প্রতিবাদের মুখে অপসারণ

প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারি, ২০২৪ ০৭:২৪

মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিতেও বাণিজিক প্রচারণা

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে জোরালো প্রতিবাদে ভেঙে ফেলা হয়েছে তাহিরপুরের ইত্যাদি পয়েন্ট। ২০১৯ সালের ১৯ নভেম্বর জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি হয়’ ট্যাকেরঘাট বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ সিরাজ লেকের পাশে। সম্প্রতি এই লেকের পাশে ইত্যাদির শুটিং পয়েন্ট এলাকায় ইত্যাদি পয়েন্ট নামে একটি স্থাপনা নির্মাণ করে পর্যটন কর্পোরেশন। যা নিয়ে গত দুই-তিন দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্থানীয় লোকজন ব্যাপক অসন্তোষ জানান। তারা ক্ষোভ প্রকাশ ও প্রতিবাদ করেন। সেজন্য বৃহস্পতিবার দুপুরে নির্মাণাধীন এ স্থাপনাটি ভেঙে দেয় সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন।


জানা যায়, ১৯৪০ সালে ছাতক উপজেলায় নির্মাণ করা হয় আসাম বাংলা সিমেন্ট ফ্যাক্টরী। ভারতের আসাম থেকে চুনাপাথর এনে ফ্যাক্টরীটি সচল রাখা হতো। দেশ ভাগের পর ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাজনের পর অত্যাধিক ব্যয়ের কারণে পাথর আনা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬০ সালে তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট এলাকায় ৩২৭ একর জমির উপর জরিপ চালিয়ে চুনাপাথরের সন্ধান পায় বিসিআইসি কতৃর্পক্ষ। ১৯৬৬ সালে চুনাপাথর উত্তোলনের জন্য খনি প্রকল্পটি চালু করা হয়। তখন থেকেই পাথর উত্তোলনের এই স্থানটি লোকমুখে ট্যাকেরঘাট পাথর কোয়ারী নামে সমাদৃত হতে থাকে। ২০০০ সালের পর এ স্থানটি ভ্রমণ পিপাসু লোকজনের কাছে পরিচিতি পেতে থাকে। ২০১০ সালের দিকে স্থানটি ভ্রমণ পিপাসু লোকজনের কাছে অতি পরিচিত হয়ে উঠে। এরপর এই পাথর কোয়ারিটির নামকরণ করা হয়  শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সিরাজের নামে ‘শহীদ সিরাজ লেক’। এ অবস্থায় তাহিরপুরে ট্যাকেরঘাট ঘুরতে আসেন বিন্দাস ট্রাভেল গ্রুপের কর্ণধার রোদোয়ান। সে সময় তিনি এই লেকের একটি ছবি দিয়ে তার পেইজে নাম জুড়ে দেন ট্যাকেরঘাট নীলাদ্রি লেক। সে থেকেই ধীরে ধীরে এ লেকটির নিলাদ্রী লেক হিসেবে পরিচিতি বাড়ে দূর দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের কাছে।


কোয়ারী সৃষ্টির পর থেকে একাধিক নামকরণ করা হয়েছে এই জায়গাটির। কখনো নীলাদ্রি লেক, কখনো শহীদ সিরাজ লেক। কখনো লেকের পাশে ডিসি পার্ক, কখনো ইত্যাতি পয়েন্ট। এ নিয়ে সময়ে সময়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে চরম অসন্তোষ। সম্প্রতি এ লেকটিতে পর্যটন কর্পোরেশন ইত্যাদি পয়েন্ট নির্মাণ করলে স্থানীয় লোকজনদের মধ্যে দেখা দেয় চরম অসস্তোষ। অসন্তোষ দেখা দেয়ায় ভেঙে দেয়া হয়েছে নবনির্মতি ইত্যাদি পয়েন্টটি।


কে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম 
১৯৫২ সালে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার ছিলনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সিরাজুল ইসলাম। বাবা—মা ও কাছের মানুষেরা তাকে আদর করে সিরু নামে ডাকতেন। বাবা মকতুল হোসেন এবং মা গফুরুন্নেছা দম্পতির একমাত্র পুত্রসন্তান ছিলেন তিনি। তার ছোট দুটি বোনও ছিল। ১৯৭১ সালে সিরাজ ছিলেন উনিশ বছরের টগবগে যুবক। এসময় তিনি ছিলেন কিশোরগঞ্জ গুরুদয়াল কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তিনি এতে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজ গ্রামের কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। একমাত্র পুত্রের এমন সিদ্ধান্ত কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না সিরাজের বাবা—মা।


মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে একদিন বাড়ি থেকে বের হয়ে বাড়ির সামনে দিয়ে যে সড়কটি ইটনা সদরের দিকে চলে গেছে, সেই পথেই হাঁটা শুরু করেছিলেন সিরাজ। তার বাবা দৌড়ে এসে সেই সড়কে দাঁড়িয়ে ছেলের চলে যাওয়া দেখছিলেন। যতক্ষণ তার প্রিয় পুত্র সিরুকে দেখা যায় ততক্ষণ তিনি সেখানেই নিশ্চল দাঁড়িয়েছিলেন। পরে দৃষ্টিসীমায় সিরু মিলিয়ে যাওয়ার পর তিনি ধপ করে মাটিতে বসে পড়েন। হয়তো, তিনি বুঝেছিলেন এটাই ছিল সিরুকে তার শেষ দেখা।


বন্ধুদের নিয়ে হাওর—বাঁওড় পাড়ি দিয়ে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখান সিরাজ। পরে তিনি তার দল নিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য ভারতের আসামে ইকোয়ান ক্যাম্পে চলে যান। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং পাঁচ নম্বর সেক্টরের অধীনে জগৎজ্যোতি দাশ’র ‘দাশ পার্টির’ দলে সাব—সেক্টর কমান্ডার হিসেবে যুদ্ধ শুরু করেন। জগৎজ্যোতির শেষ যুদ্ধের অন্যতম সঙ্গী আবদুল কাইয়ুমের বয়ানে জানা যায়, দাস পার্টি নামটি জনগণের দেওয়া নাম নয়, দাস পার্টির অফিশিয়াল দলিল ছিল এবং পার্টি কমান্ডার হিসেবে জগৎজ্যোতি স্বীকৃতি পেয়েছিলেন।


মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে জামালগঞ্জ থানা এবং সাচনা বাজারে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করে মুক্তিযোদ্ধারা। এই আক্রমণের জন্য গুরুত্ব বিবেচনায় মুক্তিযোদ্ধাদের তিনটি দল নির্বাচিত হয়। প্রথম দলটিতে ছিলেন কমাণ্ডার ইপিআরের আব্দুল হাই এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড সিরাজুল ইসলাম। এই দলটির দায়িত্ব ছিল— সাচনা বাজারের বাংকারগুলো আক্রমণ করা। জগৎজ্যোতি ও তার সেকেন্ড ইন কমান্ড আলী আজমদের ওপর দায়িত্ব পড়ে জামালগঞ্জ থানা সদরের বাংকারগুলো দখলে নেওয়ার জন্য। মোজাহিদ মিয়া ও ইব্রাহিম খলিলের নেতৃত্বে আরেকটি দল রাখা হয় ব্যাকআপ পার্টি হিসেবে। সাত আগস্ট (১৯৭১ সাল) ছয়টি বড় নৌকা নিয়ে টেকেরঘাট থেকে এসে তিনটি দল একযোগে আক্রমণ শুরু করে। জগৎজ্যোতির দল জামালগঞ্জ থানা আক্রমণ করার পর পাক সেনারা দক্ষিণ দিকে পালাতে থাকলে মোজাহিদ মিয়ার নেতৃত্বে তৃতীয় দলটির প্রতিরোধের মুখে পড়ে। পরে পাক সেনাদের দলটি দুর্লভপুর গ্রামের দিকে পালাতে শুরু করে। একই সময়ে নদীর অপর পাড় সাচনা বাজারে আব্দুল হাই ও সিরাজের দল একের পর এক গ্রেনেড চার্জ করতে করতে এগিয়ে যেতে থাকে। সিরাজ ও তার বাহিনীর তীব্র আক্রমণের মুখে বাংকারে অবস্থান করা বেশ কয়েকজন পাক আর্মি ও রাজাকার মারা যায়। বাকিরা পালিয়ে যেতে থাকে। পালাতে পালাতে বাজারের ভেতরের একটা বাংকারে গিয়ে তারা জড়ো হয়। সিরাজ অসীম বীরত্বের সঙ্গে ক্রলিং করে এগিয়ে গিয়ে সেই বাংকারে গ্রেনেড চার্জ করেন। কিন্তু পলায়নরত সেনাদের একটি গুলি তার কপালে এসে আঘাত করে। পাকসেনা ও রাজাকাররা পালিয়ে গেলেও গুরুতর আহত হন সিরাজ। সঙ্গে সঙ্গে তাকে মিত্র বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ভারতে নেওয়ার পথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। এ অবস্থায় তার লাশ নিয়ে হেলিকপ্টারটি ভারত—বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে টেকেরঘাটে অবতরণ করে। সেখানে খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে পূর্ণ সামরিক মর্যাদায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের জন্য সরকার শহীদ সিরাজকে বীরবিক্রম খেতাব প্রদান করেন। টেকেরঘাটে এখনো সিরাজের কবরটি আছে। 


সিরাজের স্মরণে তার জেলা কিশোরগঞ্জ সদরে গুরুদয়াল সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে এবং নিজ বাড়ি ইটনা উপজেলা সদরে ধনু নদীর ওপর একটি সেতুর নামকরণ করা হয়েছে। 


সীমান্তের চারাগাঁও এলাকার তরুণ ব্যবসায়ী আব্দুল কদ্দুছ বললেন, এই বীর শহীদের নামে করা লেকটিও কেড়ে নিতে চাচ্ছেন করপোরেট ওয়ালারা এটি মেনে নিতে পারেন নি এই অঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে তরুণরা। এজন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। জেলা প্রশাসন এলাকাবাসীর আবেগকে গুরুত্ব দেওয়ায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
সুনামগঞ্জ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুনামগঞ্জ (সার্বিক) রেজাউল করিম জানান, এখানে ইত্যাদি অনুষ্ঠান হওয়ায় বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন ইত্যাদি পয়েন্ট নামে একটি নামফলক নির্মাণ করছিলো। স্থানীয়দের মতামতকে সম্মান জানিয়ে এটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।


প্রসঙ্গত, ইত্যাদি বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় টেলিভিশন ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান। ইত্যাদি প্রথম প্রচার হয় ১৯৮৯ সালে।
 

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার