প্রকাশিত: ১১ অক্টোবর, ২০২৬ ০০:৪২
সময় ও জ্বালানি তেল বাঁচাতে জেলার তাহিরপুরের সীমান্ত নদী জাদুকাটার পরিবর্তে বিশ^ম্ভরপুরের পাহাড়ি নদী মিছাখালী উপর দিয়ে বালু—পাথরবোঝাই নৌকা চলাচল করছে। তাতে ১০ বছর আগে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ে মিছাখালী নদীর উপর নির্মিত রাবারড্যামটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ কারণে আগামী বোরো মৌসুমে ওই উপজেলার (বিশ^ম্ভরপুর) আঙ্গারুলি ও পুটিয়ার হাওরের ফসল উৎপাদন হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। মিছাখালি রাবারড্যাম দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ড্যাম হিসেবে পরিচিত।
আঙ্গারুলি ও পুটিয়ার হাওরের প্রায় ৭ হাজার হেক্টর জমিকে আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে এই ড্যাম। স্থানীয় কৃষকদের কাছে এটি বোরো আবাদের অন্যতম ভরসা। একসময় সীমান্তের ওপারের (ভারতের মেঘালয়ের) পাহড়ি ঢল মিছাখালি দিয়ে নেমে তলিয়ে যাবার আশঙ্কা নিয়ে হাওরপাড়ের ২০ টির মত গ্রামের কৃষকরা চাষবাস করতেন। রাবারড্যামের নির্মাণের পর থেকে এই দুশ্চিন্তা কমেছিল হাওরপাড়ের ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষের। এলাকাবাসী জানিয়েছেন, সম্প্রতি একটি অসাধু বালু—পাথর সিন্ডিকেট চক্র জাদুকাটা নদীর স্বাভাবিক নৌপথ এড়িয়ে রাবারড্যমের ওপর দিয়ে নৌকা চালাচ্ছে। এতে সময় ও তেল খরচ কম হলেও রাবারড্যামের রাবার ছিঁড়ে বা ক্ষতিগ্রস্ত হবার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। রাবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে বাঁধে পানি ধরে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে, যার প্রভাব পড়বে সরাসরি আগামী বোরো ফসলের উপর।
.jpg)
রাবারড্যাম পরিচালনা কমিটির অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) পক্ষ থেকে এই বিষয়ে কোনো তদারকি করা হচ্ছে না। অন্যদিকে বিএডিসির পাল্টা অভিযোগ, প্রকল্প থেকে সুবিধা ভোগ করলেও রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিচালনা কমিটির আগ্রহ নেই। সংস্থাটির দাবি, স্কিমের সুফল নেওয়া হলেও দায়িত্ব পালনে কমিটি উদাসীন।
সিরাজপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল সুবহান বলেন, এই রাবার ড্যামের নিচ দিয়ে প্রতিনিয়ত বালু—পাথরবোঝাই নৌকা চলাচল করছে। খালি নৌকাগুলোও এই পথে ফিরে যাচ্ছে। দিন—রাত অবাধে নৌকা চলাচলের কারণে রাবার ড্যামটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নৌকার ইঞ্জিনের পাখার আঘাতে রাবার কেটে গেলে প্রতিবছরই এটি মেরামত করতে হয়। এতে আর্থিক ব্যয়ের পাশাপাশি বোরোধান নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, হাওরের ফসল রক্ষার জন্যই এই রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুটি বড় হাওরসহ ছোট ছোট অনেক হাওরের হাজারো কৃষকের ফসল হুমকির মুখে পড়বে। তাই কৃষকদের স্বার্থে রাবার ড্যামটির সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
ওমরপুর গ্রামের বাসিন্দা মোজাম্মেল হক কাঁচামিয়া বলেন, রাবার ড্যামের নিচ দিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ করতে আগে অ্যাঙ্গেল দিয়ে ফাঁকা অংশগুলো বন্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু একটি অসাধু চক্র নৌকা চলাচলের সুবিধার্থে সেগুলো ভেঙে আবার ফাঁকা তৈরি করেছে। এ কারণে প্রতিনিয়ত বালু—পাথরবোঝাই নৌকা চলাচল করছে। নৌকার ইঞ্জিনের পাখার আঘাতে রাবার কেটে গেলে সেটি মেরামতের জন্য চট্টগ্রাম থেকে প্রকৌশলী আনতে হয়। দুই বছর আগে এই রাবার ড্যাম মেরামতে প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল।
.jpg)
তিনি আরও বলেন, রাবার ড্যামটির সংরক্ষণ ও মেরামতের জন্য বিএডিসি থেকে কোনো বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। নৌকা চলাচল বন্ধ করতে বিএডিসির দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অ্যাঙ্গেল দিয়ে বাধা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু বালু—পাথরের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত একটি অসাধু চক্র এবং স্থানীয় কিছু মানুষের যোগসাজশে সেগুলো ভেঙে নৌকা চলাচল অব্যাহত রাখা হয়েছে।
এভাবে নৌকা চলাচল অব্যাহত থাকলে এলাকার সম্পদ তথা দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি অবকাঠামো হুমকির মুখে পড়বে। তাই এলাকাবাসী ও দেশের স্বার্থে রাবার ড্যামটির নিরাপত্তা জোরদার এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সিরাজপুর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ বাচ্চু মিয়া বলেন, এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাবার ড্যাম। এই ড্যামের উপর দুইটি হাওরের হাজার হাজার একর জমির ফসল উৎপাদন নির্ভরশীল। অথচ বালু—পাথরবোঝাই নৌকা ড্যামের নিচ দিয়ে চলাচল করায় গুরুত্বপূর্ণ এই স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, ড্যামটির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণে সরকারি উদ্যোগের নেয়া হচ্ছে না।
তিনি বলেন, স্থানীয় একটি পরিচালনা কমিটির মাধ্যমে ড্যামটি দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া আছে। কিন্তু কমিটির পক্ষে একা এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এটি কোনো নৌপথ নয়, বরং হাওরের ফসল রক্ষার জন্য এখানে রাবার ড্যাম নির্মাণ করা হয়েছে। যাদুকাটা নদী দিয়েই নৌযান চলাচলের করবে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্র জ্বালানি খরচ ও সময় বাঁচাতে এই ড্যামের নিচ দিয়ে নৌকা চলাচল করাচ্ছে।
বাচ্চু মিয়া আরও বলেন, ড্যাম নির্মাণের সময় এর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুজন লোক নিয়োগ দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয় নি। তাই ড্যামটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
মিছাখালী রাবার ড্যাম পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী সালেহ আহমদ বলেন, রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে মিছাখালী রাবার ড্যাম এবং এর ওপর নির্মিত সেতুর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে পড়েছে। রাবারের ওপর দিয়ে প্রতিনিয়ত বালু—পাথরবোঝাই নৌকা চলাচল করায় এটি মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দুই বছর আগে নৌকার ইঞ্জিনের পাখার আঘাতে রাবার কেটে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বর্তমানে যেভাবে নৌকা চলাচল করছে, তাতে আবারও রাবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, রাবার ড্যামটি রক্ষায় পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করা হচ্ছে। সম্প্রতি এই বিষয়ে সভা করা হয়েছে এবং এলাকাবাসীকে সচেতন করতে মাইকিংও করা হয়েছে, যাতে কেউ বালু—পাথরবোঝাই নৌকা নিয়ে ড্যামের নিচ দিয়ে চলাচল না করেন। কিন্তু এসব উদ্যোগেও পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। এ কারণে বিএডিসি কর্তৃপক্ষের এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
কাজী সালেহ আহমদ আরও বলেন, গত বছর রাবার ড্যামের পাশে অ্যাঙ্গেল দিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু দিন—রাত নৌকা চলাচলের কারণে সেগুলোও কখন ভেঙে ফেলা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে আঙ্গারুলী হাওরের বোরো ফসল ঝুঁকির মুখে পড়বে। তাই দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে রাবার ড্যামটি রক্ষা করা প্রয়োজন।
.jpg)
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপনবর্মণ বললেন, এই রাবারড্যাম জীবন বাঁচিয়েছে অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের। এটি অকেজো হলে কেবল আঙ্গারুলি ও পুটিয়ার হাওর নয়। ছোট ছোট আরও অনেক হাওর ঝুঁকিতে পড়বে। এমনকি ওই হাওরগুলো ডুবলে, শনির হাওরে এসে পানির চাপ তৈরি হবে।
বিএডিসির উপসহকারী প্রকৌশলী (সেচ) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, রাবার ড্যামটির সংস্কার ও সুরক্ষার জন্য একটি প্রাক্কলন তৈরি করে পাঠানো হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এরপরও সিলেট প্রকল্পের আওতায় প্রাক্কলনটি যুক্ত করে পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় কাজ করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, রাবার ড্যামের নিচ দিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ করতে শক্ত অ্যাঙ্গেল স্থাপনের দাবি রয়েছে পরিচালনা কমিটির। তবে শুধু অ্যাঙ্গেল বসালেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। কারণ, এর আগে যেসব স্থানে অ্যাঙ্গেল বসানো হয়েছিল, সেগুলোর কিছু অংশ খুলে ফেলা হয়েছে। এখানে পাম্পমোটর চুরিসহ বিভিন্ন সমস্যা রয়েছে। ড্যামের দেখভাল ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বেও ঘাটতি রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বারবার অ্যাঙ্গেল বসিয়েও নৌকা চলাচল বন্ধ করা কঠিন হবে। একটি সিন্ডিকেট এসব বাধা সরিয়ে নৌকা চলাচল অব্যাহত রাখছে। তাই প্রথমে এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পরিচালনা কমিটির ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, ড্যাম—সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রকল্প ও সুবিধা থেকে কমিটির সদস্যরা উপকৃত হলেও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় বহনে তাদের আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। গত বছর এক সভায় উপকারভোগী হাওরের প্রতি একর জমির জন্য বছরে ৫০ টাকা করে আদায়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে তিনি জানান। প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমির ফসল রক্ষার জন্য ড্যামটি নির্মাণ করা হয়েছে। তবে আগাম বন্যায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চলতি বছর এই অর্থ আদায় করা হয় নি। এর আগে আদায় করা অর্থের হিসাব কোথায়, সে বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
মাহফুজ আরও বলেন, ড্যামের সঙ্গে ছয় কিলোমিটার পাইপলাইনসহ একটি ভাসমান পাম্প রয়েছে, যেটির সুবিধাও সংশ্লিষ্টরা ভোগ করছেন। কিন্তু এর আয়—ব্যয়ের হিসাব দেওয়া হচ্ছে না বলে তাঁর অভিযোগ। সব দায়িত্ব সরকারের উপর ছেড়ে দিলে এ ধরনের অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়ে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রাক্কলন পাঠানো, অনুমোদন নেওয়া এবং ঠিকাদার নিয়োগের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। বিএডিসির পক্ষ থেকে নিয়ম মেনেই প্রাক্কলন পাঠানো হয়েছে। তবে ড্যামটির সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বিশ^ম্ভরপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং মিছাখালী রাবার ড্যাম পরিচালনা কমিটির সভাপতি ছবাব মিয়া বললেন, বালু বোঝাই নৌকা ঠেকাতে বিএডিসি কতৃর্পক্ষের দেওয়া ব্যারিকেড ছিল একেবারেই দুর্বল। আরও শক্ত ব্যারিকেড করতে হবে। তদারকির জন্যও লোক দেওয়া প্রয়োজন। বিএডিসি এই বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে না। তারা এ ব্যাপারে উদাসীন। অন্যদিকে কৃষকরা বলছে, সরকারের স্থাপনা, আমরা কেন টাকা দেব। আমি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে মাঝে মাঝে জরুরি প্রয়োজনে খরচ করেছি। বিএডিসি সংস্কার ও মেরামতের জন্য অর্থ পেলেও এটি কীভাবে ব্যয় করে কমিটিকে জানায় না। আর আমরা যেহেতু কোন টাকাই তুলতে পারছি না, হিসাব কিসের দেখাই।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন