প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০৪:৪৬
টলস্টয় একজন বিশ্ববিখ্যাত মানুষ। বাংলাতে কেউ কেউ তার নামের বর্ণবিশ্লেষণ লিখেন তলস্তয়। বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামের শেষাংশ ইংরেজরা নিজেদের উচ্চারণে করে দিয়েছেন ঠেগুর/টেগোর—এর কাছাকাছি এই একটা কীছু, আমাদের আমজনতার সদস্য কারও কারও বাকযন্ত্রে সেটার পরিপূর্ণ মাখরেজ (বাচনিক বাকভঙ্গি) আদায় ষোলআনা হয় তো সম্ভবই নয়।আদি—অকৃত্রিম বৈয়াকরণিক আমজনতা ঠেকার কাজ চালানোর মতো একটা কীছু সব সময়ই করে চলেন এবং এটাই ব্যাকরণ।‘প্রণাম’ উচ্চারণ করা তাঁদের পক্ষে সহজসাধ্য নয় বলেতাঁরা তাঁদের সহজ উচ্চারণে বলেন ‘পেন্নাম হই বাব’ু। তাঁদের মুখে ব্রাহ্মণ, চক্রবর্তী, পুরকায়স্ত শ্রাদ্ধ ইত্যাদি শব্দ হয়ে পড়ে যথাক্রমে বামন, চক্কত্তি, পুর্কাইৎ, ছেরাদ্দ। লক্ষণশ্রীকে তাঁরা বলেন লখনচিরি। তেমনি ইংরেজি হস্পিটাল্কে কিন্তু আমরা বাঙালিরা হস্পিটাল্ বলি না, বলি হাস্পাতাল্, আর আমজনতা বলেন আস্পাতাল্। গৃহপালিত পাখি ‘হাঁস্’কে তাঁরা যেমন বলেন‘আস্’ তেমনি । এই প্রক্রিয়ায় তাঁরা ‘হাওর’কে ‘আওর’ বলে ফেলেন। তাঁরা উচ্চারণে শুদ্ধতার বা পরমোৎকর্ষতার এতো বেশি ধার ধারেন না। এইভাবে কালক্রমে ভাষার বিবর্তন হয়েই চলে। সিন্ধু শব্দটি ভারতীয় এবং সংস্কৃত। এক সময়, অর্থাৎ কালের আবর্তে পড়ে কালক্রমে, মধ্যপ্রাচ্যের ফারসি উচ্চারণে, এই যাকে বলে উচ্চারণ বিকৃতির কবলে পড়ে শব্দটি হয়ে গেছে সিন্ধু থেকে হিন্দু এবং যথারীতি ভারতীয় ভাষায় আত্তীকরণের সুবাদে ভারতীয় ভাষাদেশে থিতু হয়ে পড়েছে। এইভাবেই সিন্ধুস্থান হয়ে গেছে হিন্দুস্তান। এটাই ভাষার পাল্টে গিয়ে বেঁচেবর্তে থাকার নিয়ম, জনসমাজে এভাবেই শব্দের বাচনভঙ্গি বদলের অন্তর্নিহিত প্রকরণের প্রসারসঞ্জাতজনবোধ্য বাকভঙ্গি তৈরি হয় এবং তৈরি হয় ভাষার ধরণধারণ চলনবলন অর্থাৎ ব্যাকরণ এবং এই ব্যাকরণ ক্রমাগত বদলে যায়, কালের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তার রূপের রূপান্তর হতে থাকে।
এখানে একটি কথা উল্লেখের বোধ করি সবিশেষ প্রয়োজন আছে, আর সেটা হলো একভাষা থেকে অন্য ভাষায় শব্দ প্রবসিত হওয়ার সময় স্থানীয় উচ্চারণে আংশিক বা পুরোটাই পালটে যায়, এমনকি অর্থদ্যোতকতারও পবিরর্তন ঘটে যেতে পারে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে তো অর্থটা সম্পূর্ণ বিপরীতার্থকতা অর্জন করে। সে যাই হোক, মোট কথা প্রবসিত শব্দটার খোল—নলছে পাল্টে যায় এবং বৈয়াকরণিকরা (রাজা রামমোহনের মতো ব্যাকরণবই প্রণয়ন করে যাঁরা নিজেদের পাণ্ডিত্য প্রকাশে ব্যাপৃত হন) এই পালটে যাওয়া শব্দটিকেই সাধারণত ভাষাদেশের সদস্য হিসেবে ছাড়পত্র দিয়ে থাকেন। যেমন চেয়ার, টেবিল, বেঞ্চি, হাসপাতাল, বইদা, কারচুপি, ইসকুল, বিরিজ ইত্যাদি। এদের প্রত্যেকটিই কোনও না কোনও প্রকারপ্রকরণে অর্থাৎ বাঙালির বাকযন্ত্রের কেরদারিশমার (কেরদানি+ক্যারিশমা+র)চতুর চক্করে পড়ে পালটি খেয়ে বাংলাশব্দের ‘জাতে উঠার বামুনে পৈতে’ লাভ করেছে। এতে করে তাদের গায়ে লেপটে থাকা বিদেশিতার (বেশির ভাগ বিলেতিয়ানারকারণ ঔপনিবেশিক প্রকরণে বিলেতিরা পৌনে দুই শত বছর বিলেতিয়ানার গাদনপ্রহরণ গ্রহণে ভারতীয় উপমহাদেশকে বাধ্য করেছিল এবং নয়াউপনিবেশিক প্রকরণে এখনও করছে।)নামগগ্ধ লোকনিরুক্তির কাপূর্রিক প্রকরণে জনসমুদ্রে বিলীন হয়ে গেছে। সোজা কথায় এইসব ইংরেজি অথবা অন্য কোনও বিদেশি ভাষার শব্দ আরবিদেশি থাকে নি, প্রকারান্তরে দেশি শব্দে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে, একেবারেই হয়ে গেছে ঘরোয়া ও আটপৌরে ভাষাদেশের নাগরিক। ইংরেজি হসপিটাল (উচ্চারণ হস্পিটাল্) হয়ে গেছে হাসপাতাল (প্রমিত উচ্চারণ হাস্পাতাল্, আমজনতার উচ্চারণে আস্পাতাল্) আর ফারসি কারচুবি বাংলায় হয়ে গেছে কারচুপি। কারচুবি ‘ব’—কে পায়ে ঠেলে দিয়ে ‘প’কে বুকে নিয়েকেবল গায়েগতরে বদলে নি, অর্থের অপকৃষ্টতাকে একান্তে ধারণ করে হয়েছে ভাবান্তরিত। ফারসিতে বুঝাত উত্তম নকশাদার শিল্পকর্ম (কাপড় বা অন্য কীছুর উপর নকশার কাজ), বাংলায় বুঝায় চালাকি, লোকঠকানোর চতুরতা।এখন এইসব শব্দের গায়ে অতিথির গন্ধ উবে গিয়ে ঘরের গন্ধের মৌতাতনিরন্তর ম—ম করে। আমজনতা তো উচ্চারণের বিশুদ্ধার নিকুচি করে আব্দুজ জহুর ব্রিজের ব্রিজ শব্দটির উচ্চারণ বিরিজ করতেই বেশি পছন্দ করেন, তাঁদের বাকযন্ত্র উচ্চারণ সহজীকরণের নিয়ম সচল রেখে এটিকে বিরিজ করে নিতেইবেশি পারঙ্গম ও তাতেই তাঁরা অভ্যস্ত। ভাষার এই ক্রমাগত রূপান্তর—ভাবান্তরের প্রকরণটি বিশ^জুড়া সর্বভাষার ক্ষেত্রে প্রকৃতিগতভাবে কার্যকর একটি সর্বজন স্বীকৃত বিষয়।
ঠিক ভাষান্তর নয়, বরং বলা যায়, কোনও ভাষাদেশে অপর ভাষাদেশের শব্দনাগরিকের প্রবসনের পরিপ্রেক্ষিতে এমন রূপান্তর—ভাবান্তর যে কতো হচ্ছে তার কোনও ইয়ত্তা নেই। উদাহারণ দিতে গেলে একটি আলাদা বই লিখে ফেলতে হবে। ধরুন এই যে বললাম ‘আলাদা বই’। এই ‘আলাদা’ ও ‘বই’উভয়েই একদা ছিল যথাক্রমে ‘আলাহিদা’ ও ‘অহি’, আরবি ভাষাদেশের সম্মানিত নাগরিক। বাঙালির বাকযন্ত্রের কারচুপির কবলে পড়ে উচ্চারণ বিকৃতির শিকার হয়ে হয়ে উঠেছে বাংলা শব্দ ‘আলাদা’ ও ‘বই’। যে—কোনও ভাষার নিয়ম এটাই। বাঙালির বাকযন্ত্রের কারখানায়উচ্চারণের কলকাঠি উৎপাদন সহজসাধ্য নয়,‘আলাহিদা ও ‘অহি’ এই শব্দদ্বয় এমন কোনও বিরল বৈশিষ্ট্যধারণ করে না, বরং শব্দ দু’টিকে বাঙালির বাকযন্ত্রের জৈবকারিগরির কারচুপিকল্পের স্নিগ্ধজলেস্নান না করিয়েও অনায়াসে বা অতিসহজেই উচ্চারণ করা যায়। কিন্তু তারপরও উচ্চারণে সহজসাধ্য এই শব্দ দু’টির সঙ্গেও বাঙালির বাকযন্ত্রের বিশাই (বিশ^কর্মা) অকারণ ষড়যন্ত্র করতে কসুর করে নি, শব্দদু’টির গায়েগতরে বাঙালিয়ানার রঙ এবং ঢঙ দুটিই লেপটে দিয়েছে। মোটকথা প্রবসিত শব্দের জাতবদল হয়ে বজ্জাত হয়ে উঠা চাই। যেমন বাংলা অবতারকে ইংরেজরা করে নিয়েছে অ্যাভাটার, ফারসিতে সংস্কৃত সিন্ধুকে করে নেওয়া হয়েছে হিন্দু।
এই রচনার পরিপ্রেক্ষিতে শব্দরূপান্তর সম্পর্কিত উপর্যুক্ত বয়ার্ণনা (বয়ান+বর্ণনা) উপস্থাপনের একটি আবশ্যকতা আছে, অন্তত লেখকের পক্ষ থেকে। লেখক মনে করেন, তিনি পাঠকসমক্ষে যে—বিষয়টি উপস্থাপিত করতে চান, সে—নির্দিষ্ট বিষয়টিকেযৎকিঞ্চিৎ সহজে বুঝে নেওয়ার জন্য এই শব্দরূপান্তর সম্পর্কিত উপর্যুক্ত বয়ার্ণনাটি একটি আবশ্যিক অবতারণা এবং এই প্রচেষ্টাটি আলোচিতব্য বিষয়টিকে সহজে বোধগম্য করে তোলতে পাঠকের বরাবরে কীছুটা হলেও অবদান রাখবে। একদিক থেকেবিষয়টি আমাদের ভাষাসাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বরাবরের মতো চলমান বহুচর্চিত নামবিকৃতির প্রকরণ সক্রান্ত, আগেও ছিল এখনও বহাল আছে। এবংবিধ লোকনিরুক্তির বিবেচনায় বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠার যোগ্যতা রাখে না, যদি না তাতে কোনও ব্যতিক্রম সূচিত হয়। আর কথা হলো ব্যতিক্রম সূচিত হয়েছে, আর তেকারণে এই আলোচনার সূত্রপাত একেবারে অকারণ ও নিরর্থক কীছু নয়, আর বোধ করি কীছুটা হলেও তাৎপর্যবহও বটে। ধরুন আপনার নাম মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী। এখন কেউ একজন নিজস্ব মুন্সিয়ানা খাটিয়ে আপনার নামটি যদি করে দেন মহামমেড আবডেল গাইযুম চোডারি। আপনি কি মনে নেবেন ? আর আপনার পরিচিত লোকেরা কি আপনাকে এই নামে শনাক্ত করতে পারবেন ? আপনার এবং সামন্য কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন যে—কারও মতে সেটা একটা অসম্ভব ব্যাপার। নির্বাচন কমিশন তো নামের ক্ষেত্রে একটি আকার, একার কিংবা বর্ণান্তে হল্—এর বেশকম কিংবা এদিক ওদিক নড়চড় হলে কীছুতেই মেনে নেবে না এবং এটা সুনিশ্চিত যে, কম্পিউটার আপনাকে শনাক্ত করতে পারবে না। অর্থাৎ যে—কোনও নামের ক্ষেত্রে যৎকিঞ্চিৎ রূপান্তর কোনও যুক্তিতেই সঙ্গত নয় এবং কীছুতেই মেনে নেওয়া যায় না।
হাওরের নামবিকৃতির ঘটনা ঘটেছে। গণমাধ্যমে তার বয়ার্ণনা উঠে এসেছে। আমরা পড়েছি। গত সোমবারের (১৮ সেপ্টম্বর ২০২৩) দৈনিক সুনামকণ্ঠের একটি সংবাদশিরোনাম ছিল, ‘এবার হাওরের নাম বিকৃত করে পাউবো’র সাইনবোর্ড’। সংবাদবিবরণীতে লেখা হয়েছে,“সম্প্রতি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের সুনামগঞ্জ অফিসের উদ্যোগে এই হাওরপাড়ের বিভিন্ন স্থানে ‘ডেকার হাওর’ নাম উল্লেখ করে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। বিষয়টি নজরে পড়ায় হাওরপাড়ের বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। হাওরের নাম বিকৃত করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ।
“এর আগে, সম্প্রতি তাহিরপুর উপজেলার ‘বৌলাই নদী’র নাম বিকৃত করে ‘বাউলাই নদী’ লিখে তাহিরপুর থানার সামনে পানি উন্নয়ন বোর্ড সাইনবোর্ড টাঙায়। এছাড়াও তাহিরপুরে পাটলাই নদীর নাম বিকৃত করে ‘পাটনাই’ লিখে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড।
“এদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাইনবোর্ডে দেখার হাওরের নাম সঠিকভাবে লেখার দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে। গত রবিবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত আবেদন করেন ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল”।
গণমাধ্যমান্তরে এইরূপ প্রতিবেদন প্রকাশের পর নামবিকৃতির যথার্থতা প্রতিপন্ন হয়েছে এবং দেখার হাওর, বৌলাই ও পাটলাই নদীর পক্ষে নিজেদের নাম বিকৃতকরণের সঙ্গত অভিযোগ দায়ের করার অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে চিহ্নিত আসামি পাউবো। প্রশ্ন হলো পাউবো কি লোনিরুক্তিগ্রস্ত কোনও লোক (‘লোক’ শব্দটি এখানে লোকসংস্কৃতি, লোকনিরুক্তি কিংবা লোকশ্রম্নতি শব্দে যে—অর্থে ব্যবহৃত হয়, সে—অর্থের দ্যোতক) বিশেষ যে, সে আব্দুলকে আব্দুল্যা, শুক্রবার কিংবা বৃহষ্পতিবারকে যথাক্রমে শুক্কুরবার ও বিস্যুদবার, অথবা বিশ^কর্মাকে বিশাই বলে পার পেয়ে যাবে ? তা তো নয়। পাউবো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান. তার পক্ষে তো পর পর তিন তিনটি প্রাকৃতিক ব্যক্তিত্বের (অতিসাম্প্রতিক কালে সাগর, নদী, খাল, হাওর, বিল, বন, পাহাড় ইত্যাদি স্বতন্ত্র নামে বিখ্যাত সব প্রাকৃতিক অস্তিত্বকে মানবিক মর্যাদায় সমুন্নত করা হয়েছে এবং এখন তাঁদের স্বাতন্ত্রিক অস্তিত্ব আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত।) নাম বিকৃতকরণের কোনও অধিকার নেই। পাউবো কি বাংলাদেশের মানচিত্রে নির্দেশিত সুনামগঞ্জ জেলার পরিসীমার কোথাও ডেকার হাওর, বাউলাই, পাটনাই নামক কোনও স্থানের অস্তিত্ব বাস্তবে নির্দেশ করতে পারবে ? জানি পারবে না। ভুলে গেলে চলবে না ডেকার হাওর, বাউলাই, পাটনাই ইত্যাদি প্রাকৃতিক ব্যক্তিত্ব হাওয়াভবনের মতো কোনও আবাসিক স্থাপনা নয় যে,সেটাকে রাজনীতিক রসিকতার উপলক্ষ্য করে তোলে যেমন খাওয়াভবন করে দিলেই রাজনীতিক আত্মশ্লাঘা চরিতার্থের লেঠা চুকে যায় এবং বিরোধিতার পরাকাষ্ঠা প্রকটিত হয়ে শত্রুতা করা ষোল আনার উপরে আঠারো আনা সুসম্পন্ন হয়। এখানে উল্লেখিত প্রাকৃতিক ব্যক্তিত্ব সমূহের বিরুদ্ধে পাউবোর শত্রুতার কীছু আছে কি ? বোধ করি নেই। আহলে নামবিকৃতির (হাওয়াভবনকে খাওয়াভবন করে দেওয়ার মতো) কারণ কী? নিশ্চিত করে কীছু বলা যায় না, তবে অনুমান করা যেতে পারে মাত্র।
প্রতিবেদনের সূত্র ধরে আমরা জনাব অলিউর রহমানকে এবং সেই সঙ্গে এলাকাবাসীকেও বলছি, আপনারা যতই আবেদন—নিবেদন করুন না কেনও কীচ্ছুটি হবে না। প্রতিকার নৈবচ। আপনারা ভুলে যাবেন না যে, ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’। আর প্রবাদ তো বলেই দিয়েছে, ‘কয়লা ধুইলে ময়লা যায় না, স্বভাব যায় না মইলে’। সুতরাং পাউবো এসব তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেই। জানবেন আপনার নাম আব্দুল হলে পাউবো আব্দুল্যা (লোকনিরুক্তির মতো) না করে দিলেও অ্যাবডুল (বাংলাকে ইংজেদের মতো প্রতিবর্ণীকৃত করে। যেমন ঠাকুরকে ঠেগোর, বাংলাকে বেঙ্গল, ঢাকাকে ড্যাক্ক্যা, শাল্লাকে শুল্লা, দিরাইকে ডেরাই, দেখার হাওরকে ডেকার হাওর করে ফেলা) করার অধিকার রাখে। এই জন্যে রাখে যে, পাউবো একটি ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতাগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান এবং প্রকারান্তরে বিউনিবেশায়নবিরোধী। এই জন্য এই প্রতিষ্ঠানটি তার কাজ শুরু করে গুরু মেকলের ঔপনিবেশিকতাবিস্তারের সা¤্রাজ্যবাদী নীতিকে নিঃশঙ্কচিত্তে মান্যতা দিয়ে। সুতরাং দেখার হাওর তার কাছে ডেকার হাওরই বটে, কারণ ইংরেজ মেকলের বাকযন্ত্র বাংলা ‘দেখা’ শব্দটিকে ‘ডেকা’ উচ্চারণ করে। এইভাবে উপনিবেশিত চিত্তসংস্কৃতি, রাজনীতি, মতাদর্শাদিকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। এই অপরগতার পাকে পড়ে ‘পাউবো’র ‘পা’—এর আকার খসে পড়ে ‘পউবো’ হয়ে পড়ে এবং দুর্মুখ বাঙালির রসিকতায় ‘পউবো’র অর্থ হয়ে যায় ‘পকেট উন্নয়নে বোর্ড’। অপরদিকে পাউবোর সামগ্রিক কর্মকাণ্ড এমন যে, সে—কর্মকাণ্ড দেখে কেউ কেউ বলেন, হাওরের পানি সে কখনও নিয়ন্ত্রণ করে না বরং উন্নয়ন করে এবং এই পানিকে উন্নয়ন করার (প্রশ্ন থাকে যে, পানির উন্নয়ন কী বস্তু ? আসলে পানির উন্নয়ন বলে কি কোনও কীছু বাস্তবে সত্যি আছে ?) নামে আমজনতার পকেট কেটে নিজের পকেট উন্নয়নে অর্থাৎ স্ফীতকরণে ব্যস্ত থাকে। এমনকি কারও কারও বিবেচনায় এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিনিয়তই ঔপনিবেশিকতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে এবং ঘুরপাক খেতে খেতে অনিবার্যভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার হারিয়ে ফেলে জনসৃজনশীলতার বিরোধী ভাবাপন্ন হয়ে পড়েছে। জনসৃজনশীলতার বিরোধিতা থেকে উৎসারিত জনবিচ্ছিন্নতার ব্যাধি তাকে প্রকারান্তরে জনগণের প্রভুত্বের আসনে বসিয়ে দিয়েছে আর সেইসঙ্গে নিজের পকেটের স্বাস্থ্য বৃদ্ধির বাইরে অন্য কোনও উন্নয়নের চিহ্ন প্রত্যক্ষ করতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে । প্রতিষ্ঠানটির জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত তার সকল কর্মকাণ্ডের ঠিকুজি নিলে একটা বিষয়ই প্রতিপন্ন হয় যে, সে কখনই পানি নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয় নি এবং পানি উন্নয়ন বলতে কী বোঝায় জনগণকে তার যথার্থ সংজ্ঞাও সমঝে দিতে পারে নি। এর নিহিতার্থ একটাই, জনগণ আসলে সর্বদিক থেকে ব্যর্থ একটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিপালন করছে। আবারও বলি এইভাবে এই প্রতিষ্ঠানটি পানি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন না করে পানির উন্নয়নের দায়িত্ব নয় বরং উন্নয়নের অজুহাতে কাজ করে এবং পানি নিয়ন্ত্রণ হয় না, নদীভাঙন অব্যাহত থাকে, ফসলডুবি রোধ হয় না, বন্যার দুর্ভোগ—ক্ষতি থেকে মানুষ রক্ষা পায় না।
আসল বিষয় হলো, পাউবোর প্রতিটি কর্মকর্তা প্রকৃতপ্রস্তাবেই ‘মেকলেচেলা’, যে মেকলের পুরোনাম টমাস বেবিংটন মেকলে (১৮০০Ñ১৮৫৯)। তিনি উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের চতুর্থ দশকে ভারতবাসীকে ইংরেজিতে শিক্ষাগ্রহণের সরকারি নীতি কার্যকর করার প্রস্তাবনা করে বলেছিলেন যে, ভারতবাসীকে মনে—মগজে ইংরেজ হতে হবে। অর্থাৎ তারা খালে—চামড়ায় যতই ভারতীয় হোক তারা চিন্তা করবে ইংরেজিতে, ভারতের প্রতি ইঞ্চি মাটিতে কাজ করবে ইংরেজদের মতো, ভারতকে শাসন করবে ইংরেজদের হয়ে ইংরেজদের স্বার্থরক্ষার্থে, ভারতের সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার করার স্বার্থে। পাউবোর শিক্ষিতরা এই মেকলের যোগ্য সন্তান। তারা এখনও তাদের নমস্য গুরু ইংরেজ মেকলের ভাবাদর্শকে সম্মান করে চলেন, চিন্তা করেন ইংরেজিতে তারপর অনুবাদ করেন বাংলায়। তাই দেখার হাওর, বৌলাই ও পাটলাই হয়ে পড়ে যথাক্রমে ডেকার হাওর, বাউলাই, পাটনাই এবং এতো দিন পরে, সে্ই ১৮৩৮—এর পরে থেকে এখনও পর্যন্ত সময়ের দীর্ঘ ব্যবধানেও বাবা মেকলের পরম্পরা তাঁরা বজায় রেখেছেন পরম শ্রদ্ধায়। একেই বলে বাপকা বেটা সেপাইকা ঘোড়া। লোকনিরুক্তিতে অন্যরকম দ্যোতনার স্ফূরণÑ ‘স্বভাব যায় না মইলে’। তারা স্বভাব ছাড়ে নি। সুতরাং আপনার নাম যদি মুহাম্মদ হয় তবে পাউবো যদি লিখে দেয় ‘মহামমেড’ সেটাই সই, আপনাকে মেনে নিতেই হবে কিংবা আপনার নাম হতে পারে দিদারে আলম, সেক্ষেত্রে পাউবো ডিডারে অ্যালাম লিখে দেবার অধিকার রাখে। বাংলাদেশের মেকলেতান্ত্রিক আমলাতন্ত্রের পক্ষে এসব কীচ্ছু না, ডালভাত মাত্র। এর প্রতিকার কী হতে পারে, তার উত্তর আমাদের কাছে আছে কিন্তু তা ছাপার অযোগ্য বলে বলছি না। আপনারা কল্পনা করে নিন।এবং যা ছাপার যোগ্য তা হলো এই যে, বিউপনিবেশায়ন বলে একটি সমাজবাস্তবতা আছে। বলা হচ্ছে, “বিউপনিবেশায়ন হচ্ছেÑ যাকে বলছি উপনিবেশকালে বা উপনিবেশ—উত্তর সময়ে উপনিবেশিত চিত্তসংস্কৃতি, রাজনীতি, মতাদর্শ ইত্যাদি প্রত্যাখ্যান করা। এবং এসবের বিকল্প সন্ধান করা বা নিজের স্বকীয়তার বয়ানকে উচ্চকিত করা।” বেগম আখতার কামাল/ বিউপনিবেশায়ন ও রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে/ চিহ্ন, সংখ্যা ২১, ফেব্রুয়ারি ২০২১, পৃষ্ঠা : ২৩)। পাউবো যখন ‘দেখা’কে ‘ডেকা’ ও ‘করচ’কে ‘করস’ করে নেয় তখন ‘উপনিবেশিত চিত্তসংস্কৃতি, রাজনীতি, মতাদর্শ ইত্যাদি প্রত্যাখ্যান’ করতে পারে না। এই অপারগতা প্রকৃতপ্রস্তাবে তার ঔপনিবেশিকতার দাসত্বকেই প্রতিপন্ন করে এবং পরিণতিতে ‘দেখা’কে ‘ডেকা’, ‘করচ’ (বৃক্ষ বিশেষ)—কে ‘করস’ করে নিতে কসুর করে না, উপনিবেশিত চিত্তসংস্কৃতির পঙ্কে নাক পর্যন্ত ডুবিয়ে রেখে মাতৃভাষার মহিমাকে বর্জন করে নিশ্চিন্তে। আর ঔপনিবেশিকতার দাসত্বকে মানসতায় জিইয়ে রেখে স্বাধীন কোনও দেশে স্বাধীন মানুষের জীবনোন্নয়নকে সার্থকতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত করা যায় না, ব্যর্থ হতেই হয়। বিপরীতে এই ব্যর্থতা আত্মস্বার্থ চরিতার্থকরণের পথকে নিষ্কণ্ঠক ও প্রশস্ত করতেই কেবল পারে। সুতরাং ‘পাউবো’ (পানি উন্নয়ন বোর্ড) আসলে ‘প’য়ে আকার (া) বর্জিত ‘পউবো’ই (পকেট উন্নয়ন বোর্ড) বটে, অন্য কীছু নয়।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।
বর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন