প্রকাশিত: ০১ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:১৮
সুখের আশায় ঋণ ও কিস্তিতে প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয়ে একটি অটোরিকশা কিনেছিলেন সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার কুরবানগর ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের রিকশাচালক জুলহাস মিয়া। ভেবেছিলেন, অটোরিকশা চালিয়ে আগের চেয়ে একটু বেশি আয় করবেন। স্ত্রী ও পাঁচ সন্তানকে নিয়ে অভাবের সংসারে ফিরবে স্বস্তি। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন যেন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে চুরি হয়ে যায় তার একমাত্র উপার্জনের অবলম্বন অটোরিকশা। এরপর থেকেই দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তিনি। একদিকে পরিবারের সাত সদস্যের ভরণপোষণ, অন্যদিকে ঋণ ও কিস্তির চাপ—সব মিলিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছেন জুলহাস।
জানা গেছে, অটোরিকশাটি কেনার জন্য ঋণ ও কিস্তির মাধ্যমে প্রায় তিন লাখ টাকা নিয়েছিলেন জুলহাস মিয়া। প্রতি মাসে ঋণের সুদ ও কিস্তি বাবদ প্রায় ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয় তাকে। কিন্তু উপার্জনের একমাত্র মাধ্যমটি চুরি হয়ে যাওয়ায় এখন সেই কিস্তির টাকা পরিশোধ তো দূরের কথা, পরিবারের দুবেলা খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
জুলহাস মিয়ার পাঁচ সন্তান—চার মেয়ে ও এক ছেলে। তাদের মধ্যে একজন মেয়ে বাকপ্রতিবন্ধী। অন্য সন্তানরাও ছোট। এ কারণে পরিবারের ব্যয় মেটানোর পুরো দায়িত্ব তার ওপর। অটোরিকশাটি হারানোর পর গত প্রায় ১৫ দিন ধরে পরিবারটি অনাহার—অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, জুলহাস মিয়ার বসতঘরটিও জরাজীর্ণ। মাটির বেড়া দিয়ে তৈরি ঘরের চালের টিন নষ্ট হয়ে গেছে। বৃষ্টি হলে ঘরের মেঝেতে পানি পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে খাবারের সংকট, অন্যদিকে ঋণের চাপ ও বসতঘরের দুরবস্থা—সব মিলিয়ে পরিবারটির জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা এম এ বারি বলেন, আমাদের এলাকার প্রতিবেশী জুলহাস একজন নিম্ন আয়ের মানুষ। আগে প্যাডেলচালিত রিকশা চালিয়ে আয়—রোজগার করতেন। একটু সুখের আশায় এবং আয় বাড়ানোর জন্য প্রায় তিন লাখ টাকা ঋণ ও কিস্তিতে একটি অটোরিকশা কিনেছিলেন। কিন্তু গত ৯ সেপ্টেম্বর গাড়িটি চুরি হয়ে যাওয়ায় তিনি এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। মাসে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ঋণ ও কিস্তি পরিশোধ করতে হয় তাকে। স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে সাত সদস্যের পরিবার এখন অনাহার—অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। দেশের বিত্তবান ও প্রবাসীরা যদি অল্প অল্প করে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে জুলহাস তার ঋণ পরিশোধ করে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন।
জুলহাস মিয়ার গ্রামের জুয়েল মিয়া বলেন, জুলহাস মিয়া আমার গ্রামের সম্পর্কে আমার চাচা হন। তিনি খুবই অসহায় ও দরিদ্র। তার পাঁচ সন্তান। এর মধ্যে চার মেয়ে ও এক ছেলে। এক মেয়ে বাকপ্রতিবন্ধী। অন্য সন্তানরাও ছোট। আয়—রোজগার করার মতো সামর্থ্য তাদের নেই। ঋণ করে চাচা একটি গাড়ি কিনেছিলেন, সেটিও চুরি হয়ে গেছে। এখন তার চলার পথ একেবারে বন্ধ। প্রবাসী ও দেশের বিত্তবানরা যদি তাকে সহযোগিতা করেন, তাহলে তিনি আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন।
কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন জুলহাস মিয়ার স্ত্রী। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বলেন, আমাদের একমাত্র আয়—রোজগারের গাড়িটা চুরি হয়ে যাওয়ায় খুবই কষ্টে আছি। ঋণের টাকা আর কিস্তির টাকার চাপে আমরা অস্থির। কোনো পথ দেখছি না। আমার পাঁচ সন্তান, এর মধ্যে একজন প্রতিবন্ধী। তাকে লালন—পালন করাও অনেক কষ্টের। প্রায় ১৫ দিন ধরে খেয়ে না খেয়ে আছি।
নিজের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়েও কান্না ধরে রাখতে পারেননি জুলহাস মিয়া। কেঁদে কেঁদেই তিনি বলেন, আমার গাড়ি চুরি হওয়ার পর থেকেই আমি দিশেহারা হয়ে গেছি। আমার সন্তানরা যখন কিছু খাওয়ার জন্য টাকা চায়, আমি দিতে পারি না। আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটা যখন ইশারা করে টাকা চায়, দিতে পারি না। এই দুঃখ আমি কার কাছে বলব? দিন কাটে অনাহারে—অর্ধাহারে। কিস্তির টাকার জন্য যখন অফিসার আমার কাছে আসেন, তখন লজ্জায় পালিয়েও যেতে পারি না। আমার চোখে অন্ধকার। আমার সাহায্য দরকার। আমি স্ত্রী—সন্তানদের নিয়ে বাঁচতে চাই। ঋণ পরিশোধ করে একটু শান্তিতে থাকতে চাই।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান বলেন, জুলহাস মিয়া যদি জেলা প্রশাসক মহোদয় বরাবর আবেদন করেন, তাহলে মানবিক সহায়তা হিসেবে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন