প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০৪:৫৭
হাওর বাওর ঘেরা সুনামগঞ্জ প্রকৃতির লীলা নিকেতন। সুনামগঞ্জ সবসময় আপন বৈশিষ্ট্যে আকৃষ্ট করেছে মানুষকে। এখানে জন্মেছেন অনেক গুণিজন কবি, সাধক, বাউল, শিল্পী, সাহিত্যিক যাদের খ্যাতি দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সৌরভ ছড়িয়েছে। সাংবাদিকতার জগতেও পিছিয়ে নেই সুনামগঞ্জ। অনেক খ্যাতিমান সাংবাদিকের জন্ম হয়েছে এখানে। অনেকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও খ্যাতি অর্জন করেছেন। আমার শৈশব আর কৈশোর কেটেছে সুনামগঞ্জ শহরে। এই শহরের আলো, বাতাস, প্রকৃতি, জল ও জোৎস্না আমার গায়েও লেগেছিল যা এখনো অস্তিত্বে অম্লান। তাই লেখালেখি আর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কিঞ্চিৎ বিচরণ করতে পেরেছিলাম। লেখালেখির হাতে খড়ি সুনামগঞ্জে স্কুল জীবনে শুরু হলেও আমার সাংবাদিকতার চর্চা পরিপক্ক হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে।
উচ্চ শিক্ষার ব্রত নিয়ে সুদূর সুনামগঞ্জ থেকে পাড়ি জমালাম উত্তরবঙ্গের বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে। সেই ১৯৭৯ সালের কথা, তখন এতো আধুনিকতা ছিল না। সুনামগঞ্জ থেকে মুড়ির টিন বাসে সিলেট এসে সন্ধ্যার ট্রেনে চড়ে সকালে ঢাকা নামতাম। তারপর কমলাপুর থেকে ফুলবাড়িয়া এসে আরিচার বাস ধরে আরিচা পেঁৗছে লঞ্চে যমুনা নদী পার হয়ে নগরবাড়ি এসে হুড়াহুড়ি করে রাজশাহীর বাসে চড়ে বসতাম। রাত ৯/১০টার সময় বাস বিনোদপুর এসে পেঁৗছালে বিনোদপুর ইউনিভার্সিটি গেটে নামতাম। তারপর এসএম হল। দুইদিনের পথযাত্রা। তখন নাইট কোচ ছিল না, বাস পারাপারের ফেরী ছিল না। জল ও জ্যোৎস্নার শহর সুনামগঞ্জ থেকে পদ্মা নদী বিধৌত আ¤্রকুঞ্জের শহর রাজশাহীতে সে একধরনের স্বেচ্ছা—নির্বাসন! এসএম হলের ২৩৩ নম্বর কক্ষে শুরু হলো আমার জীবনের আরেক অধ্যায়। সুনামগঞ্জের মহি ভাই (এখন লন্ডন প্রবাসী), মামুন ভাই আর আমানুল্লাহ ভাই (পরে রাকসু’র পত্রিকা সম্পাদক, এখন প্রয়াত) এদের আশ্রয়ে তাদের রুমে উপযাচক অতিথি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মতিহারের মায়াবী সবুজ চত্ত্বর আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠেবেঁধে রেখেছিল প্রায় ৮ বছর।
দেখতে দেখতে অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে, অনেককিছু বদলে গেছে। রাজনীতি, পরিবেশ, সমাজ ও সামাজিকতা বদলে গেছে, টেকনোলজি বদলে গেছে; শুধু বদলায়নি মন। সেই সময়ে সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতা এই দুটি শব্দ যাদুর মতো মোহাবিষ্ট করেছিল। অগ্রজদের কাছে বক্তৃতায়, প্রবন্ধে, শুনে, দেখে, পড়ে মনে হলোসত্যিই তো, এ এক মহান পেশা। তাই লেগে গেলাম আর লেগে রইলাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরোটা সময়, যার ফলশ্রম্নতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব। আর এসবের জন্য আমানুল্লাহ ভাই—এর অবদান অনস্বীকার্য।অনেক ক্ষেত্রে নৈতিকতার অবক্ষয় দেখে গণমাধ্যমে কাজ করার নেশাকে পরবতীর্তে পেশা হিসেবে নিতে পারিনি। তবে বিচ্ছুত হইনি।
আগে (১৯৮০—৮২) শুধু গুটি কয়েক সংবাদপত্র, রেডিও (বাংলাদেশ বেতার) আর বাংলাদেশ টেলিভিশনÑ এই ছিল গণমাধ্যম। সংবাদ পাঠানোর মাধ্যম ছিল চিঠি (পোস্ট), হাতে ঘুরানো টেলিফোন আর জরুরি প্রয়োজনে বেতার বার্তা (অধুনালুপ্ত টেলিগ্রাম)।১৯৯৭ সালে প্রথম বেসরকারি টিভি চ্যানেল ‘এটিএন’ বাংলা চালু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে দ্রুত পরিবর্তন হতে থাকে এবং এক প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হয়।
এখন অবারিত সুযোগ, মুহূর্তেই তথ্য পেঁৗছে দেওয়া যায় সংবাদপত্র, রেডিও আর টেলিভিশনে। গণমাধ্যম, সংবাদ মাধ্যম আর তথ্য আদান প্রদানে আধুনিক ডিজিটাল বিপ্লবের এযুগে সংবাদপত্র, রেডিও আর টেলিভিশনের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে সারাদেশে প্রকাশিত পত্র—পত্রিকার সংখ্যা ৩১৬৭(সেপ্টেম্বর/২০২২ পর্যন্ত) ।
বাংলাদেশ সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সূত্র অনুযায়ী দেশে এখন (২০২২ পর্যন্ত) সংবাদপত্রও অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম শিল্প কতো বড় বা কতোটা প্রসারিত তা দেখা যাকঃ
সংবাদপত্র
সারাদেশের নিবন্ধিত পত্র—পত্রিকার পরিসংখ্যান*
ক্রমিক পত্রিকার ধরণ ঢাকা মফস্বল মোট
১. দৈনিক পত্রিকা ৫০১ ৭৭৪ ১২৭৫
২. অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা — ৩ ৩
৩. সাপ্তাহিক পত্রিকা ৩৪০ ৮৫৫ ১১৯৫
৪. পাক্ষিক পত্রিকা ১৪৪ ৬৮ ২১২
৫. মাসিক পত্রিকা ২৮৬ ১৫০ ৪৩৬
৬. দ্বিমাসিক পত্রিকা ৫ ৪ ৯
৭. ত্রৈমাসিক পত্রিকা ১৯ ৩ ৩২
৮. চতুমার্সিক পত্রিকা — ১ ১
৯. ষান্মাসিক পত্রিকা ১ ১ ২
১০. বার্ষিক পত্রিকা ২ — ২
মোট ১২৯৮ ১৮৬৯ ৩১৬৭
*সূত্রঃ তথ্য অধিদফতর, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়।
সংখ্যগতভাবে যেসব জেলায় সর্বাধিক দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় (২০টির বেশি)ঃ
ক্রমিক জেলার নাম দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা অবস্থান
১. বরিশাল ৩৬ ১ম
২. ময়মনসিংহ ৩৫ ২য়
৩. কুষ্টিয়া ৩০ ৩য়
৪. সিলেট ৩০ ৪র্থ
৫. চট্টগ্রাম ২৬ ৫ম
৬. কক্সবাজার ২৬ ৬ষ্ঠ
৭. লক্ষ্মীপুর ২৪ ৭ম
৮. রাজশাহী ২৩ ৮ম
৯. পাবনা ২১ ৯ম
মোট ৯ ২৫১
সংখ্যগতভাবে যেসব জেলায় সর্বাধিক সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় (২০টির বেশি)ঃ
ক্রমিক জেলার নাম সাপ্তাহিক পত্রিকার সংখ্যা অবস্থান
১. কুমিল্লা ৫৯ ১ম
২. সিলেট ৫৬ ২য়
৩. পাবনা ৩৩ ৩য়
৪. সিলেট ৩০ ৪র্থ
৫. চট্টগ্রাম ২৬ ৫ম
৬. কক্সবাজার ২৬ ৬ষ্ঠ
৭. লক্ষ্মীপুর ২৪ ৭ম
৮. রাজশাহী ২৩ ৮ম
৯. পাবনা ২১ ৯ম
মোট ৯ ২৫১
ডিজিটাল বা অনলাইন মিডিয়া
ক্রমিক অনলাইন মিডিয়ার ধরন সংখ্যা অবস্থান
১. অনলাইন নিউজ পোর্টাল ১৬৬ ১ম
২. দৈনিক পত্রিকার অনলাইন পোর্টাল (জাতীয়) ১০৩ ২য়
৩. দৈনিক পত্রিকার অনলাইন পোর্টাল (আঞ্চলিক) ৫০ ৩য়
৪. বেসরকারি টেলিভিশনের অনলাইন পোর্টাল ১৫ ৪র্থ
মোট ৩৩৪
একটি জেলা শহরে ৩৬টি দৈনিক পত্রিকা বা ৫৯টি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশ করা রীতিমতো চ্যালেঞ্জিং বিষয়! সেগুলো কীভাবে চলে, অর্থের সংস্থান, বাণিজ্যিকভাবে কতোটা টেকসই এসব ভাবনা অমূলক নয়।
টেলিভিশন
বাংলাদেশে সরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ৪টি, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ৪৫টি। এর মধ্যে ৩৯টি চালু আছে ৬টি বন্ধ হয়ে গেছে। ৯টি শুধু সংবাদ পরিবেশন করে। বাকিগুলো সংবাদ, বিনোদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মিশ্র অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। আরো ১১টি চ্যানেল অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।
রেডিও
দেশে বর্তমানে ৬টি সরকারি রেডিও, ১৪টি সরকারি এফএম রেডিও, বেসরকারি ২৮টি এফএম রেডিও ও ১৮টি কমিউনিটি রেডিও রয়েছে।
এতে সহজেই বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশে মিডিয়া ইন্ডাষ্ট্রি কতো বড় এবং ক্রমবর্ধমান। এতো গণমাধ্যমের ভীড়ে সংবাদপত্রের ভূমিকা এখনো শুধু বরিশাল জেলায় ৩৬টি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় আর কুমিল্লা জেলায় ৫৯টি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়! ৯টি জেলার প্রতিটি থেকে ২০টিরও অধিক দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়!তবে সংখ্যা বাড়লেও গুণগত মান কতোটুকু বেড়েছে তা বলা কঠিন। বাংলাদেশের করপোরেট জগৎ অধিকাংশ বড় গণমাধ্যমগুলোর মালিক (সংবাদপত্র ও টেলিভিশন)। বাকিগুলোর মালিকানা ব্যবসায়ীদের অধীন। তাই মালিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করা অনেক গণমাধ্যমের একটি বাড়তি দায়িত্ব হয়ে পড়েছে। অথচ গণমাধ্যম হলো জাতির দর্পণ আর সাংবাদিক হলেন জাতির বিবেক!
সংখ্যায় বাড়লেও নৈতিকতা, নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা কতোটা বেড়েছে এটি একটি গবেষণার বিষয়। সাংবাদিকতার সর্বজনিন নীতিমালা এক্ষেত্রে কতোটা অনুসরণ করা হচ্ছে? সংবাদকমীর্দের শিক্ষাগত যোগ্যতা, দক্ষতা, আচরণ এর মাপকাঠি কোথায়? তাদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ কোথায়? কারা এই সুযোগ দেবে? তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে কে? আমার আজকের নিবন্ধের মূল বিষয় এটি নয়। তবে এটি পাঠকের জন্য চিন্তার খোরাক যোগাতেপারে।
আমার আজকের নিবন্ধের মূল বিষয় সাংবাদিকতার নীতিমালা। গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে গণমাধ্যম কমীর্র চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু গণমাধ্যম কমীর্ তৈরির কারখানা আমাদের দেশে অপ্রতুল বা গত দশ বছর আগে ছিল না বললেই চলে(প্রেস ইন্সটিটিউট, নিমকো আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাদ দিলে)। আর তাই ”সাংবাদিক এবং সাংবাদিকতা” এই দুটি শব্দের সঠিক অর্থ বা ব্যাখ্যা না জানা অনেকে গণমাধ্যম কমীর্ হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়ে যান। এতে চাহিদা মিটলেও মান বাড়েনি। তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগও কম। তবে দেশে সেরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ চালু হওয়ার ফলে গত এক দশক ধরেউচ্চ শিক্ষিত তরুণ—তরুণীরা এই পেশায় আসার ফলে মান কিছুটা উর্ধ্বমুখি। তবে নৈতিকতার নৈরাজ্য কমেনি। উচ্চশিক্ষার সাথে মূল্যবোধের জাগরণনা হলে এই নৈরাজ্য কমবে না। এর জন্য পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সাংবাদিকতার নীতিমালা, সাংবিধানিক অধিকার, মানবাধিকার এই বিষয়গুলো ওতপ্রোতভাবেজড়িত।গণমাধ্যম কমীর্রা এবিষয়ে কতোটা জানেন, বুঝেন এবং মানেন!!! জানার, বুঝার এবং মানার পরিবেশ কতোটুকু আছে সেটিও ভেবে দেখার বিষয়।সাংবাদিকতার ৫টি মূল নীতিমালা সকল গণমাধ্যম কমীর্র জানা প্রয়োজন যা সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আজকের নিবন্ধে আলোচনায় এই বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
সাংবাদিকতার ৫টি মূল নীতিমালা যা সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য*
১. সত্য ও সঠিক সংবাদ পরিবেশন
২. স্বাধীনতা
৩. ন্যায্যতা এবং নিরপেক্ষতা
৪. মানবতা
৫. জবাবদিহিতা
১. সত্য ও সঠিক সংবাদ পরিবেশন
সাংবাদিকরা সবসময় সংবাদের সত্যতার নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। তবে সাংবাদিকতার মূলনীতি হলো সত্য খুঁজে পাওয়া। তাই সবসময় সঠিক ও নিভুর্ল সংবাদ পরিবেশনের জন্য চেষ্টা করা উচিত। সংগ্রহ করা সব প্রাসঙ্গিক তথ্য দেওয়া এবং সেগুলো পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। এজন্য তথ্যের বিভিন্ন উৎসের মূল্যায়ন করা প্রয়োজন (পিয়ার পর্যালোচনা, সমীক্ষা, উপাখ্যানমূলক প্রতিবেদন, স¦াক্ষ্য—প্রমাণ ইত্যাদি)।রিপোর্ট করার আগে তথ্যের সত্যতা যাচাই করা উচিত। তথ্য কতটা সঠিক বা নিভুর্ল তা যাচাই করার জন্য কোন্ উৎসগুলো পাওয়া যায় তা জানা এবং যাচাই করা জরুরি। গণমাধ্যম কমীর্র উচিতবিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ এবং স্বনামধন্য পেশাদারদের সাথে সংযোগ তৈরি করা, যাতে তথ্যের সত্যতা ও নির্ভুলতা নির্ধারণ করার সময় তাদের কাছ থেকে পরামর্শ/তথ্য পাওয়া যায়।কোনো প্রমাণাদি না থাকলে কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব না হলে তা স্বীকার করা উচিত।
২. স্বাধীনতা
সাংবাদিকদের কন্ঠস্বর স্বাধীন হতে হবে; রাজনৈতিক, কপোর্রেট বা সাংস্কৃতিক যাই হোক না কেনো,কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠির স্বার্থে বা পক্ষে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনোভাবেই কাজ করা উচিত নয়। পত্রিকা বা মিডিয়ার সম্পাদকদের বা পাঠক/শ্রোতাদের, সাংবাদিকদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, আর্থিক ব্যবস্থা বা অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য যা স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি করতে পারে তা ঘোষণা করা উচিত।এমন শব্দচয়ন এড়িয়ে চলা উচিত যা বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠির স্বার্থ বাপক্ষ নির্দেশ করে। অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য যদি যথেষ্ট প্রমাণ না থাকে তাহলে কোনো খবর প্রকাশের যোগ্য কি না পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রতিবেদন লেখার সময় দৃশ্যমান নয় এমন উদ্দেশ্যগুলোও বিবেচনা করা প্রয়োজন।সম্ভাব্য স্বার্থের দ্বন্দ্ব (প্রতিবেদনের সাথে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতাসহ) সম্পর্কিত বিষয় অনুসন্ধান করা এবং শেয়ার করা উচিত। রিপোর্ট করার সময় মতামত ও তথ্যভিত্তিক প্রমাণের মধ্যে পার্থক্য করা প্রয়োজন। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু এ্যাডভোকেসি বা অনুসন্ধানীমূলক কি না তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যাতে জনসাধারণ সত্য ও নিরপেক্ষ প্রতিবেদন আলাদাভাবে বুঝতে পারে।
৩. ন্যায্যতা এবং নিরপেক্ষতা
বেশিরভাগ প্রতিবেদনে অন্তত দুইটি দিক থাকে, ন্যায্যতা এবং নিরপেক্ষতা। যদিও প্রতিটি অংশে প্রতিটি দিক উপস্থাপন করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। প্রতিবেদন ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া উচিত এবং প্রসঙ্গ উল্লেখ করা উচিত। বস্তুনিষ্ঠতা সবসময় সম্ভব নয় এবং কাম্যও হতে পারে না (যখন নৃশংসতা বা অমানবিকতার মুখোমুখি হতে হয়)। তবে নিরপেক্ষ প্রতিবেদন জনগণের মধ্যে বিশ^াস এবং আত্মবিশ^াস তৈরি করে। এই বিষয়ে কয়েকটি নির্ভরযোগ্য উৎসের সাথে যোগাযোগ করা এবং তথ্যের একটি বিশ^স্ত উৎস হিসেবে নিজেকে বিশ^াসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য ও নিরপেক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা গণমাধ্যম কমীর্র জন্য খুবই গ্ররুত্বপূর্ণ।সবসময় প্রতিবেদনের সীমাবদ্ধতাগুলো উল্লেখ করা প্রয়োজন। গণমাধ্যম কমীর্ তার মতামতের জন্য দায়বদ্ধ। কিন্তুপ্রতিবেদনের তথ্য গণমাধ্যম কমীর্র নিজস্ব নয়। অনুসন্ধান ও পূর্বে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং নিরপেক্ষ তথ্য একজন গণমাধ্যম কমীর্র প্রতিবেদনকে দ্ব›দ্বমূলক মতামত থেকে দূরে সরিয়ে একটি প্রামাণ্য মূল্যায়নের দিকে নিয়ে যাবে যা একজন গণমাধ্যম কমীর্রন্যায্যতা এবং নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করবে।
৪. মানবতা
গণমাধ্যম কমীর্/সাংবাদিকগণ কোনো ক্ষতি করেন না— করতে পারেন না, যা প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন তা কখনো কখনো কষ্টদায়ক হতে পারে। তবে তাদের কথা এবং ছবি অন্যদের জীবনে কী প্রভাব ফেলতে পারে সেই সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। ’মানবতা’ সবকিছুর উর্দ্ধে এবিষয় সবসময় মনে রাখা উচিত।বার্তা শেয়ার করার সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে চিন্তা করা প্রয়োজন। একজন অভিভাবক, নীতিনিধার্রক, প্রশাসক, রাজনীতিবিদ বা সাধারণ মানুষকীভাবে প্রভাবিত হবেন এবং প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন তা বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করা জরুরি।যারা সংবাদ কভারেজ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে তাদের জন্য সহানুভূতি দেখানো উচিত। দুর্বল বা ঝুঁকির মধ্যে আছে এমন মানুষকে প্রভাবিত করে এরকম বিষয় বা দুনীর্তিমূলক রিপোর্ট করার সময় অনেক বেশি সংবেদনশীল হওয়া উচিত।
৫. জবাবদিহিতা
মানবতা, সহানুভূতি এবং সংবাদের মধ্যে দ্বিধা বা দ্ব›দ্ব নিয়ে চিন্তা করার সময় একজন গণমাধ্যম কমীর্র বিবেচনা করা উচিত যে “সাংবাদিকতার আবেগজনিত শক্তি তার তথ্যের মধ্যে এবং উপস্থাপনের ক্ষমতার মধ্যেনিহিত, শুধু বলা বা লেখার মধ্যে নয়।”দায়িত্বশীল এবং পেশাদারি সাংবাদিকতার একটি নিশ্চিত লক্ষণ হলো নিজেদের দায়বদ্ধ ও জবাবদিহি রাখার ক্ষমতা। আমরা যখন ভুল করি তখন আমাদের অবশ্যই সেগুলো সংশোধন করতে হবে এবং আমাদের অনুশোচনার অভিব্যক্তি অবশ্যই আন্তরিক হতে হবে, নিন্দুক বা প্রতিশোধমূলক নয়। আমরা আমাদের পাঠক/শ্রোতাদের উদ্বেগের কথা শুনি। আমরা পাঠকের লেখা, বলা বা প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তন করতে পারবো না। তবে আমরা আমাদের ভুলগুলো সংশোধন করতে পারি। কোনো অপ্রিয় বা পক্ষপাতিত্ব হলে আমরা তার প্রতিকার করতে পারি।তথ্য যাচাই করে এবং মূল উৎস ব্যবহার করে প্রকাশের আগে কাজের যথার্থতা যাচাই করে জবাবদিহিতার দায়িত্ব নিতে হবে।যদি তথ্য রিপোর্ট করা হয় এবং পরে ভুল বলে প্রমাণিত হয় তাহলে এর নতুন তথ্য শেয়ার করা প্রয়োজন। কী বলা হয়েছিল এবং কেনো সেটি ভুল ছিল তা প্রকাশ করা উচিত। প্রয়োজনে ভুল তথ্যপূর্ণ রিপোর্ট প্রত্যাহার করা উচিত।গণমাধ্যম কমীর্র নিজস্ব মূল্যবোধ এবং অভিজ্ঞতা তার রিপোর্টিংকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা যাচাই করা প্রয়োজন।
নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিবেদন/রিপোর্ট প্রসÍুতে করণীয়
১. প্রতিবেদন তৈরির সময় বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা, সততার সাথে সঠিক তথ্য পরিবেশন করা এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য উপস্থাপন করা প্রয়োজন। কোনো তথ্য গোপন করা উচিত নয়।
২. ব্যক্তি চরিত্র, গোত্র, বয়স, যৌনঅভ্যাস, পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্ম এবং শারিরীক ও মানসিক যোগ্যতা বা অক্ষমতা এসব অপ্রয়োজনীয় বিষয় প্রতিবেদনে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই।
৩. মানসম্মত তথ্য ও তার উৎসের প্রতি লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন। তথ্য প্রদানকারী নাম প্রকাশ করতে অসম্মত হলে প্রথমে তার কারণ জানা দরকার, তথ্য প্রদানকারীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এবং বিকল্প উৎস বের করা উচিত।
৪. ব্যক্তি স্বার্থকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়। কোনো উপহার, প্রতিশ্রম্নতি, বাড়তি সুবিধা, আর্থিক অনুদানকে প্রশ্রয় দেওয়া ঠিক হবে না, যা গণমাধ্যম কমীর্র সততা, নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতাকে অবদমিত করবে।
৫. সাংবাদিকতার সততা, নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতাকে খর্ব করবে এমন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব থাকলে তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা উচিত। ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার জন্য সাংবাদিকতার পরিচয়কে ব্যবহার করা কোনো মতেই বাঞ্ছনীয় নয়।
৬. সাংবাদিকতার সত্যতা, নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতাকে খর্ব করবে এমন কোনো বিজ্ঞাপন বা প্রচারণাকে প্রশ্রয় দেওয়া উচিত হবে না।
৭. সাক্ষাৎকার গ্রহণ, আলোকচিত্র বা তথ্যের বিনিময়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো আর্থিক লেনদেন হলে তা সর্বশক্তি দিয়ে প্রকাশ করা উচিত।
৮. স¦াক্ষ্যপ্রমাণ, উপকরণ সংগ্রহ করতে গিয়ে সৎ ও দায়িত্বশীল থাকা একজন গণমাধ্যম কমীর্র নৈতিক দায়িত্ব। প্রকাশনা বা প্রচারের জন্য কোনো সাক্ষাৎকার নিতে হলে সংশ্লিষ্টা কতৃর্পক্ষের সাথে পূর্বেই আলোচনা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির দুর্বলতা, ঝঁুকিপূর্ণ অবস্থা বা মিডিয়া সম্পর্কে অজ্ঞতার সুযোগে কেউ যেনো প্রতারিত না হয়।
৯. সত্য ও যথাযথ আলোকচিত্র ও কথা রেকর্ডিং থাকলে তা তুলে ধরা প্রয়োজন। কোনোরকম বিভ্রান্তকারী বা বিকৃত তথ্য, কথা ও চিত্র পেয়ে থাকলে তা প্রকাশ করা উচিত।
১০. অন্যের লেখা, তথ্য, ছবি নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া সাংবাদিকতা নীতিমালার পরিপন্থি। কোনোভাবেই তা করা যাবে না। যদি একান্ত প্রয়োজন হয় তাহলে সূত্র বা নাম উল্লেখ করা প্রয়োজন।
১১. প্রত্যেকের ব্যক্তিগত দুঃখ, আবেগ, গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা একজন গণমাধ্যম কমীর্র জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রকার চাপ প্রয়োগ করা হলে তার প্রতিবাদ বা প্রতিহত করার অধিকার সাংবাদিকের রয়েছে।
১২. প্রতিবেদন, তথ্য ও উৎসের কোথাও কোনো ভুল হলে তা সংশোধনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা প্রয়োজন।
*সূত্রঃ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সুশাসন (সাংবাদিকদের জন্য হ্যান্ডবুক), বিএনএনআরসি
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস ক্লাব, গণমাধ্যম ও উন্নয়ন পরামর্শক
বর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন