হাওরে ইজারা থাকা উচিত নয়: ফরিদা আখতার

প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল, ২০২৫ ১৮:৪০

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার -সংগৃহীত ছবি

সু.খবর ডেস্ক
প্রকৃত মৎস্যজীবী বা মৎস্যচাষীদের স্বার্থে হাওরে ইজারা বন্ধের আহ্বান জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, কোনো হাওরে ইজারা থাকা উচিত নয়। হাওর ওই অঞ্চলের মানুষের অধিকার, আর তা রক্ষা করতে হবে।
শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘সরকারি জলমহাল ব্যবস্থাপনা নীতি—২০০৯: হাওর অঞ্চলে বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এই কথা বলেন।
হাওরের মালিক মূলত কে? প্রশ্ন রেখে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, আসলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে হাওরগুলো রয়েছে। যদিও অধিকাংশ হাওর এলাকা ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে দিয়ে দেওয়া হয়েছে, যারা শুধু ইজারা দিয়ে এখান থেকে রাজস্ব আহরণ করে।
তিনি আরো বলেন, হাওরকে ঘিরে একটা বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হয়েছে। হাওর অঞ্চলের ২৯ শতাংশ মানুষ এখনও দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে।
উপদেষ্টা বলেন, কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে যে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে, তাকে বলা হচ্ছে অল ওয়েদার সড়ক। পরে জানা যায় যে, সব ঋতুতেই এই সড়ক সহনশীল। অথচ এই রাস্তা তৈরির মাধ্যমে ইতোমধ্যে ওই এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেছে। অনেক টাকা খরচ করে এই রাস্তাটা করা অন্যায় হয়েছে। আমি মনে করি এই রাস্তা নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচার হওয়া দরকার।
মৎস্য উপদেষ্টা বলেন, ইতোমধ্যে মাছ ধরার জন্য আমরা কারেন্ট জাল বন্ধ করেছি। কিন্তু বর্তমানে চায়নাদুয়ারী নামক জালে মাছ ধরা হচ্ছে। এগুলো অবশ্যই বন্ধ করা হবে। জাল হবে মৎস্যজীবীদের একটা উপকরণ, অথচ এই জাল হয়ে গেছে এক অবৈধ জাল। প্রকৃত জেলেরা এসব অবৈধ জাল ব্যবহার করে না। কিছু মৌসুমী মৎস্যজীবীরা এসব জাল ব্যবহার করা থাকে।
উপদেষ্টা হাওর রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে বিভিন্ন এলাকাকে অভয়াশ্রম ঘোষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বলেন, এর ফলে হাওরের মাছগুলো রক্ষা পাবে, বিলুপ্ত হওয়া মাছগুলো ফিরে আসতে পারে। সুতরাং জৈবিক ব্যবস্থাপনা হবে হাওর রক্ষার একটা মূল পদক্ষেপ।
হাওরে অঞ্চলের ভুক্তভোগীরা বলেন, হাওরের বিল ইজারা প্রায় রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহাজনদের হাতেই যায়, যার ফলে সাধারণ মৎস্যজীবীরা বঞ্চিত হয়। মৎস্যজীবী সমিতির নামে হাওর ইজারা নেওয়ার ক্ষেত্রেও নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের সমর্থকরা হাওর লিজ নিয়ে থাকে। হাওর বিল লিজ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রকৃত সাধারণ মৎস্যজীবী বা মৎস্যচাষীরা পেতে পারেন তা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তারা।
উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর ভেবেছিলাম মাছ নিয়ে কাজ করতে হবে। এখন মাছ তো নানা জায়গা থেকে আসে, নদী থেকে আসে, সমুদ্র থেকে আসে। কিন্তু হাওরের বিষয়টা যে এত গভীর, তা বুঝতে পারিনি। সরাসরি হাওরে গিয়ে দেখে বুঝতে পারলাম যে, হাওর বাংলাদেশের একটা সম্পদ। হাওরে শুধু মাছ আছে তাই নয়, প্রাণিসম্পদ অনেক। শুষ্ক মৌসুমে হাওরে উফসী ও হাইব্রিড ধানে কীটনাশক ও হার্বিসাইড ব্যবহারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতকে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। মেশিন দিয়ে ফসল কাটা হচ্ছে। এই মেশিন হাওরে নামার কারণে মাছ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আমি কৃষি উপদেষ্টাকে জানিয়েছি, হাওরের ধানে যেন কীটনাশক না দেয়। মা মাছকে রক্ষা করতে হবে।
হাওর জীববৈচিত্র্যের আধার উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘হাওরাঞ্চলে ১৪৩ প্রজাতির দেশি মাছ ও ১২ প্রজাতির বিদেশি মাছ ও কয়েক প্রজাতির মিঠা পানির চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রকার ছোট—বড় মাছ, শামুক, ঝিনুক বিদ্যামান। এছাড়া দেশের মোট গবাদি পশুর ২২%, হাঁস ২৪%, ১২৯ দেশীয় ও ১২৮ প্রজাতির বিদেশি পাখি, ২৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৯ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৪০ প্রজাতির সরীসৃপ এবং কয়েক প্রজাতির ধান রয়েছে।
উপদেষ্টা আরো বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর চাষের মাছ নিয়ে খুব বেশি বলা হতো, দেশি মাছের কথা বললেই হাওরের মাছের কথা চলে আসে। অন্যদিকে যখন মৎস্যজীবীর কথা বলা হয় তখন প্রকৃত মৎস্যজীবী, অরিজিনাল মৎস্যজীবী এরকম কথা চলে আসছে—এর মানে হচ্ছে এ পেশায় অনেকেই অন্যায়ভাবে প্রবেশ করেছে। যারা সত্যিকারের মৎস্যজীবী তাদেরকে মূল্যায়ন করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘হাওর নিয়ে সবসময় টানাটানি হয়। মন্ত্রণালয়গুলো কেউ দায়িত্ব নিতে চায় না। হাওর রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার, হাওর রক্ষায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় দায়িত্ব পালন করবে।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)—এর আহ্বায়ক রাশেদা কে. চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান, সাবেক সচিব ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার।
এতে আরো বক্তৃতা করেন বারসিকের পরিচালক পাভেল পার্থ, হাওর সংস্কৃতি অধ্যয়ন এবং গবেষণা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সজল কান্তি সরকার, মানবাধিকার কর্মী জাকিয়া শিশির, হাওর উন্নয়ন আন্দোলনের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, সেন্টার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ—এর নির্বাহী পরিচালক ড. এম মোখলেসুর রহমান।
এসময় হাওর অঞ্চলের ভুক্তভোগী আহ্লাদ খান, অঞ্জনা বিশ্বাস ও বোরহান উদ্দিন প্রমুখ বক্তৃতা করেন।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)—এর সদস্য সচিব শরীফ জামিলের সঞ্চালনায় হাওর অঞ্চলে বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনা বিষয়ে উপস্থাপনা করেন অ্যাসোসিয়েটস ফর ইনোভেটিভ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এআইআরডি)—এর পরিচালক আব্দুল হাই চৌধুরী।

 

জাতীয় থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার