প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:২০
সংগৃহীত ছবি
সরকারি চাকরিজীবীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের অনুমোদন দেওয়া হলেও এখনো এর গেজেট প্রকাশ হয়নি। গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।
এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এক সপ্তাহের জায়গায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু গেজেটের কোনো খবর নাই। সেজন্যই সবার মধ্যে একটা উদ্বেগ কাজ করছে যে, আবার কোথায় আটকালো!’
তবে সাবেক আমলারা বলছেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের আগে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এ কারণে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কখনো কখনো এক মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার পর গেজেট প্রকাশের জন্য যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেখানে কয়েক সপ্তাহ এমনকি অনেক সময় মাসও লেগে যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিন পর পে-স্কেলের ঘোষণা আসায় এবার বিষয়টি নিয়ে হতাশা তৈরি হয়েছে।
কোথায় আটকে আছে গেজেটের প্রক্রিয়া?
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানোর কথা। কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও সেটি এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে পৌঁছায়নি।
আইন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, গত সপ্তাহে তারা শুনেছিলেন যে দুই-এক দিনের মধ্যেই অনুমোদিত পে-স্কেলের খসড়া ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। কিন্তু রোববার বিকেল পর্যন্ত সেটি মন্ত্রণালয়ের হাতে পৌঁছেনি।
অর্থাৎ, বর্তমানে নবম পে-স্কেলের গেজেটের খসড়া অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছেই রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অবশ্য এটিকে ‘আটকে থাকা’ বলতে নারাজ। তার ভাষ্য, গেজেট প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে কিছুটা সময় লাগছে।
তিনি জানান, সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কীভাবে কার্যকর করা হবে, সে বিষয়গুলো যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে। দ্রুতই এটি আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। এরপর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
গেজেট প্রকাশের আগে কী কী প্রক্রিয়া?
মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের আগে যে খসড়া পাঠানো হয়, তাতে মূলত বিভিন্ন গ্রেডে বেতন-ভাতা কতটা বাড়বে তার প্রস্তাব থাকে। কিন্তু অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনের জন্য আরও বিস্তারিত খসড়া তৈরি করতে হয়।
সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ জানান, অনুমোদনের পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কোন শ্রেণিতে কীভাবে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন হবে, তার বিস্তারিত হিসাব ও নির্দেশনা প্রজ্ঞাপনে যুক্ত করতে হয়।
জনপ্রশাসনের পাশাপাশি সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, সেটিও খসড়ায় স্পষ্ট করতে হয়।
খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে সংবিধান, চাকরি-সংক্রান্ত আইন ও অন্যান্য বিধানের সঙ্গে প্রস্তাবিত কাঠামোর কোনো বিরোধ রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হয়।
এ ছাড়া প্রজ্ঞাপনে ব্যবহৃত শব্দ, বাক্য ও আইনি পরিভাষায় কোনো অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজনীয় বিধিমালা ও সংবিধিবদ্ধ আদেশের খসড়াও এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়।
আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে চূড়ান্ত খসড়া আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে যায়। এরপর সেটি সরকারি মুদ্রণালয় বা বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। মুদ্রণ শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে।
এর আগে কত সময় লেগেছিল?
এর আগে সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।
এরপর ১৫ ডিসেম্বর, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন মাস পর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল অর্থ মন্ত্রণালয়।
কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের আগে প্রশাসনিক ও আইনগত নানা প্রস্তুতির প্রয়োজন হয় বলেই সময় লাগে।
নতুন পে-স্কেলে কার কত বেতন বাড়ছে?
নতুন বেতন কাঠামোতে অনেক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে।
প্রথম থেকে ১১তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ অনেকের মূল বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।
সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হয়েছে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত। নতুন কাঠামো অনুযায়ী তাদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা।
অন্যদিকে প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। এটি চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে জুলাই মাস থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাওয়ার কথা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের।
প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য নতুন বেতন-ভাতা বাস্তবায়নে সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
অপেক্ষা গেজেটের
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য দীর্ঘ এক দশকের অপেক্ষার পর নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা এসেছে। কিন্তু মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের প্রায় দুই সপ্তাহ পরও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—কবে প্রকাশ হবে বহুল প্রতীক্ষিত নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন?
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা অবশ্য আশ্বস্ত করেছেন, প্রক্রিয়াটি এগিয়ে চলছে এবং দ্রুতই খসড়া আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হবে। এরপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
সূত্র: কালবেলা .কম
এমডি
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন