ধৃতির দ্যুতি

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০১:০১

মানুষ চাইলে কিনা করতে পারে। নিজের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে অজেয়কে করতে পারে জয়। এমনি একজন অদম্য প্রতিভাবান শিশুশিল্পী মনোরমা দাস ধৃতি। রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরষ্কার নেয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা থেকে জাতীয় শিশু পুরষ্কার প্রতিযোগিতায় শুধু সেরাই নয়, দেশের সেরাদের সেরা হয়েছে সে। ২০২২—২৩ সালের প্রতিযোগিতায় নৃত্যের ছয়টি বিভাগে অংশগ্রহণ করে পাঁচটি বিভাগে প্রথম ও একটিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে রেকর্ড গড়েছে ধৃতি। করোনার কারণে এবার দু বছরের প্রতিযোগিতা একসাথে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০২২ সালের প্রতিযোগিতায় মনিপুরী, ভরত নাট্যম ও সাধারণ নৃত্য ৩ বিভাগেপ্রথম হয়ে দেশ সেরা হয়েছে এই শিশুশিল্পী। পাশাপাশি ২০২৩ সালে কথক ও মনিপুরী নৃত্যে প্রথম এবং ভরত নাট্য নৃত্যে দ্বিতীয় হয়ে দেশের সেরাদের সেরা হয়েছে ধৃতি। ধৃতির এমন রেকর্ড দেশেএর আগে কেউ করেনি বলে জানান সিলেটের শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা। মেয়ের এই গৌরবান্বিত সফলতায় আনন্দিত পরিবার।
সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাছননগরের  আশুতোষ দাস ও সুপ্তা দাস দম্পতির একমাত্র মেয়ে ধৃতি। তার বাবা মদন মোহন কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক।  বাবার চাকুরী সূত্রে বর্তমানে সিলেটের সরকারি অগ্রগামী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ৮ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। এই ছোট্ট বয়সেই অসাধারণ কৃতিত্বের দাবিদার সে।
গুটি গুটি পায়ে হাঁটা শেখার পর থেকেই শুধু হাত পা নাচাতো ধৃতি। টিভিতে নৃত্য দেখে দেখে অনুকরণের চেষ্টা করতো। নৃত্যের প্রতি এমন টান দেখে ২ বছর বয়সে স্কুলে যাবার আগেই নৃত্যের অধ্যায় শুরু হয় ধৃতির। বয়সে ছোট হওয়ায় কেউ ভর্তি করতে রাজি না হওয়ায় অনেক জোর করে ভর্তি করানো হয় সিলেটের মনিপুরী আর্টস এন্ড কালচার স্কুলে। সেখানে তার প্রথম নৃত্যগুরু শান্তনা দেবীর কাছ থেকে শিখতে শুরু করে নাচ। এরপর ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় শিশু কিশোর প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে উপজেলা, জেলা, বিভাগ পেরিয়ে সারাদেশের মধ্যে ১ম স্থান অধিকারী হয় ধৃতি। নিয়মনুযায়ী ১ম স্থান অর্জন করা সবার মধ্যে লটারির মাধ্যমে বাছাইকৃত কয়েকজনকে পুরষ্কার প্রদান করেন রাষ্ট্রপতি। দুর্ভাগ্যক্রমে সেই লটারিতে নাম উঠেনি ধৃতির। সেই আক্ষেপ রয়ে যায় তার মনে। তারপর থেকে একের  অধিক ইভেন্টে বিজয়ী হওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। কারণ কয়েকটা ইভেন্টে বিজয়ী হয়ে সেরাদের সেরা হলে লটারি ছাড়াই রাষ্ট্রপতি  নিজ হাতে পুরষ্কার প্রদান করেন। এরপর কয়েক বছরএই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে মোট ৮ টি গোল্ড মেডেল অর্জন করে ধৃতি। তবুও রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরষ্কার পায়নি। কারণ এর আগে কখনো দুইটা ইভেন্টের বেশি ইভেন্টে অংশ নিতে দেয়া হয়নি তাকে। এবছর করোনার কারণে দু’বছরের প্রতিযোগিতা একসাথে হওয়ায় ৩টি করে দু’বছরের ৬ টি ইভেন্টের অংশ নেয়ার সুযোগ পায় সে। ৬ টির মধ্যে ৫ টিতে প্রথম এবং একটিতে দ্বিতীয় হয়ে চ্যাম্পিয়নস অফ চ্যাম্পিয়ন অর্থাৎ সেরাদের সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে। এখন অপেক্ষা শুধু সেই কল্পনার স্বপ্ন রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরষ্কার নেয়া। শোকাবহ আগস্ট মাসের কারণে প্রতিযোগিতা শেষে পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠান হয়নি। এমাসের( সেপ্টেম্বরের) মধ্যেই পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজন হলে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে পুরষ্কার গ্রহণের স্বপ্ন পূরণ হবে ধৃতির। এর আগের ৮ টি গোল্ড মেডেলের সাথে যুক্ত হয়েছে এবছরের ৫ টি গোল্ড মেডেল। মোট ১৩ টি গোল্ড মেডেলের সাথে একটি সেরাদের সেরা পুরষ্কার এখন ধৃতির ঝুড়িতে। এভাবেই সেরাদের সেরা হওয়ার গল্প শুনাচ্ছিলেন ধৃতির মা সুপ্তা দাস।
ধৃতির মা সুপ্তা দাস বলেন, হাঁটা শেখার পর এদিক ওদিক গিয়ে শুধু নাচত। কথা শেখার পর তার মুখে শুধু নাচ শেখার কথা। নৃত্যের প্রতি মেয়ের এমন টান দেখে দুই বছর বয়সে পড়ালেখার বিদ্যালয়ে ভর্তি করার আগে নাচের বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিয়েছি। ধৃতি পড়াশোনায়ও ফাস্টর্ ক্লাস ফাস্টর্। এজন্য অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। আমাদের পরিবারের মনে হতো নাচের জন্য ধৃতির পড়াশোনার ক্ষতি হবে। ভালো একটা ছাত্রীর পড়ালেখা নষ্ট হবে। তাই এসবে তারা রাজি ছিলেননা। আমার ইচ্ছে ছিলো মেয়েকে গান শেখাবো। কিন্তু মেয়ের ইচ্ছা নাচ শিখবে। মেয়ের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেক সংগ্রাম করেছি পরিবারের সাথে, পৃথিবীর সাথে। আমার মেয়ে যে নাচ শিখতে চাইতো সেই নাচের শিক্ষক পুরো সিলেট বিভাগে নেই। তখন আর্থিকভাবে আমরাও এতো স্বচ্ছল নই । তাই তাকে কোলে বসিয়ে ঢাকা নিয়ে যেতাম আবার ক্লাস শেষে ফিরে আসতাম । ঈশ্বরের কৃপায় আমার মেয়ে এখন পড়াশোনা এবং নাচ দু’টোতে সমানভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। এসবের পাশাপাশি গানেও বেশ পারদর্শী আমার মেয়ে। এখন আমার স্বপ্ন আমার মেয়ে সারাবিশে^ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে। নিজ যোগ্যতা অর্জন করে সমাজের কাজে আসবে। তার দক্ষতা নিজের জন্য নয় অসহায় মানুষ, পথশিশু, গরিব শিশুদের জন্য সারাজীবন কাজে লাগাবে।
বাবা আশুতোষ দাস বলেন, প্রথমে তার পড়ালেখা নিয়ে চিন্তা হলেও পরে দেখলাম সে তার পড়ালেখা ঠিক রেখে নাচ সহ অন্য সবকিছু করছে। এখন আমাদের সবার এটাই চাওয়া সে যেন পড়ালেখার পাশাপাশি সংস্কৃতি চর্চার দিক থেকেও অগ্রসর থাকে। এবার সেরাদের সেরা হওয়ায় আমরা আনন্দিত। সবার কাছে গর্ব করে মেয়ের কথা বলি। এটা শুধু আমাদের অর্জন না, এটা আমার সুনামগঞ্জের অর্জন। আমার মেয়েকে স্পষ্ট বলে দিয়েছি সে যেন তার পিতৃভূমিকে ভূলে না যায়। বড় হয়ে সে তার সবটুকু দিয়ে যেন সুনামগঞ্জের জন্য বিশেষভাবে কাজ করে। সবার কাছে আমার মেয়ের জন্য দোয়া ও আশীর্বাদ চাই।
ধৃতি বললেন, আমার বড় হয়ে বুয়েটে পড়াশোনার ইচ্ছা। বুয়েটে পড়ে ইঞ্জিনিয়ার হবো। পাশাপাশি দেশের বাইরে গিয়ে মনিপুরী, ভরত নাট্যম নৃত্যে পিএইচডি করতে চাই। দেশ এবং দেশের বাইরে গিয়ে বিশ্বব্যাপী শুদ্ধ নৃত্যচর্চা ছড়িয়ে দিতে চাই। বাংলাদেশকে বিশে^র বুকে তুলে ধরার ইচ্ছা। সুনামগঞ্জ আমার পিতৃভূমি। সুনামগঞ্জে নৃত্যের বিকাশে আমি যা শিখেছি, শিখবো সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো এগিয়ে নিতে।  আমার এসব কাজে আমার সবচেয়ে বড় শক্তি আমার মা। আমি যখনি কোনো সমস্যায় পড়েছি মা আমাকে সাপোর্ট দিয়েছেন। যদি পারিনি আরও বেশি করে উৎসাহ যুগিয়েছেন।
সিলেট জেলা শিশু বিষয়ক কর্মকর্তা সাঈদুর রহমান ভূঞা বলেন, এর আগে এরকম সেরাদের সেরা সিলেট বিভাগের পাশাপাশি পুরো দেশেই কেউ হয়নি। এটা ধৃতি সহ পুরো দেশের জন্য অনন্য রকম একটা রেকর্ড। ধৃতি অত্যন্ত মার্জিত নিরহংকার মেধাবী একটি মেয়ে।
 

বর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার