প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:০০
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন
সংগৃহীত ছবি
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সরকারের প্রভাব আরও বাড়ানো হচ্ছে। গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো, মানহানি, বুলিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কনটেন্টকে কেন্দ্র করে শাস্তির পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষেত্রে সরকারের ক্ষমতা আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়ায় এমন কিছু বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা জনগণের মৌলিক মানবাধিকার, বাক্স্বাধীনতা ও স্বাধীন মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি সৃষ্টি করবে উল্লেখ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
গত বৃহস্পতিবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে খসড়াটি নিয়ে পরামর্শ সভা হয়। সভায় প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। খসড়ায় নতুন করে ২৬ (ক) ধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে সাইবার স্পেসে গুজব ও অপতথ্য প্রকাশ বা প্রচারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার কথা বলা হয়েছে। এর জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংজ্ঞায় ‘গুজব’ বলতে এমন অসমর্থিত বা যাচাই না করা তথ্য, সংবাদ বা দাবি বোঝানো হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ২৫ ধারার শিরোনামেও পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইলিং বা অশ্লীল কনটেন্টের পাশাপাশি এতে মানহানিকর তথ্য যুক্ত হচ্ছে। বর্তমান আইনে ব্ল্যাকমেইলিং, যৌন হয়রানি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি, ডিজিটাল শিশু যৌন নির্যাতনের উপকরণ এবং যৌন হয়রানিমূলক চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে ক্ষতিকর বা ভয় দেখানো তথ্য, ভিডিও, অডিও-ভিজ্যুয়াল, স্থিরচিত্র বা গ্রাফিক্স তৈরি, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচারের জন্য সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রস্তাবে শাস্তি বাড়িয়ে পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা ২০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নারী বা ১৮ বছরের কম বয়সি শিশুর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১০ বছর কারাদণ্ড এবং ২০ লাখের পরিবর্তে ৪০ লাখ টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে।
‘বুলিং’-এর ক্ষেত্রেও নতুন সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পরিকল্পিত ও বারবার বাস্তব বা অনুমিত ক্ষমতা, প্রভাব বা আধিপত্য ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর শারীরিক, মৌখিক, সামাজিক, ডিজিটাল বা অন্য কোনো উপায়ে এমন আচরণ করলে, যাতে শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি, কষ্ট, ভয়, সামাজিক বর্জন, বিচ্ছিন্নতা বা একাকিত্ব তৈরি হয়—তাকে বুলিং হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে আইনের ভাষায় সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কোনো তথ্য বা কনটেন্ট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে ধারণ, সম্পাদনা, তৈরি বা পরিবর্তন করা হলে সেটিও সংশ্লিষ্ট অপরাধের আওতায় আসতে পারে।
কোম্পানি বা আইনগত সত্তার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান, দুই পক্ষের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো বহাল রাখা হয়েছে। নতুন ২৯ (৩) উপধারায় কোনো কোম্পানি দোষী সাব্যস্ত হলে আদালত কোম্পানির নিবন্ধন, লাইসেন্স বা কার্যক্রম স্থগিত, বাতিল কিংবা নিষিদ্ধ করার আদেশ দিতে পারবে। এখানে ‘কোম্পানি’র সংজ্ঞাও বিস্তৃত করা হয়েছে। কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, অংশীদারি প্রতিষ্ঠান, সমিতি, সংগঠন, ট্রাস্ট, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা বা অন্য কোনো আইনগত সত্তাকেও এর আওতায় আনার প্রস্তাব রয়েছে। বিচার ব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে আইনের সব অপরাধ সাইবার ট্রাইব্যুনালে বিচার হওয়ার বিধান থাকলেও সংশোধনীতে নির্দিষ্ট গুরুতর অপরাধগুলো সাইবার ট্রাইব্যুনালের জন্য রাখা হচ্ছে।
খসড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি ধারা ৮(২)। বর্তমান আইনে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক তথ্য অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে পারে। সংশোধনীতে সেই ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকার কর্তৃক অনুমোদিত অন্যান্য সংস্থা বা বাহিনীর ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও জনশৃঙ্খলার জন্য হুমকি, ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, জাতিগত বৈষম্য থেকে সহিংসতার আশঙ্কা, অপরাধ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নির্দেশনা, অপতথ্য বা গুজব এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানিকর তথ্য বা রাষ্ট্রকে অপমান করে এমন তথ্য রাখা হয়েছে। এসব তথ্য অপসারণ, ব্লক বা স্থানান্তরের পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করার সুযোগও থাকছে। অর্থাৎ, সংশোধনীটি শুধু নতুন অপরাধ যোগ করছে না; অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের প্রাতিষ্ঠানিক পরিধিও বাড়াচ্ছে।
গত শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘খসড়া সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এ সাইবার অপরাধ, সাইবার সুরক্ষা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার-সম্পর্কিত তিনটি জটিল বিষয়কে এক আইনে অন্তর্ভুক্ত করে তিনটির কোনোটিতেই যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ও উদ্দেশ্যমূলক অপব্যাখ্যা ও অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা তৈরি করা হয়েছে। আইনে সাইবার অপরাধের সঙ্গে সাইবার সুরক্ষার মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রকে একাকার করে ফেলার পাশাপাশি সাইবার জগতে মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণমূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ ভিন্ন, এ ধরনের আইনের আওতাবহির্ভূত এবং বৈশ্বিক উত্তম চর্চার পরিপন্থি।’
সূত্র: ইত্তেফাক .কম
এমডি
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন