প্রকাশিত: ২৮ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:৫২
আইজিপির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী ফিরলে: তথ্য উপদেষ্টা
সংগৃহীত ছবি
অনুমতি পেলে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করতে পিছপা হবে না বলে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির যে মন্তব্য করেছেন, তা সরকারকে বিব্রত করার মতো বলে মনে করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেছেন, ‘একটা পুলিশ বাহিনীর প্রধান সরকারের একটা অংশ। তিনি আবার ক্রসফায়ারের কথা বলেন। যদি স্লিপ অব টাং করে বলেন, সেটা ভিন্ন ব্যাপার; কিন্তু এটা তো সরকারকে বিব্রত করার মতো অবস্থা।’
জাতীয়তাবাদী যুবদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর জিয়া উদ্যানে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি।
রুহুল কবির রিজভী আরও বলেছেন, যে বিএনপি দীর্ঘদিন গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সেই দলের সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় পুলিশপ্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের কথা তাদের ভাবিয়ে তুলছে।
গত ১৭ বছর বিএনপি ক্রসফায়ার, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, রক্তক্ষরণ ও ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে বলে উল্লেখ করে রিজভী বলেন, ‘সেই সংগ্রামের পরিণতিতে আমরা ৫ আগস্ট পেয়েছি, জুলাই পেয়েছি। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর সারাদেশের মানুষের প্রত্যাশা একটি মানবিক বাংলাদেশ। এমন প্রত্যাশার মধ্যে পুলিশ বাহিনীর প্রধানের মুখে ক্রসফায়ারের মতো কথা তাদের ভাবিয়ে তুলছে।’
অপরাধ দমনে দেশে পর্যাপ্ত আইন রয়েছে উল্লেখ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বলেন, এসব আইন প্রয়োগের দায়িত্ব আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। প্রচলিত আইন দিয়েই সন্ত্রাস ও অপরাধ দমন সম্ভব। কিশোর অপরাধের প্রবণতা বৃদ্ধি এবং ঢাকার কয়েকটি এলাকায় অপরাধের ঘটনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
রিজভী বলেন, পুলিশ বাহিনীতে অনেক সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা রয়েছেন। তাদের কাজে লাগাতে হবে। কোনো ধরনের প্রভাব ছাড়াই আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা হলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। গুম হোক বা ক্রসফায়ার– কোনোটিই অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। সব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কথা বলা ও কাজ করা উচিত। সস্তা কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য কোনো বক্তব্য দেওয়া হলে, তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
গত সোমবার দুপুরে পুরান ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেছিলেন, ‘ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ (অনুমতি দেয়) করে, আমরা সেটাই করব।’
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী
আইজিপি আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ ও সাংবাদিকদের নিয়ে মন্তব্যের বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান কী হবে– প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফেরার পর সে বিষয়ে বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। গতকাল সচিবালয়ে পিআইডি সম্মেলন কক্ষে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
উপদেষ্টা বলেন, এই ব্যাপারে সরকারের ফাইনাল অবস্থান কী হবে, এটা নিশ্চয় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বিবেচনা করবেন এবং তিনি তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সফরটা শেষ করার পর হবে।
সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কথা বললেও আইজিপি কেন ‘ক্রসফায়ার’ করার কথা বলেছেন এবং সাংবাদিকদের নিয়ে মন্তব্যের জন্য তাঁর ক্ষমা চাওয়া উচিত কিনা– সংবাদ সম্মেলনে তা জানতে চান এক সাংবাদিক।
জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, পুলিশ সদরদপ্তর ইতোমধ্যে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে আর বেশি আলোচনার প্রয়োজন আছে বলে তিনি মনে করেন না।
গত সোমবার আইজিপির ওই বক্তব্য নিয়ে দিনভর আলোচনা-সমালোচনার প্রেক্ষাপটে রাতে পুলিশ সদরদপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, আলী হোসেন ফকির ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করলেও এর মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কথা তিনি বোঝাননি।
সে প্রসঙ্গ ধরে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘স্টেটমেন্টে আসলে তিনি তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মানে যে, ক্রসফায়ার করবেন মানে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড করবেন বলে যে ফ্রেমিং হয়েছে …। তাঁর বক্তব্য থেকে এই ধরনের একটা ইন্টারপ্রিটেশন যে অসম্ভব তাও না, কেউ কেউ করেছেনও। তারপর তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে কিন্তু ক্লিয়ার করেছেন, যে তিনি আসলে এটা কেন বলেছেন, কী উদ্দেশ্য ছিল। অবশ্যই তিনি সেটা মিন করেননি, একই সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্কেও যে বক্তব্যটা জেনারালাইজ করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে, সেটার ব্যাপারেও তাঁর বক্তব্য আছে।’
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘যদি আজকে এমন হতো যে ওই বক্তব্যের পর উনি (আইজিপি) গতকাল কিছু বলেননি, তাহলে আজকে মনে হয় এটা আলোচনার ব্যাপার হতে পারত।’
আইজিপি এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারেন কিনা– জানতে চান আরেকজন সাংবাদিক। জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘উনার যে ব্যাখ্যা তাতে কিন্তু এটা ক্লিয়ার হয়েছে, তার মানে যে মানুষটা মনে করেন যে তাঁর বক্তব্যটা মিসকমিউনিকেট করেছে। মানুষের মধ্যে ভুল তথ্য দিয়েছে, ভুল বার্তা দিয়েছে, নিজে থেকে তিনি এটাকে আবার ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। আমার মনে হয়, তাতে বোঝা যায় যে, আগের বক্তব্যটা নিয়ে আসলে আর খুব বেশি কথা বলার দরকার নেই।’
আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে ইশরাক হোসেনকে সরিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাহলে আইজিপির ক্ষেত্রে সরকার কী করবে– সেই প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক। জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘সিদ্ধান্ত ... ধরুন এটা গতকাল হয়েছে, একজন আইজিপির ব্যাপারে যদি কোনো অন্যান্য সিদ্ধান্ত থাকারও প্রবণতা থাকে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তো দেশে নাই। এটা উনি বিবেচনা করবেন, উনি কী করবেন। আবারও বলছি, এটা উনি বিবেচনা করবেন। কিন্তু আমি আবারও বলছি, যখন কেউ তার একটা অবস্থান ধরে রাখছেন না, তখন মনে হয় আমরা একটু বেশি আনকাইন্ড হচ্ছি কিনা তার প্রতি।’
পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতি
আইজিপির মন্তব্য নিয়ে সমালোচনার মধ্যে বিবৃতি দিয়েছে পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি গতকাল এক বিবৃতিতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি উল্লেখ না করে আলী হোসেন ফকিরের দেওয়া বক্তব্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, আইজিপির বক্তব্যকে বিদ্যমান আইন ও বিধিবিধানের পরিপ্রেক্ষিতে বুঝতে হবে।
অ্যাসোসিয়েশন আইজিপির বক্তব্যকে দৃঢ় ও আপসহীনভাবে আইন প্রয়োগের সময়োপযোগী আহ্বান হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের ভাষ্য, আত্মরক্ষার অধিকারসহ আইনসম্মত ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্বিধা ছাড়াই কাজ করতে পারা উচিত।
অ্যাসোসিয়েশন জানায়, চলতি বছরে এ পর্যন্ত পুলিশ সদস্যদের ওপর ১৭৬টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চার কর্মকর্তা নিহত ও ৩৭০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
তবে আইজিপির বক্তব্যে সরকারের অনুমতির যে প্রসঙ্গ এসেছে, বিবৃতিতে সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, পুলিশের আইনানুগ কঠোরতাকে একদিকে নেতিবাচকভাবে দেখা এবং অপরাধ দমনে নিষ্ক্রিয়তাকে, অন্যদিকে দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারে।
অপরাধ দমনে পুলিশ যদি তার আইনগত ক্ষমতা প্রয়োগে অযথা দ্বিধাগ্রস্ত হয়, তাহলে অপরাধীরা উৎসাহিত হতে পারে এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কার্যকারিতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। অন্যদিকে, আইনের সীমা অতিক্রম না করে দৃঢ়তা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনই পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় করার মূল ভিত্তি।
পৃথক বিবৃতিতে পুলিশের নন ক্যাডার সদস্যদের সংগঠন বাংলাদেশ পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন বলেছে, আইজিপি অপরাধ দমনে পুলিশের দৃঢ় অবস্থান বোঝাতে ক্রসফায়ার শব্দ ব্যবহার করেছেন। তাঁর বক্তব্যকে বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘোষণা ব্যাখ্যা না করে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সূত্র: সমকাল .কম
এমডি
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন