প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:০৭
নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য
সেপ্টেম্বরের শুরুতে প্রচন্ড গতিতে হঠাৎ ভারতের পাহাড় থেকে নেমে আসে বালু—পলি যুক্ত ঢল। বসতভিটা থেকে চার—পাঁচ ফুট উপরে দিয়ে গড়ায় ঢলের জল। সেই ঢলে ঘরবাড়ি ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হন তাহিরপুরের উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের চারাগাঁওয়ের বৃদ্ধা আছিয়া বিবির। এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো কোন সহায়তা পাননি তিনি। ঘরের ভিটা থেকে উঁচু হয়ে গেছে বালুর স্তর। কোনোমতে পলিথিন বিছিয়ে কাটাচ্ছেন রাত।
আছিয়া বলেন, সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ ঢল এসেছিল। ঘরের চাল, ডাল, কাপড় যা ছিল সব ভেসে গেছে। আমাকে ঘরের ভেতর থেকে মানুষ টেনে বের করে বাঁচাইছে। ৩ দিন না খেয়ে ছিলাম। ভাঙা ঘরে কোনমতে থাকতেছি এখন। কয়েকদিন আগে ভাঙা ঘরেও চুর ঢুকে যায়। আমার কোন তৌফিক নাই যে আবার ঘর বানাবো। সরকারের কাছে একটু সাহায্য চাই, আশ্রয় চাই।
.jpg)
স্থানীয়দের দাবি এক দিনের ঢলে আছিয়া বিবির মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শতাধিক ঘরবাড়ি। প্রাকৃতিক এই দুর্যোগ মোকাবিলা করে প্রাণে বাঁচলেও সরকারি কোন সহযোগীতা না পাওয়ায় অসহায় দিন পার করছেন তারা।
সেপ্টেম্বর মাস সহ চলতি বছর দফায় দফায় ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত তাহিরপুর উপজেলার চারাগাঁওসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের ঘরবাড়ি। ঢলের সাথে আসা বালুর স্তর ঘরবাড়ির পাশাপাশি নষ্ট করেছে ফসলি জমি। এর আগে ২২ জুন পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের স্রোতে বসতঘরসহ তলিয়ে প্রাণ যায় তাহিরপুর উপজেলার ভারসাম্যহীন যুবক রুবেলের। ২০২৩ সালের জুনে সড়ক পারাপারের সময় দুই সন্তানসহ ঢলের স্রোতে ভেসে গিয়ে মৃত্যু হয় শাল্লা উপজেলার দুর্লভ রাণীর। পরের বছর বিলীন হয় দোয়ারাবাজারের অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি ও দোকান।
ঢলের জলে জেলায় এই পর্যন্ত কতজন প্রাণ হারিয়েছেন সেই তথ্য নেই জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তার কার্যালয়ে।
সরেজমিন তাহিরপুর গিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্য দেখা মিলেছে উজানে ভারতে পাহাড় কেটে চুনাপাথর—কয়লা উত্তোলনের স্থানে। ঢলের সাথে ক্ষত বিক্ষত পাহাড়ের পলি— বালু নেমে ভরাট হছে খাল, বন্ধ হচ্ছে পানি প্রবাহ। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাসের অগ্রীম পূর্ভাবাস মিললেও ঢলের কোন পূর্ভাবাস পান না সীমান্তের মানুষজন। যার কারণে হঠাৎ নেমে আসা বিপর্যয়ে দিশেহারা তারা।
চারাগাঁওয়ের যুবক আল আমিন বলেন, ঢলের সাথে আসা কাদা মাটি আর বালু জমে আমাদের বসত ভিটা পূর্ব থেকে ৩—৪ ফুট উঁচু হয়ে গেছে। আমাদের ঘর মাটির নিচে ঢুকে আছে। এরকম শতাধিক ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে গেছে। এর কারণ হচ্ছে নদী ভরাট। উত্তোরণের জন্য নদী খনন করতে হবে। পানি তার পথে চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিলে বাসা বাড়তে আসবে না।
মো সাইদুল ইসলাম বলেন, এমন এক ধাক্কা আসছে হঠাৎ যে কিছু বুঝার আগেই খেতা বালিশ যা আছে সব ভেসে যায়। বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে দৌড়িয়ে প্রাণে বাচতে পেরেছি। সাগরে ঝড় আসলে, কিংবা কোথাও বন্যা হলে সবাই খবর পায় আগেই। আমরা যদি ঢলের খবর আগে পেতাম তাহলে নিরাপদ ও সতর্ক থাকতে পারতাম।
ঢলের কারণে পূর্বে দুর্বিষহ জীবন পার করলেও পাহাড়ি ছড়ার সামনে স্থানীয় ভাবে দেয়া বাঁধ জীবনরক্ষকারী কবজ হয়ে কাজ করছে রজনীলাইন, রাজাই সহ অন্যান্য গ্রামের মানুষের। চারাগাঁওয়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সবার দাবি পাহাড় বেয়ে নেমে আসা ঢলে ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে ত্রাণের চেয়ে বাঁধ নির্মাণ জরুরী।
রজনীলাইনের আনোয়ারা খাতুন বলেন, যখন ঢল আসতো ঘরে ভাসিয়ে নিয়ে যেত। দীর্ঘদিন রান্নাবান্না করা যেতো না। খাওয়ার পানি পাওয়া যেতো না। অনেক কষ্টে দিন পার করছি। ৫ বছর আমাদের এই কষ্ট কমছে। বাঁধ দেয়ার পর ঢল আর আমাদের বাড়িঘরে আসে না।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এসব মানুষের ভাগ্যে মিলেনি কোন সহায়তা। সহায়তা দূরের কথা, প্রশাসনের কাছে নেই ঢলে ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য। তাহলে কোথায় খরচ হচ্ছে জলবায়ু তহবিলের অর্থ। এসব তথ্য জানতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গেলে ঢল সম্পর্কিত কোন তথ্য পাওয়া যায় নি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতে পাহাড় কাটার কারণে মাটি ঝাড়ঝুড়ে হওয়ায় বৃষ্টির সাথে নিচের এলাকায় চলে আসায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। ঢলের পূর্ভাবাস দেয়া আর দু’দেশের সমন্বিত উদ্যোগ পারে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ঢলের এই সমস্যাটা আন্ত বাউন্ডারি ইস্যু। কর্মযজ্ঞ হচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে, তারা তাদের পাহাড় কাটছে। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। সব জায়গায় কিন্তু ঢলের সাথে মাটি বা বালু আসে না। পাথর বা খনিজ তোলার জন্য পাহাড় কাটা স্থানে ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়। কারণ পাহাড় কাটলে মাটি ঝুড়ঝুড়ে আলগা হয়ে যায়। বৃষ্টির সাথে এই মাটি বালু নিচের দিকে চলে এসে ক্ষতির পরিমাণ বেশি দাঁড়ায়। এই ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দু’দেশের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমে পাহাড় কাটা বন্ধ করাতে হবে। দ্বিতীয়ত ভারতে কতটুকু বৃষ্টিপাত হবে তা আগাম জানতে হবে। কি পরিমান বৃষ্টি হলে কতটুকু ঢল নামবে এসকল ডেটা দু দেশের মধ্যে ভাগাভাগি করতে হবে। এসব ডেটা বিশ্লেষণ করে মানুষকে ঢলের আগাম তথ্য জানিয়ে দিতে পারলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন