অক্টোবরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি

প্রকাশিত: ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৫৭

সংগৃহীত ছবি 

ডেঙ্গুর মৌসুমি প্রবণতা এবারও উদ্বেগের বার্তা দিচ্ছে। বর্ষা শুরুর পর জুন থেকে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করে জুলাইয়ে তা গতি পায় এবং আগস্টে এসে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ঊর্ধ্বমুখী। ফলে শুধু চলতি সেপ্টেম্বর নয়, আগামী অক্টোবরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার যথেষ্ট ঝুঁকি দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

 

 

তাদের মতে, এখনই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিতকরণ, হাসপাতালের প্রস্তুতি এবং জনসম্পৃক্ততা জোরদার করা না গেলে সেপ্টেম্বরের শেষ ভাগ ও অক্টোবরে পরিস্থিতি নতুন সংকটের মুখে পড়তে পারে।

 

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪০ হাজার ৪৪ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ১১১ জন। চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৩৭ হাজার ১৯৩ জন।

 

 

৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন ২ হাজার ৭৪০ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫১২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং এ সময়ে ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি।

 

 

মাসভিত্তিক হিসাবে চলতি বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম ছিল। জানুয়ারিতে ১ হাজার ৮১, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯, মার্চে ৩৫৩, এপ্রিলে ৬৪০ এবং মে মাসে ৭১৪ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। জুনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৭ জনে। জুলাইয়ে আরও বেড়ে হয় ৯ হাজার ২০৬ জন। আর আগস্টে এক লাফে ২০ হাজার ৫৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন।

 

 

মৃত্যুর হিসাবেও আগস্ট ছিল চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ মাস। জানুয়ারিতে ২, ফেব্রুয়ারিতে ২, মে মাসে ১, জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬ এবং আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ শুধু আগস্টেই মারা গেছেন ৪৩ জন, যা চলতি বছরের মোট মৃত্যুর বড় অংশ।

 

 

সেপ্টেম্বরের শুরুতেও সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। ৩ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ২৫২ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং চারজনের মৃত্যু হয়। পরদিন ৪ সেপ্টেম্বর নতুন করে ৫১২ জন হাসপাতালে ভর্তি হলেও কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ফলে সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই দিনের উচ্চ ভর্তি সংখ্যা এবং আগস্টের ব্যাপক সংক্রমণ সামনে রেখে এ মাসের শেষ ভাগ ও অক্টোবরে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু সেপ্টেম্বর নয়, আগামী অক্টোবরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, আগস্টের পর রোগী ও মৃত্যুর চাপ বাড়তে থাকে। এই চাপ সেপ্টেম্বর, অক্টোবর এমনকি নভেম্বর পর্যন্ত চলতে থাকে।

 

 

তিনি বলেন, এবারও আগস্টে সংক্রমণ ও মৃত্যুর যে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে, সেটি উদ্বেগের। কোথায় এডিস মশার ঘনত্ব বাড়ছে এবং কোন এলাকায় রোগী বাড়ছে- এ দুটি বিষয় একসঙ্গে নজরদারিতে আনতে হবে। মশক নিধনে কমিউনিটিকে যুক্ত করা প্রয়োজন। ভলান্টিয়ারের মাধ্যমে গোটা কমিউনিটিকে সচেতন করার পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।

 

 

এ ছাড়া ডেঙ্গু শনাক্তের পরীক্ষা বিনামূল্যে ব্যবস্থা করতে হবে। এতে করে সাধারণ মানুষ জ্বর হলেও দ্রুত পরীক্ষা করবে এবং জটিলতা দেখা দিলে দ্রুতই হাসপাতালে যেতে পারবে।

 

ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রাজধানীকে গুরুত্ব দিলে হবে না; ডেঙ্গু এখন দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাই জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রোগী শনাক্ত, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে স্থানীয় জনগণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের মূল কাজ হাসপাতালের বাইরে- বাড়ি, পাড়া-মহল্লা ও কর্মস্থল থেকেই শুরু করা প্রয়োজন।

 

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, আগস্টের শেষ দিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যেভাবে বেড়েছে, তাতে সেপ্টেম্বর নিয়ে উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও জমে থাকা পানিতে এডিস মশার প্রজনন- এ তিনটি বিষয় সংক্রমণ বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত প্রজননস্থল ধ্বংস এবং স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা। শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে কিংবা হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এডিস নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

 

 

একই সঙ্গে ঢাকার বাইরে চিকিৎসাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার ওপরও জোর দেন তিনি। কারণ আক্রান্ত বাড়লেও ঢাকায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক ভালো থাকায় মৃত্যু কম হচ্ছে। কিন্তু জেলা পর্যায়ে সেই সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হতে পারে।

 

সেপ্টেম্বরেই কেন বাড়ে ডেঙ্গু

 

ডেঙ্গুর মৌসুমি প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে সাধারণত আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি থাকে। বর্ষায় বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, ড্রেন, পরিত্যক্ত টায়ার ও অন্যান্য স্থানে জমে থাকে। বৃষ্টি থামার পর এসব জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ে। ফলে বৃষ্টির পরপরই নয়, বরং কিছুটা সময়ের ব্যবধানে সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

 

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সেপ্টেম্বরকে শুধু আরেকটি মাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জুলাই-আগস্টে তৈরি হওয়া প্রজননস্থল থেকে উৎপন্ন এডিস মশার বিস্তার এবং মানুষের মধ্যে এরই মধ্যে চলমান সংক্রমণ- দুটি বিষয় একসঙ্গে সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

 

 

গত তিন বছরের ডেঙ্গু পরিসংখ্যানও এ বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর নিয়ে উচ্চঝুঁকির বার্তা দিচ্ছে। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে রেকর্ড ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। একই সময়ে ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়। ওই বছরই সেপ্টেম্বর ছিল সংক্রমণ ও মৃত্যুর সর্বোচ্চ মাস। ২০২৪ সালে দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন এবং মারা যান ৪১৩ জন।

 

আগস্টের গতি বাড়াচ্ছে সেপ্টেম্বরে শঙ্কা

 

চলতি বছরের প্রবণতায় দেখা যাচ্ছে, জুনের পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে ভর্তি হয়েছেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন। অর্থাৎ জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। একই সঙ্গে জুলাইয়ের ৩৬ মৃত্যুর বিপরীতে আগস্টে মারা গেছেন ৪৩ জন।

 

 

সেপ্টেম্বরের শুরুতেও এক দিনে ১ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার নজির দেখা গেছে। ৩ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ২৫২ জন ভর্তি হওয়ার পর চারজনের মৃত্যু হয়। তবে ৪ সেপ্টেম্বর নতুন ভর্তি রোগীর সংখ্যা কমে ৫১২ জনে নামে এবং কোনো মৃত্যু হয়নি। ফলে সেপ্টেম্বরের প্রতিদিনই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হচ্ছে- এমন তথ্য সঠিক নয়।

 

 

তবে আগস্টে তৈরি হওয়া সংক্রমণের চাপ এবং সেপ্টেম্বরের শুরুতে রোগী ভর্তির উচ্চ হার বিবেচনায় নিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর- দুই মাসেই স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি হতে পারে।

 

নতুন সেরোটাইপও বাড়াচ্ছে উদ্বেগ

 

২০২৬ সালের পরিস্থিতিতে আরেকটি বিষয়ও বিশেষভাবে উদ্বেগ তৈরি করছে- ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপের পরিবর্তন। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে দেশে ডেন-৩-এর উপস্থিতি বেড়েছে বলে উঠে এসেছে। ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৭১ জনের নমুনা বিশ্লেষণে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-৩ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-২ পাওয়া গেছে।

 

 

একজন ব্যক্তি আগে এক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকলে পরবর্তী সময়ে ভিন্ন সেরোটাইপে সংক্রমিত হলে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলেই গুরুতর রোগ হবে- এমন সরল সিদ্ধান্তও বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।

 

জ্বর কমলেই বিপদ শেষ নয়

 

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো- দেরি না করা। ডেঙ্গুর গুরুতর পর্যায় অনেক সময় জ্বর কমার সময় শুরু হয়। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব; এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার বিকল্প নেই।

 

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালকেন্দ্রিক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত, স্থানীয় পর্যায়ে মশক নিয়ন্ত্রণ, বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বোপরি জনগণের অংশগ্রহণ- এই সবগুলো উদ্যোগ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে। এখনই সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নেওয়া গেলে সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সম্ভাব্য বড় ঢেউয়ের ঝুঁকি কমানো সম্ভব; অন্যথায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: কালবেলা .কম
এমডি

জাতীয় থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার