প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০৫:৩৩
আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রধান তিনটি স্তর— প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষা। প্রাথমিক স্তরে শিশু শ্রেণি থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত কেজি এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, মাধ্যমিক স্তরে ৬ষ্ঠ হতে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পাঠদান কলেজে সম্পন্ন করা হয়। বর্তমানে কিছু কিছু বিদ্যালয়েও একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি চালু করা হয়েছে। উচ্চ শিক্ষা বলতে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা পাশের পর ডিগ্রি (পাশ ও অনার্স) এবং মাস্টার্স ডিগ্রি ও তদুর্ধ পড়াশুনা বুঝায়। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে উচ্চ শিক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। বর্তমানে আমাদের কলেজ সমূহেও অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। পূর্বে ডিগ্রি পর্যায়ের সকল কলেজ ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। অধিভুক্ত কলেজের তদারকি করতে গিয়ে অভ্যন্তরীণ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার বাড়তি চাপ ছিল। সেই চাপ কমাতেও অধিভুক্ত কলেজ সমূহে শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষে ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডিগ্রি পর্যায়ের সকল কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়। পূর্বে শুধুমাত্র বড় বড় পুরাতন কলেজে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু ছিল। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর উচ্চ শিক্ষার ব্যাপক প্রসারের লক্ষে প্রান্তিক পর্যায়ের ছাত্র—ছাত্রীদের পড়ার সুযোগ সুবিধার উদ্দেশ্যে কলেজগুলোতে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়। বর্তমানে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এর অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা প্রায় ২৩০০। শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষে অধিভুক্ত সকল কলেজে পাঠদান উপযোগী সমান সুযোগ—সুবিধা সৃষ্টি করা প্রয়োজন। বাস্তবে অনেক কলেজ শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি কলেজ। কলেজটি ১৯৪৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৮০ সালে সরকারিকৃত। বর্তমানে কলেজটিতে ১০টি বিষয়ে অনার্স ও ৪টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। মোট শিক্ষকের পদসংখ্যা ৫২ তন্মধ্যে কর্মরত আছেন ৩৪ জন। প্রতিটি অনার্স বিষয়ের বিভাগে ৪জন করে শিক্ষকের পদ আছে এবং বর্তমানে একটি অনার্স বিষয়ে শুধুমাত্র একজন শিক্ষক আছেন। একজন শিক্ষক একাই উচ্চমাধ্যমিক সহ চার শ্রেণির অনার্সের ক্লাস নিচ্ছেন। এনাম কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী প্রতিটি অনার্স বিষয়ে ৭জন শিক্ষক এবং মাস্টার্স বিষয়ে ১২ জন শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। তাই সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে শিক্ষকের প্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টি করা এবং সৃষ্ট পদে শিক্ষক পদায়ন অত্যন্ত জরুরী নতুবা পাঠদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। অন্যদিকে সমপর্যায়ের মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ১৪টি বিষয়ে অনার্স ও ১২টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু আছে। মোট সৃষ্ট পদের সংখ্যা ৮১।
সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে ১১টি বিষয়ে ১জন করে মোট ১১জন শিক্ষক কর্মরত। ৩টি বিষয়ে কোন শিক্ষক নাই। কলেজটিতে ডিগ্রি (পাস) কোর্স চালু আছে। কলেজটিতে প্রতিটি বিষয়ে ৪টি করে শিক্ষক পদ সৃষ্টি করা এবং সৃষ্ট পদে শিক্ষক পদায়ন অতীব জরুরী। একই সময়ে জাতীয়করণকৃত মৌলভীবাজার সরকারি মহিলা কলেজটিতে সৃষ্ট শিক্ষক পদের সংখ্যা ৪৮। কলেজটিতে ৯টি বিষয়ে অনার্স এবং ১টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স আছে। সুনামগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজটি মৌলভীবাজার সরকারি মহিলা কলেজ থেকে অনেক পিছিয়ে আছে।
সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ বা সরকারি মহিলা কলেজ এর মতো বেশিরভাগ অধিভুক্ত কলেজই একই অবস্থায় আছে। এই সমস্ত কলেজে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ/পদায়ন করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারলে শিক্ষার্থীরা দারুনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। ফলে মানসম্মত শিক্ষাও নিশ্চিত করা যাবে না।
বর্তমানে কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে উপস্থিতি কমে গেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্লাস করার আগ্রহ দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে ছাত্র—ছাত্রীদেরকে প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিত থাকার ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী পূর্বে ছাত্র—ছাত্রীদের ৭৫% ক্লাস উপস্থিতি না থাকলে ফাইনাল পরীক্ষায় সুযোগ দেওয়া হত না। বর্তমানে ছাত্র—ছাত্রীদের ক্লাসে উপস্থিতির দিকে একবারেই নজর দেওয়া হয় না। জরুরী বিবেচনায় বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ কর্তৃপক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব। কলেজ পর্যায়ের সকল কলেজে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ/পদায়ন, শিক্ষকদের শূন্য পদ পূরণ, শিক্ষকদের সুযোগ—সুবিধা বৃদ্ধি এবং প্রতিদিন কলেজে উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, শিক্ষার্থীদরেও প্রতিদিন ক্লাসে উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা সহ লাইব্রেরির ব্যবস্থা এবং কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়ন সহ মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ।
বর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন