জমির দলিল আসল না নকল, বুঝবেন যেভাবে

প্রকাশিত: ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:১৭

সংগৃহীত ছবি

জমি কেনার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো দলিলের সত্যতা যাচাই করা। কাগজে সরকারি সিল, স্বাক্ষর, স্ট্যাম্প বা দলিল নম্বর থাকলেই সেটিকে আসল ধরে নেওয়া নিরাপদ নয়। দলিলটি সত্যিই নিবন্ধিত কি না, সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মেলে কি না এবং বিক্রেতার বৈধ মালিকানা রয়েছে কি না— এসব বিষয় যাচাই করা জরুরি।

 


বিশেষ করে জমি কেনার সময় জাল দলিল, মালিকানার অসংগতি, এক জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি কিংবা খতিয়ান ও দাগ নম্বরের গরমিলের কারণে ক্রেতাকে আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে। তাই শুধু দলিলের মূল কাগজ দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সরকারি নথি ও জমির বাস্তব অবস্থা যাচাই করা উচিত।

 

 

শুধু মূল দলিল দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন না। অনেকের ধারণা, পুরোনো কাগজ, সরকারি সিল, স্বাক্ষর কিংবা স্ট্যাম্প থাকলেই দলিল আসল। বাস্তবে এসব দেখে একা দলিলের সত্যতা নিশ্চিত করা যায় না।

 

 

দলিল যাচাইয়ের সময় নিচের তথ্যগুলো মিলিয়ে দেখতে হবে:

 

দলিল নম্বর ও নিবন্ধনের সাল

 

দলিলের তারিখ

 

কোন সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধন হয়েছে

 

ক্রেতা ও বিক্রেতার নাম

 

জমির মৌজা ও জে.এল. নম্বর

 

খতিয়ান ও দাগ নম্বর

 

জমির পরিমাণ ও শ্রেণি

 

জমির সীমানা ও অবস্থান

 

নিবন্ধনসংক্রান্ত সনদ, সিল ও স্বাক্ষরের তথ্য

 

এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে অসংগতি শনাক্ত করা সহজ হয়।

 

সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ড যাচাই করুন

 

জমির দলিল সত্যিই নিবন্ধিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডের সঙ্গে দলিলের তথ্য মিলিয়ে দেখা।

 

দলিলে উল্লেখ করা নম্বর, সাল, নিবন্ধনের তারিখ, ক্রেতা-বিক্রেতার পরিচয় এবং জমির বিবরণ সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে মিলছে কি না, তা পরীক্ষা করুন।

 

বাংলাদেশের নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ এবং নির্দিষ্ট শর্তে সংশ্লিষ্ট রেকর্ডের প্রত্যয়িত অনুলিপি পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তাই দলিলের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ থাকলে সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করে রেকর্ড যাচাই করা উচিত।

 

 

প্রত্যয়িত নকল সংগ্রহ করে তুলনা করুন

 

কোনো নিবন্ধিত দলিলের সত্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে সরকারি রেকর্ড থেকে প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একে সাধারণভাবে দলিলের সার্টিফায়েড কপি বা প্রত্যয়িত নকল বলা হয়।

 

 

কারও দেওয়া ফটোকপি বা স্ক্যান কপির ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে প্রত্যয়িত অনুলিপির জন্য আবেদন করতে পারেন। এরপর অনুলিপির সঙ্গে আপনার হাতে থাকা দলিলের তথ্য তুলনা করুন।

 

 

প্রমাণ আইন, ১৮৭২-এর ৭৬ ধারায় নির্দিষ্ট সরকারি নথির প্রত্যয়িত অনুলিপি দেওয়ার বিধান রয়েছে। একই আইনের ৭৯ ধারায় আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে প্রত্যয়িত কিছু সরকারি নথির সত্যতা সম্পর্কে আদালতের অনুমানের কথা বলা হয়েছে।

 

 

তবে প্রত্যয়িত অনুলিপি পাওয়া গেলেই জমিটির মালিকানা নিয়ে সব ধরনের বিরোধের অবসান হয়েছে, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।

 

দলিলের দাগ ও খতিয়ান নম্বর মিলিয়ে দেখুন

 

জমির দলিল যাচাইয়ের সময় শুধু দলিল নম্বর বা মালিকের নাম দেখলে হবে না। দলিলে উল্লেখ করা দাগ ও খতিয়ান নম্বর সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ডের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি।

 

 

খতিয়ানে জমির রেকর্ডভুক্ত মালিকের নাম ও জমির বিবরণ পাওয়া যায়। অন্যদিকে, দাগ নম্বরের মাধ্যমে মৌজা মানচিত্রে নির্দিষ্ট জমির অবস্থান শনাক্ত করা যায়।

 

 

পুরোনো জমির ক্ষেত্রে বিভিন্ন জরিপে দাগ নম্বর পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পুরোনো দলিলের দাগ নম্বরের সঙ্গে বর্তমান রেকর্ডের নম্বর না মিললে সংশ্লিষ্ট জরিপের তথ্য যাচাই করতে হবে।

 

 

বিক্রেতার নাম খতিয়ানে আছে কি না দেখুন

 

কেউ দলিল দেখিয়ে জমির মালিকানা দাবি করলেই তাঁকে বৈধ মালিক ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিক্রেতা কীভাবে জমির মালিক হয়েছেন, সেটিও যাচাই করতে হবে।

 

 

এ জন্য বিক্রেতার দলিল, সর্বশেষ খতিয়ান এবং নামজারির তথ্য মিলিয়ে দেখুন। জমিটি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া হলে ওয়ারিশসংক্রান্ত নথি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

 

 

নামজারি বা মিউটেশন হলো ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। তবে শুধু নামজারি সম্পন্ন হওয়াকে চূড়ান্ত মালিকানার একমাত্র প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

 

 

আগের দলিলের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করুন

 

একটি জমি একাধিকবার হাতবদল হয়ে থাকলে বর্তমান মালিক কীভাবে মালিকানা পেয়েছেন, তা যাচাই করা জরুরি। এ জন্য শুধু সর্বশেষ দলিল নয়, প্রয়োজনে আগের দলিলগুলোও পরীক্ষা করতে হবে।

 

 

যেমন, বিক্রেতা যদি আগের কোনো মালিকের কাছ থেকে জমি কিনে থাকেন, তাহলে তাঁর মালিকানা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা সংশ্লিষ্ট নথির মাধ্যমে যাচাই করুন। উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়া হলে মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং প্রযোজ্য অন্যান্য নথি পরীক্ষা করা যেতে পারে।

 

 

মনে রাখতে হবে, একটি দলিল আসল হলেও জমিটির মালিকানা নিয়ে অন্য জটিলতা থাকতে পারে। তাই ‘দলিল আসল’ এবং ‘জমিটি নিরাপদে কেনা যাবে’—এ দুটি বিষয় এক নয়।

 

 

জমির পরিমাণ ও সীমানা সরেজমিনে যাচাই করুন

 

দলিলে জমির পরিমাণ লেখা থাকলেও বাস্তবে জমির অবস্থান ও সীমানা একই আছে কি না, তা দেখে নেওয়া প্রয়োজন।

 

যাচাই করুন:

 

দলিলে উল্লেখিত জমির পরিমাণ

 

খতিয়ানে থাকা জমির পরিমাণ

 

দাগ নম্বর ও মৌজার তথ্য

 

চারপাশের সীমানা

 

জমির বাস্তব অবস্থান

 

রাস্তা ও সংলগ্ন জমির অবস্থান

 

প্রয়োজনে অভিজ্ঞ আমিন বা সার্ভেয়ার দিয়ে জমি পরিমাপ করান। দলিল, খতিয়ান ও মৌজা মানচিত্রের তথ্যের সঙ্গে সরেজমিনে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখুন।

 

 

বিক্রেতার পরিচয় যাচাই করাও জরুরি

 

দলিলে উল্লেখ করা বিক্রেতা এবং বাস্তবে জমি বিক্রি করতে আসা ব্যক্তি একই ব্যক্তি কি না, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

 

বিক্রেতার পরিচয়পত্র, দলিলের তথ্য এবং মালিকানার কাগজপত্র পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন। বিক্রেতা অন্য কারও প্রতিনিধি হলে তাঁর বিক্রির আইনগত ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদন আছে কি না, সেটিও যাচাই করা উচিত।

 

 

নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৩৪ ধারায় নিবন্ধনের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উপস্থিতি, দলিল সম্পাদনের বিষয় এবং পরিচয় যাচাইসংক্রান্ত বিধান রয়েছে।

 

দলিলে কাটাছেঁড়া বা অস্বাভাবিক সংশোধন দেখলে সতর্ক হোন

 

দলিলের কোনো অংশে অস্বাভাবিক কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা, ভিন্ন কালি, অস্পষ্ট নম্বর, অস্বাভাবিক সিল কিংবা সংশোধন দেখা গেলে বিষয়টি যাচাই না করে এগোনো উচিত নয়।

 

 

তবে শুধু কাগজের চেহারা দেখে দলিলকে জাল বলা যাবে না। পুরোনো নথিতে স্বাভাবিকভাবেও কাগজের ক্ষয়, কালি বা ছাপের পার্থক্য থাকতে পারে।

 

তাই সন্দেহজনক বিষয় থাকলে সংশ্লিষ্ট সরকারি রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখুন।

 

নিবন্ধন নম্বর থাকলেই কি সব ঝুঁকি শেষ?

 

না। কোনো দলিলের নিবন্ধন নম্বর পাওয়া গেলেই জমিটি কেনার ক্ষেত্রে আর কোনো ঝুঁকি নেই, এমনটি ধরে নেওয়া যাবে না।

 

কারণ দলিলটি নিবন্ধিত হলেও—

 

বিক্রেতার বর্তমান মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে;

 

উত্তরাধিকারীদের দাবি থাকতে পারে;

 

একই জমির ওপর অন্য কারও দাবি বা বিরোধ থাকতে পারে;

 

খতিয়ান ও বাস্তব দখলের মধ্যে অসংগতি থাকতে পারে;

 

জমির পরিমাণ বা সীমানা নিয়ে সমস্যা থাকতে পারে।

 

তাই দলিলের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি জমির মালিকানা, দখল, রেকর্ড এবং মালিকানার ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা জরুরি।

 

দলিলের তথ্য না মিললে কী করবেন?

 

দলিলের তথ্য এবং সরকারি রেকর্ডের মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেলে তাড়াহুড়া করে টাকা পরিশোধ বা জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেবেন না।

 

প্রথমে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও ভূমি অফিসের নথি দেখে পার্থক্যের কারণ যাচাই করুন। প্রয়োজন হলে প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করুন এবং ভূমি আইনজীবীর সহায়তা নিন।

 

 

দলিল নিবন্ধন নিয়ে আনুষ্ঠানিক বিরোধ তৈরি হলে নিবন্ধন আইনে নির্দিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে। কোন পদক্ষেপ প্রযোজ্য হবে, তা বিরোধের ধরন ও সংশ্লিষ্ট নথির ওপর নির্ভর করে।

 

 

জমির দলিল যাচাইয়ের চেকলিস্ট

 

জমি কেনার আগে নিচের বিষয়গুলো যাচাই করে নিন

 

১. দলিল নম্বর, সাল ও তারিখ সঠিক কি না।

 

২. সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের রেকর্ডে দলিলটির তথ্য পাওয়া যায় কি না।

 

৩. ক্রেতা ও বিক্রেতার পরিচয় মেলে কি না।

 

৪. জমির মৌজা, খতিয়ান ও দাগ নম্বর ঠিক আছে কি না।

 

৫. বিক্রেতার মালিকানার বৈধ ধারাবাহিকতা রয়েছে কি না।

 

৬. সর্বশেষ খতিয়ান ও নামজারির তথ্য যাচাই করা হয়েছে কি না।

 

৭. জমির পরিমাণ ও সীমানা সরেজমিনে মিলেছে কি না।

 

৮. কোনো বিরোধ, অন্যের দাবি বা দখলসংক্রান্ত সমস্যা রয়েছে কি না।

 

৯. প্রয়োজনে সরকারি রেকর্ড থেকে প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করা হয়েছে কি না।

সূত্র: যুগান্তর .কম

জাতীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার