শান্তির অনুভূতি জাগে। এখানে আধুনিক বিভিন্ন সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ—সুবিধা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চালু হলে এসব সরঞ্জাম মানুষের কাজে লাগবে। আমাদের সমাজে এখনো অনেক মানুষ আছেন, যাদের থাকার মতো কোনো আশ্রয় নেই। তাদের অনেককেই রাস্তার পাশে কিংবা খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে হয়। এই মানুষগুলোর জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে শান্তি নিবাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃজন করে প্রতিষ্ঠানটি চালুর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।
সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভাপতি গৌরী ভট্টাচায্যর্ বলেন, সরকারি শিশু পরিবারের ভেতরেই শান্তি নিবাস নির্মাণের পেছনে একটি সুন্দর ও মানবিক চিন্তা কাজ করেছে। এখানে থাকা এতিম ও অসহায় শিশুরা যেন বয়স্ক মানুষদের স্নেহ, মমতা ও পারিবারিক আবহ পায়, এটাই ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। একটি শিশুর বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবারের স্নেহ—মমতার যেমন প্রয়োজন, তেমনি একজন বয়স্ক মানুষের জীবনের শেষ সময়ে প্রয়োজন হয় নিরাপত্তা, যত্ন ও আপনজনের সাহচর্য। শান্তি নিবাস চালু হলে একদিকে যেমন আশ্রয়হীন প্রবীণরা নিরাপদ আবাসন ও প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন, অন্যদিকে শিশু পরিবারের শিশুরাও তাদের কাছ থেকে স্নেহ, অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ শেখার সুযোগ পাবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটি শুধু বয়স্কদের আবাসন নয়, বরং শিশু ও প্রবীণদের মধ্যে একটি আন্তরিক সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।
সামাজিক সংগঠন সুনামগঞ্জ জনউদ্যোগের আহ্বায়ক সুখেন্দু সেন বলেন, সুনামগঞ্জে শান্তি নিবাসের ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। বয়স্ক, পরিত্যক্ত ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও মানবিক একটি উদ্যোগ। এখানে চিকিৎসা, ব্যায়ামসহ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সুযোগ—সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এত সুন্দর একটি প্রতিষ্ঠান এখনো চালু করা যাচ্ছে না। ফলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবন ও কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। আমরা চাই, সরকারি এই সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হোক এবং শান্তি নিবাসটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হোক।
বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. হাবিবুর রহমান চৌধুরী বলেন, আমরা জেনেছি সরকারি শিশু পরিবারের ভেতরে পরিত্যক্ত, দাবিদারহীন, দুর্দশাগ্রস্ত ও অবহেলিত প্রবীণদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু খন পর্যন্ত এর কার্যক্রম শুরু করা হয় নি। এটি চালু হলে আমাদের অবহেলিত মানুষজন নিরাপদ আশ্রয় পাবেন। আমরা দাবি জানাই দ্রুত ওখানে লোকবল নিয়োগ দিয়ে প্রবীণদের সেবার ব্যবস্থা করা হোক।
তবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃজন না হওয়ায় শান্তি নিবাসটি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে যে স্বপ্ন ও উদ্দেশ্য নিয়ে স্থাপনাটি নির্মাণ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের অপেক্ষায় পড়ে আছে ভবনটি।
সুনামগঞ্জ সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক নিবাস রঞ্জন দাশ বলেন, ভবনটির নির্মাণকাজ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একজন প্রকল্প পরিচালকের তত্ত্বাবধানে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। তবে এখনও প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃজন না হওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয় নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, বয়স্কদের সেবাদানের জন্য একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তবে সেখানে এখনো জনবল নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয় নি। এ বিষয়ে কার্যক্রম গ্রহণের জন্য সমাজসেবা অধিদপ্তরে পত্র দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সমাজসেবা কার্যালয় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন