প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১৯:২২
চলতি বছর কঙ্গো প্রজাতন্ত্রে প্রথম মাঙ্কিপক্স বা এমপক্স শনাক্ত হয়। গত জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে প্রায় ২২ হাজার মানুষের মধ্যে ভাইরাসটির সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এসময়ে মাঙ্কিপক্সে প্রাণ হারিয়েছেন ৭১৬ জন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আগস্ট মাসে এমপক্স সংক্রমণ নিয়ে আন্তর্জাতিক জরুরি সতর্কতা জারি করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। আফ্রিকার পর এবার ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাসটি। এশিয়াতেও এর সংক্রমণ দেখা গেছে। মাঙ্কিপক্স ভাইরাস লালা, বীর্য, প্র¯্রাব, বিষ্ঠা (মল) ইত্যাদির মধ্যে তরল আকারে থাকে। এ ভাইরাসের লক্ষণ দেখা দিলে যৌন বা অন্যান্য ঘনিষ্ঠ শারীরিক কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে হবে, যতটা সম্ভব সবার সাথে সমস্ত শারীরিক যোগাযোগ এড়িয়ে চলতে হবে।
বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাবের মধ্যে মাঙ্কিপক্সের প্রথম টিকার অনুমোদন দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। মাঙ্কিপক্সের উপস্থিতি ছিল। এখন কোনো অজানা কারণে তা হঠাৎ করে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
আগে থেকে প্রাদুর্ভাব ছিল না এমন দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত এরোগটির সংক্রমণ প্রধানত পুরুষ বিশেষ করে সমকামী পুরুষদের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। মাঙ্কিপক্সে একের অধিক বার সংক্রমণ সাধারণত হয় না। এ ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে অর্থোপক্স ভাইরাস। এ জাতের ভাইরাসের মধ্যে রয়েছে গুটি বসন্ত ও কাউপক্স। এ জন্য মাঙ্কিপক্সের সাথে গুটি বসন্ত বা স্মলপক্সের মিল দেখা যায়। মাঙ্কিপক্স ভাইরাসের রয়েছে দুটা ক্লেড বা উপজাতি। একটি হচ্ছে মধ্য আফ্রিকাক্লেড- এ উপজাতির মাঙ্কিপক্সে মৃত্যু হার দশ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। আরেকটি হচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকাক্লেড- এ উপজাতির মাঙ্কিপক্সে মৃত্যুতে মন হয়নি। গত বছর নতুন ও আরেকটি গুরুতর ধরনের এমপক্সক্লেড ১ বিসংক্রামিত হওয়ায় এ নিয়ে আবারো উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্লেড ১ বি সম্পর্কে অনেক কিছু জানা বাকি। এটি সম্ভবত আগের ধরনের চেয়ে আরো সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে, একই সঙ্গে আরো গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে।
মাঙ্কিপক্স রোগের সাধারণ উপসর্গগুলো হল- জ্বর (৩৮০ সেন্টিগ্রেডের বেশি তাপমাত্রা), প্রচ- মাথা ব্যথা, লসিকা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া ও ব্যথা, মাংসপেশীতে ব্যথা, অবসাদ গ্রস্ততা। সাধারণত জ্বরের তিন দিনের মধ্যে ফুসকুড়ি ওঠে- যা মুখ থেকে শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে হাতের তালু, পায়ের তালুসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এ উপসর্গগুলো সাধারণত দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে রোগী আরোগ্য লাভ করে। চিকিৎসকরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উপসর্গগুলো আপনা-আপনি উপশম হয়ে যায় বলে নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। তবে অনেক সময় রোগীকে আইসোলেশনে রেখে উপসর্গ ভিত্তিক চিকিৎসা দিতে হয়। জ্বর হলে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। ক্ষতস্থান দ্রুত শুকানোর জন্য ভিটামিন সি জাতীয় ফল বেশি বেশি খেতে হবে। এছাড়া ফুসকুড়ি শুকনো রাখা, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ, পরিমিত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি ও তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করলে রোগী ধীরে ধীরে সুস্থ্য হয়ে যায়। অন্যান্য শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
সাধারণত গৃহপালিত প্রাণী থেকে এ রোগ ছড়ায় না। মাঙ্কিপক্স রোগের লক্ষণ সমূহ শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকলে বাহকের মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায় না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এর উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন জানান, ‘মাঙ্কিপক্সের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তির সরাসরি সংস্পর্শে আসা থেকে বিরত থাকতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তি এবং সেবাপ্রদানকারী উভয়কেই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে এবং আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত দ্রব্যাদি সাবান বা ডিটারজেন্ট কিংবা জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।’ আক্রান্ত জীবিত বা মৃত বন্যপ্রাণী অথবা এর প্রাকৃতিক পোষক (যেমন ইঁদুর, কাঠবিড়ালি, খরগোশ, গিনিপিগ এবং হ্যামস্টার) থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতে হব। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, এ ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি ঘরের বাইরে না গিয়ে আইসোলেশনে থাকতে হবে। অতি জরুরি প্রয়োজনে বাইরে গেলে হাতে গ্লাভস ও আঁটসাঁট মাস্ক পড়ে ব্যান্ডেজ দিয়ে ক্ষতস্থান ও ফুসকুড়ি গুলি বেঁধে যেতে হবে। অন্যদের থেকে কমপক্ষে ছয় ফুট দূরত্ব রেখে বসতে হবে। যতটা সম্ভব গণপরিবহন ও পাবলিক টয়লেট ব্যবহার এড়িয়ে চলতে হবে।
মাঙ্কিপক্স রোগের সংক্রমণ বিশ্ব ব্যাপী দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকায় বিশ্বব্যাপী উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোন রোগী পাওয়া না গেলেও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে পাওয়া গেছে। সেজন্য বর্তমানে বাংলাদেশ প্রাথমিক ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে। তবে এরমধ্যে আমাদের দেশের মাঙ্কিপক্সে আক্রান্ত রোগী নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হচ্ছে। এ আতঙ্ক ও ভুল বুঝাবুঝি এড়ানোর জন্য সকলেরই সরকারি সূত্রের উপর নির্ভরশীল হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি সবাইকেই সতর্ক থাকতে হবে। সর্বোপরি এমপক্সের লক্ষণ যুক্ত রোগী দেখলে অবশ্যই নির্ধারিত হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে।
#
১৯/০৯/২০২৪ পিআইডি ফিচার
বিশেষ সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন