পে স্কেল বাস্তবায়নে অতীতে কেমন সময় লেগেছে?

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৩৮

সংগৃহীত ছবি 

এক সপ্তাহের জায়গায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও নতুন পে স্কেলের প্রজ্ঞাপন এখনো হয়নি। এ নিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যদিও সাবেক আমলারা বলছেন, মন্ত্রিসভা অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের পুরো প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কখনো মাসও লেগে যেতে পারে।

 

 

সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়াকে কেন্দ্র করেই এই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার কথা থাকলেও গত ১০ বছরে তা হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর গত ৩১ আগস্ট নতুন বেতন কাঠামোর অনুমোদন দেয় সরকার। মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবেও তা জানানো হয়। তখন সপ্তাহখানেকের মধ্যে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে বলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল।

 

 

কিন্তু প্রায় দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকের মধ্যেই হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

 

তবে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, প্রজ্ঞাপন প্রকাশে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি অনেক সময় মাসও লেগে যেতে পারে।

 

 

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার পর গেজেট প্রকাশের জন্য যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, সেখানে কয়েক সপ্তাহ, এমনকি অনেক সময় মাসও লেগে যেতে পারে। কিন্তু এবার বিষয়টি ঘিরে হতাশা দেখা যাচ্ছে, যেহেতু অনেকদিন পর পে-স্কেলের ঘোষণাটা এসেছে।

 

অতীতে কত সময় লেগেছিল

 

চলতি বছরের আগে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছরের ৭ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। এরপর একই বছরের ১৫ ডিসেম্বর, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে তিন মাস পর চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

 

 

কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপন প্রকাশের জন্য বেশ কিছু প্রশাসনিক ও আইনগত প্রস্তুতি এবং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রথম ধাপেই নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের বিস্তারিত খসড়া প্রস্তুত করতে হয়। এই কাজ করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

 

 

সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ বিবিসি বাংলাকে বলেন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের আগে যে খসড়া পাঠানো হয়, সেখানে মূলত কোন গ্রেডে কত টাকা বেতন-ভাতা বাড়ানো হবে, তার প্রস্তাব থাকে। কিন্তু অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির সময় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে কীভাবে তা বাস্তবায়ন হবে, তার বিস্তারিত হিসাব ও নির্দেশনা যুক্ত করা হয়।

 

 

জনপ্রশাসনের বাইরে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), পুলিশ, সরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কার্যকর করা হবে, খসড়ায় তারও বিস্তারিত বিবরণ দিতে হয়।

 

 

ড. আনোয়ার উল্ল্যাহ বলেন, আগে থেকে প্রস্তুতি না থাকলে অনেক সময় এসব কাজ করতেই বেশ খানিকটা সময় লেগে যায়।

 

আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং

 

বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য তা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোয় সংবিধান বা চাকরি সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনের ব্যত্যয় বা বিরোধ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হয়।

 

 

একই সঙ্গে প্রজ্ঞাপনের খসড়ায় ব্যবহৃত বিভিন্ন শব্দ, বাক্য ও আইনি পরিভাষায় কোনো অস্পষ্টতা বা দ্ব্যর্থবোধকতা আছে কি না, সেটিও যাচাই করা হয়। এর উদ্দেশ্য হলো পরবর্তী সময়ে কোনো আইনি জটিলতা বা ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ বন্ধ করা।

 

 

পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য যেসব বিধিমালা বা সংবিধিবদ্ধ আদেশ জারি করা প্রয়োজন, সেগুলোর খসড়াও চূড়ান্ত করা হয়।

 

সাবেক সচিব ড. মো. আনোয়ার উল্ল্যাহ জানান, এসব প্রক্রিয়া শেষ করে প্রজ্ঞাপনের চূড়ান্ত খসড়া আইন মন্ত্রণালয় থেকে আবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।

 

চূড়ান্ত খসড়া পাওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা তা মুদ্রণের জন্য সরকারি মুদ্রণালয়, তথা বিজি প্রেসে পাঠান। মুদ্রণের পর তা সংগ্রহ করে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়।

 

এখনও আইন মন্ত্রণালয়ে যায়নি খসড়া

 

মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর প্রায় দুই সপ্তাহ পার হলেও নতুন বেতন কাঠামোর প্রজ্ঞাপনের খসড়া যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এখনো আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।

 

আইন মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে বলেন, গত সপ্তাহ আমরা শুনেছিলাম যে, দুই-এক দিনের মধ্যেই অনুমোদিত পে-স্কেলের ড্রাফটটা ভেটিংয়ের জন্য আমাদের কাছে পাঠানো হবে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেটা আমাদের হাতে আসেনি।

 

 

খসড়াটি এখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে। মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেওয়ার দুই সপ্তাহ পরও সেটি আইন মন্ত্রণালয়ে যায়নি কেন—এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এটি আটকে রাখার বিষয় নয়। গেজেট আকারে প্রকাশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে কিছুটা সময় লাগছে।

 

 

মূলত এখন সামরিক-বেসামরিক বিভিন্ন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাসহ প্রজ্ঞাপনের খসড়া তৈরির কাজ চলছে।

 

 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেন, দ্রুতই ভেটিংয়ের জন্য এটা আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, তারপর প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

 

কার কত বেতন বাড়ছে

 

এক দশকেরও বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীরা যে নতুন বেতন কাঠামো পাচ্ছেন, সেখানে অনেকের বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ তাদের বেতন আগের তুলনায় দ্বিগুণ হচ্ছে।

 

 

অন্যদিকে, সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে নতুন পে স্কেলে তাদের সর্বনিম্ন মূল বেতন দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার টাকা। প্রথম গ্রেডের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।

 

 

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন পে স্কেল মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। অর্থাৎ জুলাই মাস হিসাব করেই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পে স্কেলের সুবিধা পাবেন।

 

 

প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এই বেতন-ভাতা দিতে সরকারের বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।

 

এর আগে ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে ‘জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫’ গঠন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই কমিশন গত ২২ জানুয়ারি সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন জমা দেয়, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।

 

 

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, বিদ্যমান সর্বনিম্ন বেতন স্কেল ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ধাপ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

 

 

এ ছাড়া বৈশাখী ভাতার হার বর্তমানের ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ এবং যাতায়াত ভাতা প্রদানের ক্ষেত্রেও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত ব্যাপক সংস্কারের কথা বলা হয়েছিল।

 

 

বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চলতি বছরের ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

 

সেই কমিটির সুপারিশ আমলে নিয়ে নতুন বেতন কাঠামোর অনুমোদন দেয় তারেক রহমানের সরকার।
সূত্র: যুগান্তর .কম
এমডি

জাতীয় থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার