পানি নেই তবু সড়ক কেটে হচ্ছে কালভার্ট

প্রকাশিত: ০৯ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৫৩

সড়কের দুপাশে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। নেই দৃশ্যমান কোনো পানির প্রবাহ, খাল কিংবা ছড়া। এর মধ্যেই বিটুমিনের সড়ক কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে কালভার্ট। এক জায়গায় নয়, অন্তত তিনটি স্থানে সড়ক খুঁড়ে কালভার্ট নির্মাণের এমন উদ্যোগে বিস্মিত স্থানীয় বাসিন্দারা। অথচ সীমান্ত ছড়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য পাশেই রয়েছে কালভার্ট।

 


ঘটনাটি ঘটেছে তাহিরপুর উপজেলার সীমান্ত সড়কের ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়া বাজার পর্যন্ত চলমান সংস্কারকাজে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন এই সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ৫টি ব্রিজ ও ১০টি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এরমধ্যে তিনটি কালভার্ট নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ কোটি ৯৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৩১ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স নুর কনস্ট্রাকশন ইতোমধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করেছে। বর্তমানে সড়কটির প্রশস্ততা ১২ ফুট। সংস্কার ও সম্প্রসারণের পর সড়কটি ১৮ ফুট প্রশস্ত করা হবে। এর দুই পাশে ৩ ফুট করে মোট ৬ ফুট শোল্ডার যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

 

 

 

 

 

 


স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের সময় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়েই বিটুমিনের সড়ক কেটে নতুন করে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ পাশের ছড়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য ওই সড়কে আগে থেকেই কালভার্ট রয়েছে। বিদ্যমান কালভার্টগুলো সংস্কারের পাশাপাশি আরও তিনটি নতুন কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এছাড়া সড়কটি প্রশস্ত করতে গিয়ে স্থানীয়দের রেকর্ডভুক্ত জমির একটি অংশ সড়কের আওতায় চলে যাওয়ারও অভিযোগ করেছেন তারা। এতে জমির মালিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

 


সরেজমিনে দেখা যায়, ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়ামুখী সড়কের বিভিন্ন অংশে সংস্কারকাজ চলছে। রাজাই গ্রামের অংশে সড়কের দুপাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষি জমি। এরই মধ্যে একটি স্থানে বিটুমিনের আস্তরণ কেটে বড় আকারের গর্ত করা হয়েছে। কোথাও কালভার্ট নির্মাণের জন্য মাটি খোঁড়া হয়েছে, আবার কোথাও সড়কের একাংশভেঙে ফেলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলরা বলছেন, এসব কালভার্টের সামনে ও পিছনে খাল খনন করে দেওয়া হবে। যাতে কালভার্টের নিচ দিয়ে পানি প্রবাহ হয়।

 


সীমান্তের চানপুর গ্রামের বাসিন্দা দীন ইসলাম বলেন, দেশ স্বাধীনের আগে থেকেই আমরা এই এলাকায় বসবাস করছি। দীর্ঘদিন ধরে দেখে আসছি। এই সড়কের যেসব স্থানে এখন নতুন করে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেসব জায়গা দিয়ে পানি চলাচল করতে দেখিনি। পাশের ছড়া ও পানি নিষ্কাশনের জন্য আগ থেকেই কালভার্ট রয়েছে। তারপরও নতুন করে কালভার্ট নির্মাণের বিষয়টি আমাদের কাছে কোনোভাবেই যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। যেখানে পানির প্রবাহ নেই, সেখানে কালভার্ট নির্মাণ করে সরকারি টাকা খরচ করার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।

 


রাজাই গ্রামের বাসিন্দা মো. জহুর আলী বলেন, যেখানে নতুন করে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, জায়গাটি তুলনামূলকভাবে উঁচু। এখানে আগে মানুষের বসতিও ছিল। এই স্থান দিয়ে পানি চলাচল করতে আমরা কখনো দেখি নি। কালভার্ট নির্মাণের আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা পরামর্শও করা হয় নি। আমাদের সঙ্গে কথা না বলেই যেন নিজেদের সিদ্ধান্তে কালভার্ট নির্মাণের কাজ করা হচ্ছে।

 


একই গ্রামের বাসিন্দা দানিয়াল ¤্রু বলেন, যেখানে নতুন করে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে আগে কোনো ছড়া বা খাল ছিল না। এখন নতুন করে কালভার্ট নির্মাণের পাশাপাশি খালও খনন করা হবে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু তারা যে জায়গা দিয়ে খাল খনন করতে চাচ্ছে, সেটি আমাদের ফসলি জমি। এই জমিতে আমরা চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করি। জমির বৈধ কাগজপত্রও আমাদের রয়েছে এবং নিয়মিত সরকারকে খাজনা ও কর পরিশোধ করি। 

 


বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক এন্ডো সলোমার বলেন, প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই অপ্রয়োজনীয় কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় করা হচ্ছে। আশপাশের ছড়া থেকে বালু এনে নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই সঠিক পদ্ধতি নয়। এছাড়া সড়কটি প্রশস্ত করা হলে আমাদের অনেকের রেকর্ডভুক্ত জায়গা সড়কের আওতায় চলে যাবে। শুধু ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিই নয়, বিভিন্ন মিশন, মাদ্রাসা ও চার্চের জায়গাও সড়কের মধ্যে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ এসব জায়গা অধিগ্রহণের জন্য এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। 

 


তবে ছড়া থেকে বালু এনে ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. এহসুল হাসান বলেন, আমরা ছড়া থেকে কোনো বালু সংগ্রহ করে নির্মাণ কাজে ব্যবহার করছি না। স্থানীয় সরবরাহকারীদের (স্পস্নায়ার) কাছ থেকে বালু কিনে এনে কাজের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

 


সুনামগঞ্জ এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি খাস জায়গায় সড়কের জন্য ৪৮ ফুট জায়গা রয়েছে। যারা ব্যক্তিগত জমি দাবি করছেন, তাদের অধিকাংশই মূলত দখলদার। তবে তাদের দাবির সত্যতা যাচাইয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা—নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সড়কটিতে তিনটি কালভার্ট নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা ছিলো। স্থানীয়দের আপত্তির পর একটি কালভার্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হয়েছে। বর্তমানে দুটি নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হবে।

 


তিনি আরও বলেন, এখন কালভার্টের প্রয়োজনীয়তা দৃশ্যমান না হলেও বর্ষায় আকস্মিক পাহাড়ি ঢল নামলে পানি চলাচলের পথ প্রয়োজন হবে। পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকলে পানির চাপে সড়ক ভেঙে যেতে পারে। সে কারণেই পানি প্রবাহ ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন অনুযায়ী কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার