প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০৪:৩২
একদমের নাই ভরসা, করো তুমি কার আশা,
মিছামিছি দুই দিনের পরবাস।
না করলে সাধন মন, না হল ভজন।
হইলে না বন্ধেরই দাস \
আসা—যাওয়া একা, কবরে একা থাকা
তাই ভাবিয়া সোনার অঙ্গ নাশ।
আমার সংসারের অংশ নিতে আপন বংশ
ভাই বন্ধু করিয়াছে আশ \
আহা রে দুনিয়া, দুদিনের মায়া
কার লাগি কাটলে রে মন ঘোড়ারই ঘাস।
হাওয়ার পাখি, দিবে যে দিন ফাঁকি
কবরে পড়ে রইবে লাশ \
পাড়ি দিতে সাগর, মনেতে বড় ডর,
অন্ধকারে চেয়ে দেখি কেউ নাই আশপাশ।
মকদ্দস উদাসী, হাওয়ার পাখিরে ভালোবাসি
গেলে পাখি ছাড়িব নিশ্বাস \
যে—দিন গানটা উদাসী ভাইয়ের কাছ থেকে শুনি, এর কিছুদিন পরই তিনি চিরতরে চলে গেলেন। তাঁর এই মহাপ্রয়াণের খবর যখন পেলাম, তখনই এ গানটা মনে পড়ল। একই—সঙ্গে এ—স্মৃতিও চোখের সামনে ভেসে এলÑউদাসী ভাই গাইছেন আর বারবার হাঁপিয়ে উঠছিলেন, দু—একবার কাশলেনও। তীব্র শ্বাসকষ্ট চেপে তিনি অবলীলায় পুরো গান গাওয়া শেষ করলেন। বাড়ি—লাগোয়া এক কবরের সামনে নিজের গানের বই হাতে দাঁড়িয়ে তা দেখতে—দেখতে গান গাইতে থাকা উদাসী ভাই হাতের ইশারায় কবর দেখিয়ে গাইছিলেনÑ‘আসা—যাওয়া একা, কবরে একা থাকা/ তাই ভাবিয়া সোনার অঙ্গ নাশ।’
সেদিন খালি গলায় গেয়েছিলেন উদাসী ভাই। মাথা দুলিয়ে হাত নাড়িয়ে সাদা পাঞ্জাবি আর ডোরাকাটা লুঙ্গি পরা সফেদ চুল—দাড়িওয়ালা উদাসী ভাইয়ের কণ্ঠে একদলা বিরহ ভর করেছিল। তাঁর পাঞ্জাবির বুকপকেটে ছিল কলম আর চোখ—মুখে ছিল একরাশ ক্লান্তি। এ ক্লান্তি যে শিগ্গির চিরবিশ্রামে রূপ নেবে, তা সেদিন ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি। সেদিন গানযাপন আর আড্ডা শেষে উদাসী ভাইয়ের ডেরা থেকে আসার পর সিলেটে শেষবারের মতো তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল বইয়ের দোকান বাতিঘরে, পরে আমার অফিসে। এ ঘটনার কিছু পরে উদাসী ভাইয়েরই মুঠোফোন থেকে কোনো এক নারী কান্নারত কণ্ঠে সংবাদ দিয়েছিলেন, উদাসী ভাই দেহ রেখেছেন। সে—সংবাদ পাওয়ার পর থেকে উদাসী ভাইয়ের প্রসঙ্গ এলেই শুরুতে এ—গান স্মৃতিতে প্রথম উঁকি দেয়। এ—গান তরঙ্গ হয়ে ঢেউ তোলে বুকে। অগণিত না—বলা বাস্তবতা আর খেদ গানের শরীরে লেপটে আছে।
উদাসী ভাই কবরের পাশে দাঁড়িয়ে গাইলেন-
এক দমের নাই ভরসা, করো তুমি কার আশা,
মিছামিছি দুই দিনের পরবাস।
না করলে সাধন মন, না হলো ভজন।
হইলে না বন্ধেরই দাস \
উদাসী ভাইয়ের কণ্ঠে পরম বন্ধুর প্রতি আত্মনিবেদন ঝরে পড়ে। আর এ জগৎ—সংসার যে ‘দুই দিনের পরবাস’ তা—ও তাঁর কণ্ঠের আর্তিতেই অনুভব করা যায়। কিংবা তিনি যখন বলেন, ‘আমার সংসারের অংশ নিতে আপন বংশ/ ভাই বন্ধু করিয়াছে আশ \’Ñতখন বাস্তবতা এসে এক কঠিন সত্য উন্মোচন করে দেয়। এ দুটো পঙ্ক্তির কারণে কয়েকটি প্রশ্নও তাৎক্ষণিক সামনে এসে উঁকিঝুঁকি দেয়। তবে কি এজন্যই উদাসী ভাই সব সময়ে বৈষয়িক বিষয় থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করেছেন ? এ কারণেই কি স্থানীয় প্রশাসন উদাসী ভাইকে জায়গাসহ ঘর তৈরি করে দিতে চাইলেও তিনি তা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন ? এসব উত্তর পেতে তাঁকে আর প্রশ্ন করা হয়ে ওঠেনি। তবে তাঁর স্বভাব—বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এটা অনুমান করে নেওয়া যেতেই পারে- সম্ভবত উদাসী ভাই মনে করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে, স্বজন কিংবা বংশীয়—আত্মীয়রা সহায়—সম্পত্তির ভাগ বসাতে দ্বন্দ্ব—বিবাদ করতে পারেন। ফলে সংসারে বিষয়সম্পত্তি বাড়াতে তাঁর কোনো আগ্রহই ছিল না!
একই গানে উদাসী ভাই যখন বলে যান, ‘আহা রে দুনিয়া, দুদিনের মায়া/ কার লাগি কাটলে রে মন ঘোড়ারই ঘাস।/ হাওয়ার পাখি, দিবে যে দিন ফাঁকি/ কবরে পড়ে রইবে লাশ \’, তখন মৃত্যুচিন্তা এসে ঠাঁই নেয়। জনমভর জীবনযাপন করতে যে খাটাখাটুনিÑমৃত্যুর পর যে এর কোনো মূল্যই নেই, তা—ও এসব পঙ্ক্তির পলে পলে অনুভূত হয়।
গানের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে উদাসী ভাইয়ের কণ্ঠে আবেগের ঘনত্ব অনেকটাই বেড়ে গিয়েছিল। তিনি গাইছিলেনÑ
পাড়ি দিতে সাগর, মনেতে বড় ডর,
অন্ধকারে চেয়ে দেখি কেউ নাই আশপাশ।
মকদ্দস উদাসী, হাওয়ার পাখিরে ভালোবাসি
গেলে পাখি ছাড়িব নিশ্বাস \
গান শেষে উদাসী ভাই বার কয়েক কাশলেন। এর পর তিনি হেঁটে চলেন সামনের পাকা সড়ক ধরে। আমিও তাঁর সঙ্গী হই। তিনি অনবরত কেশেই চলেছেন। সম্ভবত গলায় কাশ আটকে আছে। গলা ঝেড়ে থু থু ফেলে সেই কাশ ফেলার বৃথা চেষ্টাও করলেন দু—একবার। হাঁটতে হাঁটতেই উদাসী ভাইকে আবার গান গাইতে বললাম। উদাসী ভাই আমাকে অবাক করে দিয়ে আবারও একই গানের পুনরাবৃত্তি করলেন। এবার আর বই দেখে নয়। এবার স্মৃতি আওড়েই গাইতে শুরু করলেন তিনি, ‘একদমের নাই ভরসা, করো তুমি কার আশা...’।
লেখক: লোকশিল্প গবেষক ও সংবাদকর্মী।
বর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন