প্রকাশিত: ২৬ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১৫
সংগৃহীত ছবি
চলতি আগস্ট মাসের দ্বিতীয়ার্ধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের পরিকল্পনা অন্তত দু’দুবার একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে বাতিল হয়েছে। সফরের দিনক্ষণও প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল, তার পরেও তার আসা হয়নি।
অথচ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ছ’মাসে আগেই – গত ফেব্রুয়ারিতে তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে সেই চিঠি তারেক রহমানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা নিজেই।
এরপর সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে দিল্লিতে যে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তার আউটরিচ সেসনেও বিমস্টেক জোটের চেয়ার হিসেবে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে গত মাসেই।
ফলে দু’দুটি আমন্ত্রণ হাতের কাছে মজুত – এবং গত দিন দশেকের ভেতরে অন্তত দু’দুবার তার দিল্লি সফরের দিনক্ষণও স্থির হয়ে গিয়েছিল।
তবে ঘটনা হল, শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান এখনো দিল্লির মাটিতে পা রাখেননি – এবং একবার তো রাষ্ট্রপতি ভবনে সফররত বিদেশি অতিথিকে যে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা দেওয়ার রীতি আছে, তার মহড়া পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছে প্রায় নজিরবিহীনভাবে।
কিন্তু কেন এভাবে শেষ মুহূর্তে বারবার ভেস্তে যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সফর?
কী নিয়ে তৈরি হচ্ছে জটিলতা, আর ভারতই বা গোটা বিষয়টিকে কীভাবে দেখছে?
শেখ হাসিনা ফ্যাক্টর
প্রস্তাবিত এই সফর যে এখনো হতে পারেনি, তার প্রধান কারণ – ঘোষিত এবং অঘোষিত দুটোই – ভারতে শেখ হাসিনার উপস্থিতি।
বাংলাদেশ এটা আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে, শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ বা তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি পূর্ণ না হলে সফরের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়।
আর ভারতের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, প্রত্যর্পণের অনুরোধ অবশ্যই বিবেচনাধীন আছে – কিন্তু ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা যা বলছেন বা করছেন সেটা তার ব্যক্তিগত বা ইন্ডিভিজুয়াল ক্যাপাসিটিতে করছেন, তার সঙ্গে দিল্লির কোনো সম্পর্ক নেই – দিল্লি তার কথা অনুমোদনও করে না।
কিন্তু মুশকিল হলো, মুখে যাই বলা হোক, এখানে ঢাকা বা দিল্লি কেউ কারো কথা বিশ্বাস করছে না।
ঢাকার বিশ্বাস, শেখ হাসিনা যেভাবে গত ৫ অগাস্ট দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে অনলাইনে যুক্ত হয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন – তা কখনোই ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছাড়া সম্ভব ছিল না। কড়া প্রেস বিবৃতি জারি করে তারা সেটা বুঝিয়েও দিয়েছে।
আর ভারতের বিশ্বাস, মুখে প্রত্যর্পণের কথা বললেও বাংলাদেশ সরকার আসলে মোটেই চায় না শেখ হাসিনাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক – কারণ তাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়বে, বিএনপি সরকারের পক্ষে পরিস্থিতি সামলানো আরও কঠিন হবে।
মানে ভারত মনে করছে প্রত্যর্পণের দাবিটা একটা অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ফলে শেখ হাসিনা ফ্যাক্টর সফরের জন্য অবশ্যই প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে – কিন্তু দুই দেশ ঠিক যে ভাষায় কথাটা বলছে, আসল কারণটা ঠিক সেরকম নয়।
তাহলে এখন সমাধানের উপায়?
ভারতের বক্তব্য হলো, শেখ হাসিনাকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রিজমের বাইরে রেখেই ঢাকা ও দিল্লি তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে পারে।
ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও দিনকয়েক আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাতে ঠিক এই বার্তাই দিয়েছেন।
তবে বাংলাদেশ বলছে, যে শেখ হাসিনার শাসনামলকে বাংলাদেশের একটা বিরাট অংশ মূর্তিমান স্বৈরাচার হিসেবে দেখে, তিনি যে দেশের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে আছেন সেখানে তারেক রহমানের সফর করতে যাওয়াটা দেশের অনেক মানুষ ভালভাবে নেবেন না।
ফলে ভারতকে এটা অন্তত দেখাতে হবে যে তারা শেখ হাসিনার রাশ টেনে ধরছে।
ভারতের কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন, বাংলাদেশ যাতে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য জেদ ধরে না থাকে – বরং তিনি যে ডিসেম্বরে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা বলেছেন, সেটার পথ প্রশস্ত করার জন্যই চেষ্টা করে – তারা ঢাকাকে সেটাই বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
সাউথ ব্লকের একজন কর্মকর্তা এমনও বলেছেন, ‘ওনার বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া এবং বিচার প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হওয়া নিয়ে মূল কথা। তো উনি যখন নিজে থেকেই ফিরতে চাইছেন, আমাদের জোর করে ফেরত পাঠানোর চেয়ে তো সেটা অনেক ভাল, তাই না?’
সুতরাং সেই প্রক্রিয়া নিয়ে কোনও সমঝোতা হলে তারেক রহমানের সফরে বাধাটাও কেটে যাবে, এটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশ্বাস।
একটা জিনিস কিন্তু দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, যতই বাধাবিপত্তি থাকুক – ভারত প্রবলভাবেই চায় তারেক রহমান যত দ্রুত সম্ভব দিল্লিতে আসুন, সর্বোচ্চ স্তরে সরাসরি কথাবার্তা শুরু হোক।
কারণ দু’বছরের ওপর হল বাংলাদেশে ভারতের অনেক প্রকল্পের কাজ থমকে আছে, গঙ্গা চুক্তি নবায়নের আলোচনা কার্যত বন্ধ, বহু বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এখনো বহাল – এবং তারেক রহমান কিছুদিন আগে চীন সফরও সেরে এসেছেন।
ভারতের ধারণা, বিভিন্ন জরুরি কারণে বাংলাদেশও চায় তারেক রহমানের দিল্লি সফর বাস্তবায়িত হোক – কিন্তু ‘ডোমেস্টিক অডিয়েন্স’ বা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি জনিত বাধাবিপত্তিতেই সেটা সম্ভব হচ্ছে না।
এখন দিল্লি মনে করছে, দ্বিপাক্ষিক সফর এই মুহূর্তে যদি সম্ভব নাও হয়, বিমস্টেক চেয়ারপার্সন হিসেবে ব্রিকসের বহুপাক্ষিক ফোরাম তারেক রহমানের ভারতে আসার একটা সুযোগ করে দিতেই পারে।
মাল্টিল্যাটারাল ফোরামগুলোর আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ভারত-পাকিস্তানকেও অনেক ক্ষেত্রে একই টেবিলে বসতে বাধ্য করে, কখনো কখনো সাইডলাইনে আলাদা আলোচনারও সুযোগ করে দেয়।
আর তারেক রহমান ব্রিকসের জন্য দিল্লিতে এলে নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তার আলাদা বৈঠক হবে এটা তো একরকম অবধারিত।
ফলে দিল্লির ধারণা, তিনি হয়তো এই সুযোগটা শেষ পর্যন্ত নেবেন।
দিল্লিতে কর্মকর্তারা যে কারণে বলছেন-শেখ হাসিনা ইস্যুতে আমরা অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছি, সমাধানের ফর্মুলাও দিয়েছি – এখন দিল্লিতে তারেক রহমান আসবেন কিনা সেই বল কিন্তু তাদের কোর্টেই!
সূত্র: যুগান্তর .কম
এমডি
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন