প্রকাশিত: ০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৩:৫৪
সংগৃহীত ছবি
বয়স কম হলেও অনেকেরই শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী কাশি কিংবা অল্প পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এর পেছনে শুধু কোনো রোগ বা সংক্রমণ দায়ী নয়, প্রতিদিনের কিছু অভ্যাসও দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের স্বাভাবিক কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।
ধূমপান, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ, বায়ুদূষণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের মতো অভ্যাস শ্বাসযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তামাকের ধোঁয়া ও বায়ুদূষণ দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির কারণ।
ফুসফুসের কার্যকারিতা কমে গেলে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘদিনের কাশি, শ্বাস নেওয়ার সময় শব্দ হওয়া কিংবা অল্প পরিশ্রমেই অতিরিক্ত ক্লান্ত হয়ে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। ফুসফুসের কার্যকারিতা যাচাই করতে চিকিৎসকের পরামর্শে স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষা করা হয়। এতে ফুসফুস কতটা বাতাস ধারণ করতে পারে এবং কত দ্রুত বাতাস বের করতে পারে, তা পরিমাপ করা হয়।
ফুসফুসের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন সাতটি অভ্যাস জেনে নেওয়া যাক।
১. ধূমপান
ফুসফুসের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর অভ্যাসগুলোর একটি হলো ধূমপান। সিগারেট ও অন্যান্য তামাকজাত পণ্যের ধোঁয়ায় থাকা বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক শ্বাসনালি ও ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধূমপানের ফলে ফুসফুসের টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।
বিশেষ করে ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডির অন্যতম প্রধান কারণ ধূমপান। তাই ফুসফুস সুস্থ রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর একটি হলো ধূমপান থেকে বিরত থাকা। ধূমপান করলে তা ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত।
২. পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে থাকা
নিজে ধূমপান না করলেও অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করলে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এটিকে পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়।
দীর্ঘদিন পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা ও ফুসফুসের রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই বাড়ি, কর্মস্থল কিংবা অন্য কোনো জায়গায় ধূমপানের ধোঁয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখা জরুরি।
৩. দূষিত পরিবেশে সুরক্ষা ছাড়া চলাফেরা
রাস্তায় চলাচলের সময় যানবাহনের ধোঁয়া, ধুলাবালি ও বিভিন্ন ক্ষতিকর কণা নিয়মিত শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। কলকারখানার ধোঁয়া ও রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শও শ্বাসযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
দীর্ঘদিন বায়ুদূষণের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং আগে থেকে থাকা শ্বাসযন্ত্রের সমস্যাও আরও খারাপ হতে পারে।
অতিরিক্ত দূষিত পরিবেশে অপ্রয়োজনে দীর্ঘ সময় না থাকা এবং ধুলা, ধোঁয়া বা রাসায়নিকের মধ্যে কাজ করার সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া তাই গুরুত্বপূর্ণ।
৪. বদ্ধ ঘরে দীর্ঘ সময় থাকা
পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করে না এমন ঘরে দীর্ঘ সময় থাকলেও ঘরের বাতাসের মান খারাপ হতে পারে। রান্নার ধোঁয়া, তামাকের ধোঁয়া, মশার কয়েল কিংবা বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া ঘরের ভেতরে জমে গেলে শ্বাসযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের কারণে রান্নার ধোঁয়া ও অন্যান্য দূষিত কণার সংস্পর্শ বেড়ে যেতে পারে। তাই ঘরে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা রাখা এবং রান্নার ধোঁয়া বাইরে বের হওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
৫. দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকা
দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং শারীরিকভাবে নিষ্ক্রিয় থাকা সামগ্রিক শারীরিক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড শরীরের কর্মক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়ক এবং শ্বাসযন্ত্রের সক্ষমতা ধরে রাখতেও উপকারী।
তাই একটানা দীর্ঘ সময় বসে না থেকে কাজের ফাঁকে হাঁটাচলা করা এবং সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত ব্যায়াম করার অভ্যাস করা ভালো।
৬. প্রয়োজন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া
সর্দি-কাশি হলেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার অভ্যাসও ঠিক নয়। কারণ সব ধরনের সর্দি-কাশি বা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয় না।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু তৈরির ঝুঁকি বাড়তে পারে। ফলে ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নাও হতে পারে।
তাই শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা হলে নিজের ইচ্ছায় অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৭. পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ না করা
শরীরে পানির ঘাটতি হলে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শ্বাসনালিতে থাকা মিউকাস শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি অংশ। পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ শরীরের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
তবে শুধু বেশি পানি খেলেই ফুসফুসের সব রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব—এমন ধারণা ঠিক নয়। ফুসফুস ভালো রাখতে ধূমপান এড়িয়ে চলা, বায়ুদূষণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা, নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং শ্বাসযন্ত্রের কোনো সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ফুসফুস ভালো রাখতে কী করবেন?
বয়স বাড়ার সঙ্গে ফুসফুসের কার্যকারিতা কিছুটা কমতে পারে। তবে ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা, বায়ুদূষণের সংস্পর্শ কমানো, ঘরের বায়ু চলাচল নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকার মাধ্যমে ফুসফুসের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবের ঝুঁকি কমানো যায়।
দীর্ঘস্থায়ী কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ অনুভূত হওয়া, শ্বাস নেওয়ার সময় অস্বাভাবিক শব্দ হওয়া কিংবা অল্প পরিশ্রমেই অতিরিক্ত হাঁপিয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সূত্র: যুগান্তর .কম
এমডি
বিশেষ সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন