প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০৪:৪৯
সেই এক সময় গেছে যখন পাড়াগাঁয় এক—একটি টেপ—রেকর্ডারকেঘিরে দেখা যেত নানাবয়সি মানুষের জটলা : সবাই মগ্ন হয়ে শুনছেন আজ কটু মিয়া তো কাল বিনন্দ,পরশু আপন দুলাল; কোনোদিন জারি, অন্যদিন মৈয়দ শাহনূর কি রাধারমণের গান,Ñএমনই এক সময়ে আমাদের শফিকুন্নুর—আবিষ্কার। আজ যে একসঙ্গে তাঁর কিছু গান সামনে নিয়ে বসেছি, তখন তা ছিল না, তখন আমাদের কাছে গীতিকার নয়, গায়ক শফিকুন্নুরই ছিলেন প্রধান। কীভাবে ভোলা যাবে সৈয়দ শাহনূরের ‘কান্দে, কান্দেনূরে ইমানের লাগিয়া’ গানটি শুনতে—শুনতে কান্নারত বৃদ্ধ—বৃদ্ধাদের? তাঁরসমকালের ক্বারী আমীর উদ্দীন বা পরবর্তীকালের রনেশ ঠাকুরের মতোই সুরেলা কণ্ঠ ছিল তাঁর, কিন্তুঅকৃত্রিম দরদ আর বিল—হাওরের হাওয়াল কম্পন তাঁর কণ্ঠেএমনইএক বাড়তি মাদকতা এনে দিত যে, এই অননুকরণীয় গায়কি তাঁর কবিসত্তাকে পর্যন্তআচ্ছন্নকরে ফেলেছিল।
শফিকুন্নুর মন দিয়ে গাইতেন এ—অঞ্চলের শাহনূর, হাছন, রাধারমণ, আরকুম শাহ, ফকির ইয়াছিন শাহসহ বহু খ্যাতকীর্তি মহাজনের গান। নিজের গান সাধারণত আড়ালেই রাখতেন, কদাচিৎ গাইতেন, ফলে তাঁর বই ‘সুজন বন্ধু’ বের হওয়ার পর আমাদের মতো অনেকেই হয়ত এর গানগুলো পড়ে সবিশেষআকৃষ্ট হয়েছেন এবং তাঁকে নতুনভাবে চিহ্নিত করতে পারছেন।
আজবহু গান একসঙ্গে হাতে পেয়েপ্রথমেই খঁুজে বের করেছি সেই পরিচিত গানগুলোই : ‘কোকিলা তুই ডাকিস না আর ডালে’, ‘চাঙ্গে কিতায় লড়ে’,‘বন্ধে মোরে দিয়া গেল ফাঁকি’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
যতদূর মনে পড়ে ‘কোকিলা তুই ডাকিস না আর না ডালে’ গানটি জনপ্রিয় হয় গতশতকের আশির দশকে শুরুতে। জনপ্রিয় হলে যা হয়, বর্ষাকালে কোনো—কোনোদিন আগগলুইয়ে টেপ—রেকর্ডারটি শুইয়ে রেখে সেই গানটি ছেড়ে দিয়েক—জন যাত্রী নিয়ে নানাসময়ে বিল—হাওরের দিকে চলে যেত কোনোপাতামি নাও, আর বড়ো বড়ো পাথর—বসানো সড়কে দাঁড়িয়ে সেদিকে কাঙালের মতো তাকিয়ে থাকত বালক—কিশোরেরা। আবার হেমন্তকালে সেই রেকর্ডারটিই শোভা পেত বাজারমুখো কোনো বাউটা যুবকের হাতে, সামনে হাঁটতে থাকত ইয়ারদোস্তসহ সৌদি কি কুয়েতফেরত কোনো প্রবাসী। এখন লক্ষ করতেপারছি, গানটি সেসময়েজনপ্রিয় হয়েছে ঠিকই কিন্তু তার বাণীতে সে—অর্থে কোনো নতুনত্ব নেই, শুধু সুরটাই ছিল প্রাণকাড়া, বাণীতে সেই আদিকালেরই লোকগানেরই বিষয় এবং যার সার্থক রূপ অন্যভাবে আমরা মেঘদূতসহ অন্যান্য কাব্যেও পাই : ‘কইও কইও ওরে কোকিল/প্রাণবন্ধুরে পাইলে/শফিকুন্নুর ভাসে সদায়/দুই নয়নের জলে’। বরং এখন, আমার কাছে তাঁরই—লেখা সমভাবের আরেকটি গান, ততটা জনপ্রিয় না—হলেও, গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। সেখানে দূতকে নিজের বিচ্ছেদের সঙ্গে একাত্ম করার কৌশলটি অভিনবইলাগছে :
‘আমার বন্ধু দেখতে কোকিল
তোমার মতো কালো
সে যে আমার হৃদয়ের ধন
আঁধারেরই আলো।’
এখানে কোকিল তার গায়ের রঙ বিরহীর বন্ধুর গায়ের মতোই দেখে, যাতে দু—জনের প্রতিই আকৃষ্ট ও সমব্যথী হয়, আর সে—কারণেই এই তথ্য পরিবেশন। কোকিলকে কেন্দ্র করে আরও গান আছে শফিকুন্নূরের, কোকিল এখানে বসন্তেরদূত নয় শুধু, বিরহের বার্তাবহও। এই বিরহের বার্তা নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গানে, এবং এই গানগুলোর অধিকাংশই বৃন্দাবনের রাধার, তত্ত্বগতভাবে বললে, রাধাভাবের গান। কৃষ্ণ বৃন্দাবন ছেড়ে চলে যাওয়ার পর রাধার যে—কলঙ্কময় অবস্থা, তার বর্ণনা বাউলগানে খুবই সুলভ, শফিকুন্নূরের অনেক গানেও তা দেখা যায়।
তবে কোনো—কোনো গানে রয়েছে ভিন্ন বার্তাও।এ—প্রসঙ্গে আরেকটি গানের উল্লেখ করা যেতে পারে, যেটি শুরু হয়েছে প্রচলিতভাবে, কিন্তু ভণিতাপদে পৌঁছে লক্ষ করি, বন্ধু চলে গেছে বলে নয়, চলে—যাওয়ার পর প্রত্যাগমন আশা করেই বলছে বন্ধুর দেখা না—পেলে প্রতিবেশীরা তাকে মন্দ বলবে :
‘শফিকুন্নুর তোমার লাগি রে বন্ধু
হইলাম কুলবিনাশী
তোমার দেখা না পাইলে রে বন্ধু
মন্দ বলবে প্রতিবেশী রে \’
আরেকটি গানে আছেএকটি প্রচলিত লোক—আচার/সংষ্কার—এর প্রসঙ্গ, যেটি আক্ষরিক অর্থেই মারাত্মক, যাকে বলে ‘বাণ মারা’। গানে বলা হচ্ছে সে বন্ধু যেন তার মনের কোঠায় বাণ না—মারে, কারণ সেই জায়গাটাই তার অর্থাৎ বন্ধুরকাক্সিক্ষত অবস্থানের জায়গা :
‘প্রাণের বন্ধু রে,
আমার মনের কোঠায় বাণ মারিও না
যে কোঠাতে তোমার নামটি
রাখিলে পাই সান্ত্বনা।’
গানে প্রথম অন্তরায় রয়েছে পুরো হৃদয়/মন জুড়ে বন্ধুর অবস্থান, তাই দেহ এখানে দুঃখ—যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে, অথবা ঊর্ধ্বে নাও যদি হয়, তবু আঘাত এলে তাতে আপত্তি কিছু নেই, আপত্তি হলো মনের উপর আঘাত করায়। কারণ এই বাণ অর্থ আক্ষরিক তির শুধু নয়, তাতে মেশানো রয়েছে মনবিনাশী কুমন্ত্রের নানা রঙও :
‘দিবনিশি অবহেলা
করে যে মোরে
তবু কেন থেকে যায়
সে হৃদয় জুড়ে
আমার দেহের উপর আঘাত দিও
শুধু মনে ব্যথা দিও না \’
বিচ্ছেদী গানগুলোর বাইরে ভক্তি, মনঃশিক্ষা, মুর্শিদি ও দেহতত্ত্ব—এর গানগুলোর পাশাপাশি বেশ কিছু তাৎপর্যময় আঞ্চলিক গান লিখেছেন শফিকুন্নূর।
পাখির প্রতীকে বাগাডাইয়া পাখিকে স্থাপন করে একটি আঞ্চলিক গান বেঁধেছেন শফিকুন্নূর। গানটি শিকারিদের যেমন স্মৃতিকাতর করবে তেমনি কবির লক্ষ্যও পূরণ হবে : ‘বাগডুল পাতাইয়া থইলাম বাগানে/লাগছে নারে বাগাডাইয়া লাগবনে।’বাগাডাইয়া পাখিটি গাছের আগডালে বাসা বেঁধেছে, সুযোগমতো তাকে ধরবার জন্য গাছতলায় এই ফাঁদ পেতে রাখা; একসময় খাবার খেতে এসে ধরা পড়বে এর জন্যই অপেক্ষা : ‘শফিকুন্নূর পাখির আশায়/লুকাইয়া রইল গাছের তলায়।/পাখিটি ধরার আশায়/বসে রইলাম সন্ধানে।’তাঁর‘ছুচি মুইখ্যা উনরা মুইখ্যা’ গানটিতেও রয়েছে ‘বউ’—এর প্রতীকে সেই অচেনা পরমপাখির কথা, যার আসা—যাওয়ার রহস্যবিষয়ে কোনোভাবেই মীমাংসায় পেঁৗছনো যাচ্ছে না। এ—গানের কিছু কথা লোকমুখে আগে থেকেই প্রচলিত ছিল মনে হয়, এর সঙ্গে নিজের কথা মিলিয়েই হয়ত গানটি লিখিত।গানের ধুয়াপদে বউ নাইয়র চলে যাওয়ার কারণে যথার্থ ভাষায় স্বামীর ক্ষোভ প্রকাশিত :
‘ছুচি মুইখ্যা উনরা মুইখ্যা
হিয়াল চইখ্যা টলা নাইখ্যা
আত্তি খাইন্যা, বজ্র ভাঙা খাগাশ্বর
কার কথায় গেলে তুই নাইয়র।
যার ছল্লায় গেলে নাইয়র
তারে লাইয়া থাক
আমি যাইমু সিলেট শহর
পাও ধরিয়া রাখ লো \’
নাইয়র চলে যাওয়ায় যা যা হয়েছে তার বর্ণনা দেওয়ার পরে ভণিতাপদে পেঁৗছে স্বর বদলে গেছে[অনু]রাগী স্বামীর : ‘তুই তো আমার আদরের ধন/জাইনা লও অন্তর/শফিকুন্নুর তোর লাগিয়া/হইবে দেশান্তর লো\’ শুরু ও শেষের এই স্বর—পরিবর্তন স্বামী—স্ত্রীর প্রতীক/চরিত্র—এ উপস্থাপিত হয়েছে বলে স্বাভাবিক আর আশিক—মাশুকের কাছে তা—ই তো যথার্থ। দূরত্ব সত্ত্বেও পূর্বপাঠ/স্মরণ—অভিজ্ঞতার সূত্রে নাইয়র যাওয়া—আসা বিষয়ে পাঠকের যদি শাহ আবদুল করিমের [নারী—পুরুষের]সংলাপধমীর্গানটির কথা মনে পড়ে যায়, তাহলেও দুজনের স্বাতন্ত্রে্যর বিষয়টি সহজেই ধরা পড়বে। করিমের গানে রয়েছে :
‘পুরুষ : খালি বাড়ি থইয়া নাইয়র যাইতে দিব না।
নারী: তুমি ইতা কিতা কও, আমি কিছু বুঝি না
আষাঢ় মাসে নাইয়র যাইতে কে করে মানা \
...
পুরুষ : নাইয়র যদি যাইতে চাও কুনদিন আইবায় কইয়া যাও
নারী : আনতে যদি তুমি না যাও আমি ইবার আইতাম না
আষাঢ় মাসে নাইয়র যাইতে কে করে মানা \’
এই প্রতীক—অনুষ্ঙ্গ নিয়ে আরেকটি দেহতাত্ত্বিক গান লিখেছেন শফিকুন্নূর যেখানে দারুণ শীতে ছেঁড়া কাঁথায় ঘুম আসছে না স্বামীর, তার উপর ছারপোকার কামড়, এই অবস্থায় ছয় ডাকাত এসে ঘরের মাল—বেসাতও চুরি করল; স্বামী ভাবছে ‘এখন উপায় কী?’ মাল—বেসাত না হয় চলেই গেল, কাঁথা সেলাই না—করতে পারলে তো দারুণ শীতে জান বাঁচানোই দায়, অথচ বউ কি না গোস্যা করে বাপের বাড়ি চলে গেল!Ñএই ঘোর সংকটে স্বামী বলছে : ‘মনা রে ভাই/শফিকুন্নূর সব হারাইয়া/চিন্তায় গেছে পড়ি/ঘরের গিরতাইন ঘরে আইলে/দিতো খেতা সিলাই করি।’ এই দেহতত্ত্বটি যেকোনো শ্রোতার কাছেলক্ষ্যভেদী মনে হওয়ার কথা।
আঞ্চলিক গানের ক্ষেত্রে শফিকুনূœরের এমনসাফল্যে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিছুটা ভূমিকা রেখেছে বলে মনে হয়। বাউল—গান রচনায় শিক্ষিতজনের মুরোদ—বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের নঞর্থ মন্তব্য সত্ত্বেও এ—কথা বলবার কারণ, গান রচনায় এ—প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই শফিকুন্নূরের একমাত্র পুঁজি ছিল না। যিনি ছোটোবেলায় মায়ের কাছ থেকে মুখে গান তুলেছেন, গ্রামোফোন রেকর্ডে হাসনরাজার গান ‘মাটির পিঞ্জিরার মাঝে’,‘আমি না লইলাম আল্লাজির নাম রে’ ও অন্যান্য গান গেয়ে রসিক—হৃদয়ে চিরকালের জন্য স্থান করে নিয়েছেন, যার [গুরুত্বপূর্ণ মহাজনদের গান—সংবলিত] চল্লিশটি অডিও ক্যাসেট দুর্মূল্যের বাজারে বেরিয়েছে, যার সংগৃহীত/রচিত ও লোকগাথার সংখ্যার সংখ্যা ছিল বিশ এবং সর্বোপরি যিনি শতাধিক গান লিখে আমাদের আকৃষ্ট করেছেনÑতাঁর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খানিক সহায় হয়েছেই বলে ধারণা করি। এই সূত্রে,তাঁর একটি আঞ্চলিক গানের উল্লেখ করতে চাই যেখানে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতীকে কত অবলীলায় তুলে এনেছেন সমকালীন বাস্তবতার চিত্র :
‘বলদে লাঙ্গল টানে না
ঘোড়ায় কয় জোয়াল দেও আমার কান্দে
আনন্দে আমি আল জুড়লাম
পুবের বন্দে \
এই জমানার ভাব দেখিয়া
শফিকুন্নূরের লাগছে ভয়
ভেড়ার পিঠে গাধার বোঝা
তার কি প্রাণে সহ্য হয়
পরের বোঝা যার কাছে রয়
মাথায় হাত দিয়া কান্দে \’
পুরো গানটি শুনলে এ—কথা বুঝতে অসুবিধে হয় না যেএ হলো রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্র। সচেতন পাঠকের মনে পড়তে পারে শামসুর রাহমানের ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’ কবিতার কথা, কিছুটা দূরবর্তী হলেও মনে পড়তে পারে জীবনানন্দ দাশের ‘অদ্ভুত আঁধার এক’ কবিতার কথাও। বাউলকবিদের গানে সমকালের বাস্তবতা সাধারণত পরিচিত প্রতীক—অনুষঙ্গের মাধ্যমেইউঠে আসে এবং তাতে যাপন—অভিজ্ঞতার পরিচয় থাকে বলেঅধিকাংশ সময়েই তা লক্ষ্যভেদী বৈশিষ্ট্যে উপস্থাপিত হয়। এই গানটি শফিকুন্নুর কোন সময় লিখেছেন তার দিনক্ষণ জানা না গেলেও বাংলাদেশের নানা সময়ের বাস্তবতায় এ গানের প্রাসঙ্গিকতা কারও পক্ষেই অস্বীকার করা সম্ভব নয়।
১৯৪৩ সালে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলায় জন্মগ্রহণকারী শফিকুন্নূর তাঁর ৫৩ বছরের জীবনে অধ্যাত্মতাত্ত্বিক গানগুলোর পাশাপাশি কিছু দেশাত্মবোধক গানও লিখেছেন, কিন্তু এই গীতিকারের অল্প গানই এখন শিল্পীদের কণ্ঠে শোনা যায়। অথচ ১৫০টি গান নিয়ে সুজন বন্ধু নামে একটি গীতিসংকলন বেরিয়েছে ২০০৫ সালে। বইয়ে লোকগবেষক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ ও সাংবাদিক আল—আাজাদের কবি—পরিচয়ধর্মী ছোটো দুটি লেখাও রয়েছে। আমরা এই বই থেকে এ—আলোচনায় উদ্ধৃত কয়েকটি গানের পূর্ণাঙ্গ রূপউপস্থাপন করছি।
শফিকুন্নূরের গান
১
প্রাণের বন্ধু রে,
আমার মনের কোঠায় বাণ মারিও না
যে কোঠাতে তোমার নামটি
রাখিলে পাই সান্ত্বনা \
দিবিনিশি অবহেলা
করে যে মোরে
তবু কেন থেকে যায়
সে হৃদয় জুড়ে
আমার দেহের উপর আঘাত দিও
শুধু মনে ব্যথা দিও না \
যার লাগিয়া গোলাপজলে
অঙ্গ ধুইয়েছি
যার লাগিয়া এলোচুলে
খোঁপা বেঁধেছি।
তবুও নিষ্ঠুর পাষাণের
মনেতে ভাব জাগে না \
পাশে গেলে রাখে দূরে
কাছে টানে না
তবু তাহার আকার কিরণ
ভুলতে পারি না
শফিকুন্নূরের এই প্রার্থনা
নির্দয় তুমি হইও না \
২
কী শুনাইলায় রে ও কোকিলা
ডাক শুনিয়া অভাগীর প্রাণ
উঠে চমকিয়া \
আমার বন্ধু দেখতে কোকিল
তোমার মতো কালো
সে যে আমার হৃদয়ের ধন
আঁধারেরই আলো
ফাঁকি দিয়া কই লুকাইল
আমায় পাশরিয়া \
নিশি তো পুহাইয়া গেল
বন্ধু আইল না
যার লাগিয়া দিবানিশি
করি ভাবনা
একবার এসে দাও সান্ত্বনা
বন্ধুর খবর পাইয়া \
কইও কইও ওরে কোকিল
দেখা পাইলে তার
সে বিহনে মুই অভাগীর
সবই অন্ধকার
শফিকুন্নুর মনের দুয়ার
রাইখাছি খুলিয়া \
৩
আমি বন্ধুর লাগি
হইলাম দোষের দোষী
লোকসমাজে হইলাম পাগল রে বন্ধু
তোমায় ভালবাসি রে \
মান কুল মান সবই দিলাম রে বন্ধু
হইলাম সর্বত্যাগী
তোমার নামের মালা লইয়া বন্ধু
কাঁদি দিবানিশি \
আমার আপন বলতে এ জগতে রে বন্ধু
আর কারে না দেখি
তুমি যদি ভিন্ন বাসো রে বন্ধু
আমি গলে দিব ফাঁাসি রে \
শফিকুন্নুর তোমার লাগিরে বন্ধু
হইলাম কুলবিনাশী \
৪
কোকিলা তুই ডাকিস না আর ডালে
ডাক শুনিয়া অভাগিনীর
হৃদে আগুন জ¦লে রে \
সারারাত কাটাইয়া
প্রভাতে কী বা সুর শুনাইলে,
কুহু কুহু কুহু সুরে
আমারে মারিলে রে \
পাইতাম যদি প্রাণবন্ধুরে
আমি টেনে লইতাম কোলে
পোড়াপ্রাণ জুড়াইতাম আমার
ধরে বন্ধুর গলে রে \
কইও কইও ওরে কোকিল
প্রাণবন্ধুরে পাইলে
শফিকুন্নূও ভাসে সদায়
দুই নয়নের জলে \
৫
বলদে লাঙ্গল টানে না
ঘোড়ায় কয় জোয়াল দেও আমার কান্দে
আনন্দে আমি আল জুড়লাম
পুবের বন্দে \
ঘি দুধের দর দেখিয়া
মেরা মেরি উলুন নামায়।
গিরছকে ডাকিয়া বলে
গাই কিনার দরকার নায়
আনন্দে গিরছ বেটায়
হাত দিল মেরির বান্ধে \
ছয় মেরি কিরাইয়া
দুধ পাইল এক ছটাক।
ফালাইয়া দুনা ভাঙ্গিল
গিরছ হইল অবাক।
মেরা মেরির এই তো স্বভাব
থাকে না রশির বান্ধে \
এই জমানার ভাব দেখিয়া
শফিকুন্নূরের লাগছে ভয়
ভেড়ার পিঠে গাধার বোঝা
তার কি প্রাণে সহ্য হয়
পরের বোঝা যার কাছে রয়
মাথায় হাত দিয়া কান্দে \
৬
বাগডুল পাতাইয়া থইলাম বাগানে
লাগছে না রে বাগাডাইয়া লাগবনে।
আসা যাওয়া করে পাখি
তারে না নয়নে দেখি
আমার চোখে দিয়া ফাঁকি
থাকে সে গোপনে \
পাখির বাসা আগডালেতে
ফাঁদ পাতাইলাম গাছতলাতে
যখন আসব আধার খাইতে
তুরকুল্লারে দেখবনে \
শফিকুন্নূর পাখির আশায়
লুকাইয়া রইল গাছের তলায়।
পাখিটি ধরার আশায়
বসে রইলাম সন্ধানে \
৭
দারুণ শীতের জ¦ালায় মরি
ফারা খেতার মঝেরে
উলশে করছে আড়ি।
হারারাইত উলশের কামড়ে
ঘুমাইতে না পারি \
মন রে
ছয় ডাকাইতে ছল্লা করি
ঘরখান করল চুরি।
মাল—বেসাত সবই নিল
উপায় কি আর করি \
মনা রে ভাই
গেছে যাউি¹ মাল—বেসাত
ভাবনা নাহি করি।
ঘরের বউটা গোসা করি
গেল বাপের বাড়ি \
মনা রে ভাই
শফিকুন্নূর সব হারাইয়া
চিন্তায় গেছে পড়ি
ঘরের গিরতাইন ঘরে আইলে
দিতো খেতা সিলাই করি \
বর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন