‘আমি সুনামগঞ্জের, সুনামগঞ্জ আমার এই অনুভূতির তুলনা হয় না’ 

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০৪:৩৯

বীর মুক্তিযোদ্ধা—সাংবাদিক—ভাষাসংগ্রামী সালেহ চৌধুরী। সুনামগঞ্জের সূর্যসন্তান। বহুমুখী প্রতিভার প্রয়াত এই ব্যক্তিত্বের এক সন্তান পেশাগত সাফল্যে সুউচ্চ শিখরে অবস্থান করছেন। তিনি গ্রামীণফোনের প্রথম বাংলাদেশি সিইও ইয়াসির আজমান। শীর্ষ এই পদে নিযুক্ত হওয়ার আগে ইয়াসির আজমান গ্রামীণফোনের চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) ও উপ—প্রধান নির্বাহী বা ডেপুটি সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি টেলিনর গ্রুপের বিতরণ ও ই—বিজনেস বিভাগের প্রধান এবং টেলিনরের হয়ে বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। 
কীর্তিমান, খ্যাতিমান কর্পোরেট কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান এই প্রথম আঞ্চলিক কোনো সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাতকার দিয়েছেন। প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বলা কথা বর্ষপূর্তি সংখ্যার অন্যতম আকর্ষণ। পেশাগত ব্যস্ততা আর ইংরেজি বলার অভ্যস্ততা এড়িয়ে তিনি কথা বলেছেন অনন্য একজন হয়ে। সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর সম্পাদক ও প্রকাশক পঙ্কজ কান্তি দে। 

সুনামগঞ্জের খবর : শুরুতেই ব্যক্তিগত প্রশ্ন। আপনার ছেলেবেলা, বেড়ে ওঠা, পরিবার বৃত্তান্ত জানতে চায় মানুষ। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলুন—
ইয়াসির আজমান : আমার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা ঢাকায়; জিগাতলা ধানমন্ডি শংকর এলাকাজুড়ে বড় হয়েছি। শুরুতে উদয়ন বিদ্যালয়ে শুরু করলেও, আমরা তিন ভাই পরে কাকলি উঁচ্চ বিদ্যালয়ে চলে আসি। আমার বড় ভাই ওবায়েদ আজমান এবং ছোট ভাই ইয়ামীন আজমান দুজনই খেলাধুলায় ভাল ছিলো এবং সুনামগঞ্জ জেলা ক্রিকেটের হয়েও খেলেছে। বড় ভাই ওবায়েদ আজমান নিয়মিত ঢাকা ক্রিকেট লীগের খেলোয়াড় ছিলেন। আমার ছোট বেলার স্কুলের বন্ধুদের মাঝেও অনেকেই খেলাধুলার সাথে জড়িত ছিলো। আমাদের ছোট বেলার দিনগুলো বেশ অন্যরকম ছিলো, খেলতে যাবার জন্যে নিয়মের মাঝে অনেক স্বাধীনতা ছিলো, আছরের আযান থেকে মাগরিবের আযান পর্যন্ত পাড়ার বাসার সামনের ছোট ছোট খেলার জায়গা ছাড়াও ধানমন্ডির আবাহনী মাঠ, ঈদগাঁহ মাঠজুড়ে বিচরণ ছিলো। একটু বড় হলে ঈদগাঁহ মসজিদের সামনে আড্ডা। খালাতো ভাইবোনরা এক সাথে বড় হয়েছি। চাচাতো ভাইরাও ছিলেন। স্কুল জীবন শেষ করবার আগেই আমার সহধর্মীনির সাথে পরিচয় হয়, সময়গুলো অনেক সুন্দর এবং সাধারণ ছিলো। 


বাবাকে আসলে অনেক ভয় পেতাম। ছোট বেলায় তাঁর স্মৃতিগুলো বলতে গেলে আসলে তাঁর বই পড়া, লেখালেখি, মাঝে মাঝে একটু ছবি আঁকা, আমের সময়ে আম খাবার জন্যে তাঁর অন্য রকম আগ্রহ এগুলো মনে পরে। আমরা ঘুমিয়ে পরলে, যেদিন আব্বু আম নিয়ে আসতেন, আমাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে আম খেতে বলতেন, জন্মদিনে বই উপহার। এগুলো খুব মনে আছে ছোটবেলার। আব্বু প্রেসক্লাব এবং সাংবাদিকতার কাজ করে দেরি করে ফিরতেন বাসায়, কিন্তু তা রাত দশটার মধ্যে। আমাদের ছোট বেলায় আমাদের সাথে অনেক সময় কাটাতে না পারলেও বাসায় উনার চিন্তাধারা অনুযায়ী চলাফেরা অসম্ভব রকম ভাবেই ছিলো। উনার আদর্শেই আমাদের বড় হওয়া, দেশের জন্যে ভালবাসা, বড়দের সম্মান, সব সময় সত্য কথা বলা। আসলে একজন ভালো মানুষ হিসাবে যে গুণগুলো থাকা দরকার, তার যতটুকু আমার আছে এর পিছনে তাঁর বিশাল অবদান এবং আমার আম্মুর অবদান। রমযানের সময়গুলো ছিলো অন্যরকম, আব্বু রমযানের সময় সন্ধ্যার আগে বাসায় আসতেন, আম্মুর বানানো ইফতার খেতেন, অনেক রকমের আয়োজন হতো, সব বাসায় বানানো আব্বুকে কেন্দ্র করে। এইগুলোই ছোট বেলা।


ছোট বেলার বেশী সময় কেটেছে আমাদের আম্মুকে ঘিরে। ছোট বেলায় আম্মুকে কুঠির শিল্পের সাথে দেখেছি কিছুদিন, কিছুদিন স্কুলেও পড়িয়েছেন। কিন্তু আসল পরিচয় মা একজন গৃহিণী ছিলেন, ছিলেন একটা ইনস্টিউশনের মতো । ছোটবেলায় দেখেছি মধ্যবিত্ত পরিবার কাকে বলে এবং তাতে একজন মা এর অবদান। আব্বু মাসের শুরুতে যে টাকা দিতেন তাই দিয়ে সংসার চালানো হতো। আমাদের এবং আমার পড়াশুনার পিছনে আম্মুর সব রকম চেষ্টা। ছোটবেলায় আমি আম্মুর কাছে অংক শিখেছি যা আমাকেই তৈরি করছে বলে আমি মনে করি, এসএসসি পরীক্ষায় ১০০ তে ১০০ পেয়েছিলাম অংকে, যার কারণে ঢাকা কলেজে পড়তে পেরেছি, এমবিএ তে সুযোগ পেয়েছি, একজন লজিকেল মানুষ হিসাবে বড় হয়েছি। এভাবেই বেড়ে উঠা। আমি মনে করি সঠিক ভাবে চিন্তা করতে শিখেছি ছোটবেলার আম্মুর শিক্ষা এবং আব্বুর আদর্শ ধারণ করতে পেরে। ছোট বেলায় একটা সুস্থ পরিবেশের মাঝে বড় হওয়া বলতে যা বুঝায় আব্বু আম্মু তার সবটাই দিয়েছেন।

সুনামগঞ্জের খবর : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েছেন যুক্তরাজ্যে। একজন ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’ হিসেবে দেশে—বিদেশে পরিচিতি এখনো আছে। এ সম্পর্কে কিছু বলুন—
ইয়াসির আজমান : আমি ঢাকা ইনিভার্সিটির আইবিএ থেকে এমবিএ করেছি। বাহিরের দেশের বিভিন্ন ইউনিভার্সিটি বা ইনস্টিটিউটের শিক্ষাগুলো আসলে প্রোফেশনাল শিক্ষা। তারমধ্যে একটা ছিলো লন্ডন বিজনেস স্কুলে। গ্রামীণফোন থেকেই গিয়েছিলাম। আমি নিজেকে মোটিভেশনাল স্পিকার হিসাবে মনে করি না, কিন্তু ব্যক্তিগত এবং কর্মজীবনের মাঝে নিজের শিক্ষাগুলো অন্যদের মাঝে, মূলতো তরুণদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে এবং তাদেরকে আত্মবিশ্বাস সহ সামনে এগিয়ে যেতে উদ্ধুদ্ধ করতে চেষ্টা করি। এগুলো যদিও নিজে নিজে বলার কথা প্রথমে মনে আসেনি, আপনাদের মতো সাংবাদিকরাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন করে বের করে এনেছেন। যেমন ধরুন আজকে আপনি দেখছেন বাংলাদশের সবচেয়ে বড় কোম্পানির প্রধান কর্মকর্তা হিসাবে এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি এবং বাইরের ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশুনা করা, আমি কিন্তু এইচএসসি পরীক্ষার পরে কোথায়ও ভর্তির সুযোগ পাইনি, কোথায়ও না। আমার সব বন্ধুরা ভাল ভাল জায়গায় সুযোগ পেয়েছে, আমার যার সাথে প্রেম ছিলো, আমার সহধর্মিনী সেও কয়েকটা জায়গায় ভর্তির সুযোগ পেয়ে সিলেটের ওসমানী মেডিকেলে পড়তে শুরু করেছে। আমি কিন্তু হাসি মুখে তাদের সাথে থেকেছি সময় কাটিয়েছি, একই সাথে নিজেকে বলেছি আমার সময় আসবে, প্রিপারেশন নিয়েছি নিজের শক্তিগুলোর উপর ভিত্তি করে বাসায় বসে, সবাই যখন উঁচ্চ শিক্ষা শুরু করে দিয়েছে। হার মানিনি কিন্তু এই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে আমার যে শিক্ষা হয়েছে তা অন্যরা পায়নি, সেটা এখন কিভাবে কাজে লাগছে, সেগুলো তরুণদের সাথে চেষ্টা করি শেয়ার করার জন্যে। 
আবার ধরুন কর্পোরেট জীবনে স্বচ্ছতা এবং সততার মানে কী এবং এগুলো কীভাবে সহযোগিতা করে নিজেকে একজন সফল কর্পোরেট ব্যক্তি হয়ে উঠতে এবং দীর্ঘস্থায়ী হতে সেগুলো শেয়ার করি, কারণ এটা কঠিন কিন্তু এর মধ্যেই অন্যরকম পাওয়া এবং এগুলোর মধ্য দিয়েই কাক্সিক্ষত সফলতা সম্ভব। 
এরকম আরো অনেক কিছু আছে যেগুলো আমি আমার পরিবার এবং কর্মজীবনে দেশে এবং বিদেশে কাজ করে শিখেছি, আমি দেখেছি অনেকেই এগুলো শুনতে চায়, শিখতে চায়। আমি বলি আমাদের সবার কিছু না কিছু গুণাবলী আছে, তাই আমরা সবাই সফল হবার যোগ্যতা রাখি, এগুলো বিশ্লেষণ করে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি। 

সুনামগঞ্জের খবর : গ্রামীণফোন আপনাকে না পেলে আমরা কোন পেশায় আপনাকে দেখতাম? ভবিষ্যৎ  পরিকল্পনা কী ছিল?
ইয়াসির আজমান : আমি বিভিন্ন রকম উদ্যোগ নিতে পছন্দ করি, সব কিছু যে কাজ করবে তা না, চেষ্টা করি নিজের বা কলিগদের আইডিয়াগুলো নিয়ে কাজ করতে বা সহযোগিতা করতে। আমি মনে করি আমি যদি গ্রামীণফোনে না আসতাম আমি একজন উদ্যোক্তা হতাম, নিজে কিছু করতাম, আমি মনে করি আমার ভিতরে এক প্রচন্ড রকম পজিটিভ ইচ্ছা শক্তি আছে, তা আমি কাজে লাগাতে পারতাম। আবার মাঝে মাঝে মনে হয় আমি বোধহয় একজন ভালো শিক্ষক হতাম। জানেন আমি এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা থেকে আমাদের গ্রামের বাড়ি চলে এসেছিলাম এবং এক মাস গ্রামের হাইস্কুলে অংক করিয়েছি। স্কুলের সময়ের পরে গচিয়ার বড়বাড়ীর (আমাদের বাড়ি) বাংলোয় বসে যারা পড়তে চেয়েছে পড়িয়েছি।

সুনামগঞ্জের খবর : গ্রামীণফোনের যে পদে আপনি আসীন, এ পদে এর আগে কোনো বাংলাদেশির সুযোগ হয়নি। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি সম্পর্কে কিছু বলুন—
ইয়াসির আজমান : এটা ঠিক আমিই প্রথম একজন বাংলাদেশের সন্তান হিসাবে গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছি । এর পিছনে আমার যেমন সবসময় নিজের কাজ সঠিক ভাবে করার চেষ্টা ছিলো, এর থেকেও বড় ব্যাপার ছিলো গ্রামীণফোন এবং টেলিনর যেভাবে আমাকে তৈরি করেছে, বিভিন্ন রকমের চ্যালেঞ্জ দিয়েছে নিজেকে তৈরি করবার জন্যে। কাজের বাইরে লিডারশিপের উপর দেশে এবং বিদেশে অনেক রকমের ট্রেনিং এর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। কাজের মধ্যে বড় বড় প্রজেক্টের নেতৃত্ব দেবার সুযোগ দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে শিখেছি, দেশের বাইরে ভারতে অনেক বড় দায়িত্ব দিয়েছে, সেখানে শিখেছি। নরওয়েতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি এবং শিখেছি। এই সময়টাতে দেশের এবং বাইরের সব কর্মীদের কাছ থেকে শিখেছি। চেষ্টা করেছি সময়ের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং সততার সাথে সবাইকে নিয়ে কাজ করার, সব সময় সহকর্মীদের এবং কোম্পানির ভালটা মাথায় রেখেছি, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হবো তা ভাবিনি, সেটা একটা ফলাফল বলতে পারেন, তাই বলবো প্রত্যাশার চেয়ে প্রাপ্তি বেশী এবং তাই হওয়াটাই সমীচিন বলে আমি মনে করি।

সুনামগঞ্জের খবর : আপনি ও আপনার কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশের জন্য নতুন এক সূত্রপাত। ভবিষ্যতে আপনার পদাঙ্ক অনুসরণ করে গ্রামীণফোন বা এ জাতীয় কোম্পানিতে বাংলাদেশিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়ার পথ কতটা সুগম বলে আপনি মনে করেন?
ইয়াসির আজমান : আমি মনে করি এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছর হবার সাথে সাথে বেশ ভাল করেই শুরু হয়েছে। আমি ছাড়াও একই সময়ে এবং বিশেষ করে এর কিছুদিন পর থেকে আরো বেশ কিছু মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বাংলাদেশী কর্মকর্তারা নেতৃত্বস্থানীয় পদ পেয়েছেন। বড় কথা হচ্ছে যোগ্যতাকে মূল্য দেয়া হচ্ছে । মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো কনফিডে্নস পাচ্ছে। গ্রামীণ ফোনে তো এখন গুরুত্বপূর্ণ সকল পদেই বাংলাদেশিরা নেতৃত্বস্থানীয় পদে আছেন তাদের যোগ্যতা দিয়ে।

সুনামগঞ্জের খবর : গ্রামীণ ফোনের গ্রাহক সংখ্যা এখন কত? ভবিষ্যৎ উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?
ইয়াসির আজমান : গ্রামীণফোনের গ্রাহক সংখ্যা এখন ৮ কোটি ২০ লাখের কাছাকাছি। 
আমরা অনেক নতুন ধরনের উদ্ভাবনী প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছি যেগুলো বাংলাদেশকে একটা স্মার্ট বাংলাদেশ হতে সহযোগিতা করবে। স্মার্ট বাংলাদেশ বলতে আমি বুঝি একটা সমাজ ব্যবস্থা, যাতে কোনরকম বৈষম্য থাকবে না, সবাই সমান সুযোগের অধিকারি হবে এবং নিজের প্রতিভা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে। মানুষের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই শুধু নয় মন এবং মানসিক বিকাশের স্বাধীনতা থাকবে। একটা সমাজ ব্যবস্থা যেটা প্রযুক্তি নির্ভর। আর প্রযুক্তি এবং সঠিক নেতৃত্বের মাধ্যমেই এটা সম্ভব। যেমন ধরুন মানুষের কাছে তার বেসিক প্রয়োজনগুলোর সর্বত্তোম সমাধান নিয়ে যাওয়া, উদাহরণ স্বরুপ শিক্ষা ও চিকিৎসা, প্রযুক্তির মাধ্যমে এগুলো সবার কাছে বৈষম্যহীনভাবে নিয়ে যাওয়া যায়। আমরা তরুণদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছি, যেন আমরা প্রযুক্তি নির্ভর একটা সমাজ ব্যবস্থা গড়তে সহযোগী হিসাবে থাকতে পারি। আমরা তরুণ উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করছি। প্রাইভেট পাবলিক ডেভলপমেন্ট এর মাধ্যমে এই কাজগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে কাজ করছি। সবার শেষে বলবো গ্রামীণফোনের মাইজিপি এ্যপটা একটা ডিজিটাল প্লাটফর্ম হিসাবে এমন ভাবে তৈরি করছি, যাতে মানুষ সকল প্রয়োজনগুলো এর মাধ্যমে পেয়ে যায়। বাংলাদেশ সরকারের ডিজিটাল সার্ভিসগুলোও এর মাঝে নিয়ে আসা হয়েছে।

সুনামগঞ্জের খবর : আপনার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী ভাটি বাংলার একজন গেরিলা যোদ্ধা। পেশাজীবন ছিল সাংবাদিকতা। বাবার কথা মনে হলে সবার আগে কোন স্মৃতি চোখে ভাসে?
ইয়াসির আজমান : সালেহ চৌধুরী, আমার বাবা, সুনামগঞ্জের দিরাই থানার গচিয়া গ্রামের সম্ভ্রন্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় বাবা আজমান রাজা চৌধুরীকে হারিয়ে মৌলভীবাজার স্কুলে পড়তে চলে যান, তারপর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ^বিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষ করে সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন, অতঃপর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে নিজের আসল পরিচয় খুঁজে পান, নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন, তিনি মেজর সাব বা কোথায়ও বা চৌধুরী সাব হিসাবে পরিচয় পান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের জন্যে। যুদ্ধ শেষে আবার নিজ পেশায় ফেরত যান। এর বিনিময়ে কিছু হাসিল করতে কখনই রাজী হননি। একটা নির্লোভ সাধারণ জীবন কাটিয়েছেন। গুলশান বনানীতে জমি নেননি কারণ তা নিতে হবে একজন পাকিস্তানি গভর্নরের কাছ থেকে। এমপি মন্ত্রী হননি, বলেছেন এগুলো আমাদের জন্যে না। নিজেকে কোনদিন কখনও সামনে বা প্রচারে আনেন নি। পিছনে থেকেই নেতৃত্ব দেয়া ছিলো তাঁর পছন্দ বা স্বাচ্ছন্দ ।
সাহিত্য এবং সৃজনশীল কাজেই বেশী সহজ বোধ করতেন মনে হয়। দাবার গ্রান্ড মাস্টার নিয়াজ মোর্শেদ কে ছোটবেলা থেকে নিজের সন্তানের মতো করে গড়ে তুলেছেন। হুমায়ুন আহমেদের প্রথম দিকে লিখা ও ছাপায় সহযোগিতা দিয়েছেন, শামসুর রাহমান , হুমায়ুন আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, ইমদাদুল হক মিলন সহ ছোট বড় সাহিত্যিকদের সবার সাথে সমান তালে উঠা বসা ছিলো, হুমায়ুন আহমেদ তাকে নানা ডাকতেন এবং একবার লিখেছিলেন সালেহ চৌধুরী হচ্ছেন একজন সাহিত্যের মৌমাছি, নিজের অনেক প্রতিভা থাকার পরেও সাহিত্যের ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াতেন, তারপরেও লিখেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন অনেক। 
আমার বাবা ছিলেন বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী। কলেজ জীবনে কবিতা লিখতেন। ভাস্কর্য বানিয়েছেন পটু হাতে, বাঁশ কেটে ডিজাইন করা হাতের লাঠি বানিয়ে ফেলতেন, ছবি আঁকতেন খুব সুন্দর বিশেষ করে পেনসিলের স্কেচ । বন্ধু মহলে খুবই আমুদে এবং বন্ধুত্ব সুলভ ছিলেন। 
আবদুল্লাহ খালিদের ঢাকা ভার্সিটির ভাস্কর্যটির নাম অপরাজেয় বাংলা তার দেয়া। তেমনি ভাবে দিয়েছেন চাঁদপুরের ভাস্কর্যটির নাম অঙ্গীকার। 
আব্বু একজন প্রতিবাদী রাজনীতি সচেতন মানুষ ছিলেন। ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি নিজ হাতে পোস্টার বানিয়ে বিলি করেছেন, তখন ছিলেন সিলেটে মুরারীচাদ কলেজের ছাত্র। প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেনের বই এ পড়েছি ১৯৬৯ এর আন্দোলনে শহীদ মতিয়ুরের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল করেছেন। সাংবাদিক আবদুল গাফফার চৌধুরী’র মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ছাপার আগে পড়তে পেরে বুঝেছিলেন এটাই আমাদের মুক্তির সনদ। জীবনবাজি রেখে ১৯৭১ এ কলম ছেড়ে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন নিজের এলাকার মানুষদের রক্ষার জন্যে। অসম্ভবরকম অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিলো তাঁর মাঝে। যার জন্যে রাজনীতিতে না জড়ালেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে জয়ী করতে সব সময় নিজের এলাকা দিরাই এ হাজির হয়েছেন ইলেকশনের সময়। সাংবাদিকতায় মনোনিবেশ করলেও সেক্টর কমান্ডার ফোরামের একজন উপদেষ্টা ছিলেন। ছিলেন জাহানারা ইমামের গণ—আন্দোলনের একজন সাক্ষী। সাক্ষী দিয়েছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে। ছিলেন নিলোর্ভ ও নিভীর্ক। 
সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা হারুন হাবিব বলেছিলেন একজন সেক্টর কমান্ডার তার বইয়ে বঙ্গবন্ধু কে নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন, তৎক্ষণাৎ তার প্রতিবাদ করেছিলেন এবং প্রকাশনা উৎসবের প্রথম সারি থেকে বেড়িয়ে আসেন। সত্যের পক্ষে থাকতে কখনো পিছপা হননি। কখনও কথাই বলতে চাননি কেন তিনি একুশে বা স্বাধীনতা পদক পাননি। কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন বাংলাদেশ চাপ্টার গঠন এবং পরে নেতৃত্ব দিয়েছেন। 
মৃত্যুর কিছুদিন আগে তখনো জানতেন না তাঁর ভিতরে ক্যান্সার বাসা বেঁধেছে, আমাকে তাঁর সঞ্চয় এর শতভাগ দিয়ে বললেন, সুনামগঞ্জের বন্যাকবলিত কৃষকদের মাঝে পেঁৗছে দিতে, একটা আইডিয়া দিয়ে দিলেন কি করা যেতে পারে, আমি আইডিয়া শুনবো কি, ভাবছিলাম একজন মানুষ তাঁর শতভাগ সঞ্চয় কিভাবে দিয়ে দিতে পারে। এরকম আরো কতো স্মৃতি চোখে ভাসে, বলে আর লিখে শেষ করা যাবে না।

সুনামগঞ্জের খবর : সুনামগঞ্জ শহরে প্রথম যে শহীদ মিনারটি নির্মিত, সেটি আপনার বাবার নকশায়। এ সম্পর্কে আপনি আপনার বাবার কাছ থেকে কিছু শুনেছেন কি?
ইয়াসির আজমান : বিভিন্ন লিখা থেকে যা জেনেছি তার বাইরে কিছু শুনি নি। একটা সময়ের দাবি ছিলো কেউ সাহস করছিলো না, আবার বুঝতেও পারছিলো না কীভাবে করবে, তিনি তাঁর সৃষ্টিশীল মন দিয়ে খুব সহজেই নকশাটা কেমন হবে তাৎক্ষণিক করে দিয়েছিলেন। ভুল না হয়ে থাকলে, আমি ইদানীং শুনতে পাই এই শহীদ মিনারটি সরিয়ে ফেলার কথা উঠছে, এটা কোনভাবেই হতে দেয়া উচিত নয়। আমাদের গর্ব আমাদের পরিচয় আমাদের স্বাধীনতার চিহ্ন রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

সুনামগঞ্জের খবর : বাবার বীরত্ব নতুন প্রজন্মের কাছে ছড়িয়ে দিতে আপনার পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ আছে কি?
ইয়াসির আজমান : আব্বুর (বীর মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী) একটা স্বপ্ন কিভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা নিয়ে সবসময় ভাবি এবং সম্ভব হলে করতে চাই। আব্বু শেষ জীবনে এসে তাঁর মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে পাওয়া ভাতা গ্রহণ করেছিলেন এবং তা দিয়ে তাঁর শহীদ সহযোদ্ধাদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্যে যুদ্ধে যেখানে তার সহযোদ্ধারা মৃত্যুবরণ করেছিলেন, সেসব জায়গায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন। দুটো জায়গায় করেছিলেন দীপ্তস্মৃতি নামে। আরো কিছু জায়গায় করবার ইচ্ছা ছিলো তাঁর, কিন্তু সঠিকভাবে আমি জানি না সে সকল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম এবং স্থান। কেউ যদি জানেন, আমাকে জানাবেন আশা করি। 
তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন। আমি মাঝে মাঝে ভাবছি যে কিছু করা দরকার, তার বীরত্বের কথা ছড়িয়ে মানুষের মাঝে দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক মনোভাব আরো বেশী করে জাগ্রত করা যেতে পারে। তাঁর জীবন দর্শন এবং নির্লোভ নির্ভিক জীবন থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। মুক্তিযুদ্ধের ওপর তাঁর লেখা বইটা পড়লেও অনেক কিছু জানা যায়।

সুনামগঞ্জের খবর : বহুজাতিক বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে সুনামগঞ্জের একজনকে দেখে এই অঞ্চলের সকলেই খুশি। আপনার নামের যে ব্র্যান্ড তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে সুনামগঞ্জের জন্য কিছু করার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আছে কি?
ইয়াসির আজমান : আমি আমার চাকরির সুবাদে সামাজিক ক্ষমতায়নে একটা বিশাল বড় সুযোগ পেয়েছি এবং যথাসাধ্য চেষ্টা করছি আমার কাজের মাধ্যমে সমাজের জন্যে কিছু করা। সুনামগঞ্জ আমার পরিচয়। সুনামগঞ্জের সন্তান আমি। আব্বু একবার লিখেছিলেন একটা পত্রিকায়, হেডলাইনটা ছিলো এমন ‘আমি সুনামগঞ্জের, সুনামগঞ্জ আমার’। লিখেছিলেন পড়ালেখা শেষ করে ঢাকায় স্থায়ী হলেও ‘তবু দেশের উত্তর—পূর্ব কোণে মেঘ জমতে দেখলে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সময় বুঝে মাঠের ফসলের কথা ভেবে মন ব্যাকুল হয়ে পড়ে। যত দূরেই থাকি, শিকড়ের টান কাটাতে পারি না। এই টান যে কাটাতে চাই, তাও না। এই আবেগটুকু লালন করে মনের প্রসন্নতা উপভোগ করি। আমি সুনামগঞ্জের, সুনামগঞ্জ আমার এই অনুভূতির তুলনা হয় না। এর ব্যাখ্যাও অসম্ভব’।  সেই লিখায় তিনি আরো বলেছিলেন, ‘সুনামগঞ্জ কে তিনি কিছুই দিতে পারেননি শুধু নিয়েছেন।’ আব্বু সুনামগঞ্জের মানুষের টানে ঢাকা থেকে এসে জীবন বাজি রেখে সুনামগঞ্জে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরলেও কিছু না দিতে পারার অনুভূতি। এটা ব্যাখ্যার অতীত। আসলে আমরা দেয়ার চেয়ে, নিয়েই নেই বেশী! কি করলে দিতে পারা হবে, আমাদের তাই করতে হবে। পৃথিবীটাকে বসবাসযোগ্য করে তৈরি এবং রেখে যেতে হবে।
সুনামগঞ্জের খবর: আপনার জন্মভিটে সুনামগঞ্জের মানুষের জন্য কিছু বলুন?
সুনামগঞ্জ থেকে সবসময় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অনেক সুনামধন্য ব্যক্তিবর্গ ছিলেন। এটা রাজনীতির ক্ষেত্র থেকে শুরু করে শিল্প সাহিত্য সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, শিক্ষা, সরকারি কর্মক্ষেত্র ব্যবসা সকল ক্ষেত্রেই। এখনও অনেক দেশবরেণ্য মানুষ আছেন সুনামগঞ্জ থেকে। আমরা যারা সুনামগঞ্জের তারা অসাম্প্রদায়িক, সকল ধর্ম বর্ণের একসাথে উঠাবসা—বসবাস। ঐশ^র্যে ভরা সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা। আছে মাছ—ধান আরও অনেক কিছু। আমাদের এলাকার মানুষ অতিথিপরায়ণ, আছে ট্যুরিজমের বিশাল সম্ভাবনা। একইসাথে আছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আরও বেশি রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কা, বিশেষ করে বন্যার ভয়াবহতা। আমাদের বলিষ্ট নেতৃত্বের প্রয়োজন, যেমনটি ছিল সব সময়, আছে শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা। পরিবেশের ক্ষতি না করে একটি নিরাপদ পৃথীবি রেখে যাবার জন্যে সামাজিক আন্দোলন এবং জনসচেতনতা তৈরি করার প্রয়োজন আছে। দুর্গমতা কখনোই এ এলাকার মানুষকে পিছিয়ে রাখতে পারে নাই, রাখতেও পারবে না। সঠিক নেতৃত্ব আর তারুণ্যের সমন্বয়ের সাথে প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের অগ্রযাত্রা বজায় রাখবে।

সুনামগঞ্জের খবর : ব্যস্ততার মধ্যে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ
ইয়াসির আজমান : আপনাকেও ধন্যবাদ।

বর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার