প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৩ ০৫:২০
গণমাধ্যম আজকাল অনেক বেশি প্রভাবিত করছে মানুষের জীবনকে। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির শক্তিশালী সংযোজনে গণমাধ্যমে তৈরি হয়েছে বিষ্ময়কর বহুমাত্রিকতার এক অভূতপূর্ব আবহ-আবেশ । ‘প্রেস’, ‘গণমাধ্যম’, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’ ‘প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া’-এরকম অনেক অভিধার ব্যবহার প্রকটভাবে পরিলক্ষিত হয় জনজীবনে । নিশ্চয়ই এগুলোর নির্দিষ্ট সংজ্ঞা-সীমা-পরিসীমা-পরিসর আছে। এদের বহুমুুখী ব্যবহারের ভাল ও মন্দ সূক্ষ্মভাবে বিচার করাও খুব কঠিন। মানুষের সাথে মানুষের মিথষ্ক্রিয়াও ধারণ করেছে অভিনব রূপ। অনেক বেশি বদলে গেছে ব্যক্তির চিন্তা ও মতামত প্রকাশের সুযোগ। সব বিষয়ে প্রায় সবাই সহজেই প্রকাশ করছেন নিজের বক্তব্য । একসময় ডাকে চিঠি পাঠানোর পর উপযু্ক্ত হলে পত্রিকার পাঠক প্রতিক্রিয়া অংশে ছোট্ট করে ছাপা হতো পাঠকের মতামত; রেডিওতে শুনা যেত শ্রোতাকে নিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রাম। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৫ সালে ওয়াশিংটনের ফোর্ড’স থিয়েটারে অভিনেতা জন উইলকিস বুথ-এর গুলিতে নিহত হন। এই সংবাদ একটি জাহাজে করে লন্ডনে পৌঁছাতে সময় লেগে যায় বারো দিন। আয়ারল্যান্ড-এর দক্ষিণ উপকূলে ছোট্ট একটি নৌকা দেখা পায় আমেরিকা থেকে লিংকন-এর মৃত্যু সংবাদ নিয়ে আসা সেই জাহাজের; জাহাজটিকে তিন দিন পিছনে ফেলে সংবাদটি টেলিগ্রাফ করে কর্ক থেকে পাঠানো হয় লন্ডনে । এই একটি উদাহরণ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে আজকের উন্নততর যোগাযোগ ব্যবস্থার অবস্থা। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল মিডিয়া অভাবনীয় রূপে পাল্টে দিচ্ছে মানুষের অনেক কিছু; ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অঞ্চল ও বিশ্বকে স্থাপিত করেছে ভিন্ন অথচ অবিচ্ছিন্ন এক মহাসড়কে।
উন্নত প্রযুক্তির কল্যাণে তথ্যকে মুহূর্তে কয়েকটি ক্লিকে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব গোটা দুনিয়ার মানুষে মানুষে। একবিংশ শতাব্দীতে মানুষের এটি বিশেষ এক অর্জন। একক মানুষ থেকে একক মানুষ বা একদল মানুষের মধ্যে তথ্যের স্থানান্তরই হচ্ছে যোগাযোগ। তা বক্তব্যের মাধ্যমেই হোক বা গণমাধ্যম দিয়েই হোক। সমাজে এর প্রভাব প্রবল। পত্রিকা শুরুরও একটা ইতিহাস আছে। অনেককাল পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও রেডিও ছিল প্রধান মাধ্যম। তারপর সংযোজিত হলো টেলিভিশন; প্রথমে সাদা-কালো এরপর রঙিন । বাঙালি সমাজব্যবস্থায় সিনেমাও আবেগ উৎসারণের প্রধান একটি ক্ষেত্র। ইন্টারনেটের প্রয়োজন বেড়ে গেলো ফেসবুক ব্যবহারের কারণে। এগুলোকেই আমারা ‘গণমাধ্যম’ বা Ômass media’ বলি, কারণ বিশাল সংখ্যক মানুষ এগুলোর মাধ্যমে যুক্ত হয়ে পড়েন। একবচনে মিডিয়াম (medium) বহুবচনে মিডিয়া (media)। এখানে বলা সঙ্গত যে, ‘মিডিয়া’ শব্দটি বহুবচন হলেও ইংরেজি ভাষায় একে অধিকাংশ ক্ষেত্রে একবচন রূপেই দেখা হয়। সরাসরি ও অনলাইন পত্রিকা, ম্যাগাজিন, ফোন, ফ্যাক্স, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট ও বিলবোর্ড সবই মিডিয়ার অন্তভুর্ক্ত। এগুলোর মাধ্যমে সংবাদ, সঙ্গীত, সিনেমা, ডকুমেন্টারি-সহ বিভিন্ন ধরণের বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছানো হয়। একজন ব্যক্তি যখন আরেকজন ব্যক্তির সাথে টেলিফোনে কথা বলেন তখনও টেলিফোনটি একটি মিডিয়াম। কিন্তু যখন বিশাল সংখ্যক মানুষ কোনো যোগাযোগে সংযুক্ত হন বা হওয়ার সুযোগ থাকে তখনই আমরা ‘মাস মিডিয়া (mass media) বা বাংলায় বলি ‘গণমাধ্যম’। মিডিয়ারপ্রধান ধরণ দু’টি। প্রিন্ট মিডিয়া ও ব্রডকাস্ট মিডিয়া। প্রিন্ট মিডিয়া হলো ছাপানো সব প্রকাশনা- পত্রিকা, ম্যাগাজিন, জার্নাল, বই, রিপোর্ট ইত্যাদি। এটি পুরাতন ধরণ। মানুষ ভাবনায় পড়েছিল- ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কারণে হয়তো ছাপানো প্রকাশনা মুখ থুবড়ে পড়বে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মুদ্রণশিল্পের প্রকাশনা কমছে না। বরং প্রযুক্তির অগ্রগতি ব্যবহার করে এটি আরও ব্যাপকতর হচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির কারণে তথ্যের সহজলভ্য সুযোগ মুদ্রণ প্রক্রিয়ায় প্রকাশকে করে তুলছে অনেক বেশি সম্ভাবনাময়।
ব্রডকাস্ট মিডিয়া নবীন। প্রধান উপায় হলো রেডিও ও টেলিভিশন। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন অনলাইন উৎসগুলো এদেরকে পেছনে ফেলে দেবে। তবু এখনও টেলিভিশনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য; বিশেষত ডিশ বা ক্যাবল নেটওয়ার্কের কারণে একটি একক সংযোগের মাধ্যমে শতাধিক টিভি চ্যানেলে সংযুক্ত হওয়া সম্ভব। মূলত প্রযুক্তিগত এইসব কলাকৌশল সম্পূরক হয়ে উপযোগিতার ক্ষেত্র ক্রমশ বৃদ্ধি করছে।
ইন্টারনেট মানুষে মানুষে যোগাযোগের ক্ষেত্র বা সুযোগ তৈরি করেছে অভাবনীয় মাত্রায়। ওয়বসাইট ও ব্লগ ব্যবহারের মাধ্যমে সংবাদ, বিনোদন, বাণিজ্য, বিশেষত বিপণন ও শিক্ষা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপায়ের ক্রমবিকাশ উল্লেখযোগ্য। সর্বত্রই বৃদ্ধি পাচ্ছে বাণিজ্যের সুযোগ। ই—মেইল ব্যবহারে অর্থের প্রয়োজন না—হলেও এর মাধ্যমে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন ও বার্তার প্রচার এমনই যে ছোট্ট একটু স্থানও বাদ পড়ে না যদি সম্ভব হয় তাতেও প্রচারিত হচ্ছে বিজ্ঞাপন। নব্বই দশকের শেষ দিক থেকে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে ক্রমশ ।
‘সোসাল মিডিয়া (Social Media) বা ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম’—এর ভূমিকা সমাজে এখন সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী বা কার্যকরী রূপ পরিগ্রহ করেছে, যেখানে মানুষেরা নিজেদের মধ্যে অভূতপূর্ব মিথষ্ক্রিয়ায় শেয়ার করছেন শুধু তথ্যই নয় অনেক কিছুই । ব্যক্তিগত, পারিবারিক, গোষ্ঠীগত, সম্প্রদায়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র সবকিছুর বিভাজন লাইন যেনো ভেঙ্গে পড়েছে। বিভিন্ন ওয়েবসাইট, অ্যাপস্—এর ব্যবহার কেবলই বাড়ছে সামাজিক যোগাযোগে । এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হলো ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, গুগল+ ইত্যাদি।
কানাডার সমাজবিজ্ঞানী Marshall McLuhan (1964)-এর মতে সমাজের উপর গণমাধ্যমের ধরণগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রভাব আছে। তাঁর মতে ‘মিডিয়া হলো বার্তা’। আরও স্পষ্ট করে বলা যায়, মিডিয়া—এর বার্তা বা প্রকাশিত তথ্যের চেয়ে মিডিয়ার ধরণের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয় সমাজ । ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবন সবার একইরকম নয়; সাংস্কৃতিক অবস্থানের পার্থক্য তাৎপর্যপূর্ণ। বিনিময় বা প্রভাবের বিষয়টি মূলত সীমানাবিহীন হয়ে পড়েছে। McLuhan ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ইলেকট্রনিক মিডিয়া একটি গ্লোবাল ভিলেজ-এর সৃষ্টির নেতৃত্ব দিবে যেখানে অধিকাংশ লোক অবলোকন করবেন উদ্ঘাটিত অনেক বিশেষ ঘটনা। চব্বিশ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত ঘটনার সংবাদ, সংবাদ-বিশ্লেষণসহ সব ক্ষেত্রের সবধরণের অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করছে। মানুষের আগ্রহের কোনো কিছুই বাদ পড়ছে না- তা সে সঙ্গীত, সিনেমা, ক্রীড়া যা-ই হোক না কেন। একক মানুষের ভাগ্য একীভূত হচ্ছে সব মানুষের ভাগ্যের সাথে । প্রযুক্তি-ব্যবহারে বৈষম্য কমলেও প্রযুক্তি ব্যবহারের পিছনের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক পার্থক্য থাকায় অনেক কাল পর সবকিছু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা আগাম বলা খুবই কঠিন।
‘মিডিয়ার এককেন্দ্রিক অভিমুখতা (media convergence)Õ এক্ষেত্রে আরও একটি উল্লেখযোগ্য দিক। যোগাযোগের ধরণগুলো খেয়াল করার মত মাত্রায় পরষ্পর জড়িয়ে পড়ছে। প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে পাল্লা দিয়ে নতুন নতুন উপায়ে মিডিয়ারা সম্পর্কিত হচ্ছে একে অপরের সাথে অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ সুযোগ সুবিধায়। টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ও টেলিফোন ব্যবহারের রূপ বদলে যাচ্ছে দিন দিন; এর মূল কারণ প্রযুক্তি ও ইন্টারনেট ব্যবস্থার ক্রমশ উন্নতি বা পরিবর্তন। স্মার্টফোন ব্যবহারে আমরা চাইছি মুঠোর মধ্যে বিশ্ব। বিষ্ময়কর এই ডিজিটাল বিপ্লব দর্শক—শ্রোতার মধ্যেও নিশ্চয় রাখছে সদর্থক কিংবা নঞর্থক প্রভাব।
মানব প্রজাতি সনাক্তকরণের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কথা বলার সামর্থ্য। মানব-ইতিহাসে বহুকাল ধরে যোগাযোগের প্রধান উপায় হলো সামনাসামনি কথা বলা। মুখে কথা বলার এই সংস্কৃতি, ধারণা, তথ্য, তত্ত্ব, জ্ঞান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শ্রম্নতি-স্মৃতি হয়ে একসময় বাঁধা পড়লো হাতে লিখা পুঁথিতে। এর অনেক আগে ছিল গোহাগাত্রে অঙ্কিত চিত্র, পাথরে খোদাই করা তথ্য। এক্ষেত্রে ধর্ম লিখিত তত্ত্ব অধ্যয়ন, সংরক্ষণ ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘শব্দের বিস্তার’ প্রথমে ধর্ম প্রচারের কারণেই ঘটে।
গুটেনবার্গের প্রিন্টিং প্রেস আবিষ্কার (১৪৩৬) শব্দ বিস্তারে অনেক এগিয়ে আসে। গুটেনবার্গ মূলত তখনকার প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে কাগজ ও কাঠের ব্লক ব্যবহার করে ছাপার কাজটি করেন; যদিও গুটেনবার্গের আগে যাত্রাটি শুরু হয় নবম শতাব্দীতে চিনে কাঠেরব্লক ও কোরিয়ায় ধাতব টাইপ ব্যবহার করে। তবে প্রথম দিকে প্রিন্ট মিডিয়াও আজকের মত এত ব্যাপক ছিল না। জনশিক্ষা ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য সে-ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল। পরবতীর্তে প্রযুক্তির উন্নতির সাথে তাল মিলিয়ে মুদ্রণশিল্পও ক্রমশ অত্যাধুনিক হয়েছে এবং হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষভাগে ডিজিটাল প্রযুক্তি নতুন মিডিয়া যোজনা করে, যেমন- মোবাইল, স্মার্টফোন, ভিডিও গেম, ডিজিটাল টেলিভিশন ও ইন্টারনেট। এই সবকিছু আবার পরিপূরক-সম্পূরক হয়ে ঘটিয়ে দিল ডিজিটাল বিপ্লব।
মাল্টিমিডিয়া বিকাশের মূল হলো ডিজিটাইজেশন। এতে বিভিন্ন ধরণের মিডিয়া ব্যবহারে বিভিন্ন প্রযুক্তির প্রয়োজন পড়ে। চলমান ছবি ও শব্দকে একক মিডিয়ামে চালাতে হয় (কম্পিউটার, ডিভিডি ইত্যাদি)। প্রতিক্ষণ প্রতিদিন কম্পিউটিং ও ইন্টারনেট বিকশিত হচ্ছে। ইচ্ছেমত অনেককিছু ডাউনলোড করে সংরক্ষণ করা; প্রয়োজনে শেয়ার করার সুযোগও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মিডিয়ার মৌলিক দিক হলো অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যার সাহায্যে তথ্যের যোগাযোগ ও বিনিময় দ্রুততম সময়ে সম্ভব হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে এরকম কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে অভাবনীয় অগ্রগতি সৃষ্টি করলো। টেলিকমিউনিকেশন বলতে তথ্য, শব্দ বা ইমেজের দূরবতীর্ যোগাযোগ বুঝায়। অর্থের লেনদেনে, স্টক মার্কেটে এমনই পরিবর্তন হলো যে, চেক বা ক্যাশের বিষয়গুলি উবে গেলো। এক্ষেত্রে কম্পিউটারের সাথে স্যাটেলাইট যোগাযোগের সংযোজনও উল্লেখযোগ্য।
চারটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে এমনতর উন্নতির কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; এক. কম্পিউটারের সামর্থ্য বৃদ্ধি, দুই. ডাটার ডিজিটাইজেশন, তিন. স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন ও চার. ফাইবার অপটিকস্। স্মার্টফোন, পারসোনাল কম্পিউটার (PC),টেবলেট পিসি-এর সাথে যুক্ত ওয়াই-ফাই সুবিধা। বাড়িতে বা কর্মস্থলে ল্যাপটপ, নেটবুক, পিসি ব্যবহার করে যে সুযোগ সুবিধা পাওয়া যায় তাই পরবতীর্তে সম্ভব হলো স্মার্টফোনে (আইফোন, এইচটিসি ও ব্ল্যাকবেরি)। আমাদের সমাজে এগুলো ব্যবহারের ঠিকঠাক পরিসংখ্যান না-থাকলেও এটি সহজেই বলা যায় যে, বাটনফোনের জায়গায় স্মার্টফোনের ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। জীবনের প্রয়োজনে হলেও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়ছে মানুষের কাছে। একই সাথে বলা যায়- মানুষের জীবনে এই নবতর সংযোজন পাল্টে দিচ্ছে মানুষের অনেক কিছু।
কম্পিউটার ব্যবহারের উপযোগিতাই একসময় ইঙ্গিত করে আন্তঃসংযুক্ত আন্তর্জাল বা ইন্টারনেটের অপার সম্ভাবনা। স্নায়ুযুদ্ধ কালেই ইন্টারনেটের জন্ম। ১৯৬৯ সালে পেন্টাগন আমেরিকার হেডকোয়ার্টারগুলোর সাথে যোগাযোগের জন্য এটির ব্যবহার শুরু করে। প্রথমে এটির নাম ছিল ARPA বা Advanced Research Project Agency। শুরুর দিকে এটি আমেরিকার বিভিন্ন সামরিক প্রজেক্টে গুরুত্বপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়। এই প্রয়োজন থেকেই ই-মেইল-এর সৃষ্টি। বিশ্ববিদ্যালয়ে এর ব্যবহার শুরু হয় ১৯৮৭ সাল থেকে । বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবহারকে ছাড়িয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এই সুবিধা ১৯৯৪ সাল থেকে কাজে লাগাতে শুরু করে।
ইন্টারনেটের সুবিদিত ব্যবহার হলো ওয়ার্ল্ডওয়াইড ওয়েব- একটি গ্লোবাল মাল্টিমিডিয়া লাইব্রেরি। এটি ১৯৯০ সালে সুইজারলেন্ডের পদার্থবিজ্ঞানের এক ল্যাবরেটরিতে আবিষ্কার করেন Tim Berners-Lee নামের এক ব্রিটিশ সফট্ওয়ার ইঞ্জিনিয়ার। ওয়েব ব্রাউজার—এর সাহায্যে এই নেভিগেশন সম্ভব হলেও বিভিন্ন ধরণের জনপ্রিয় ‘অ্যাপস্’—এর স্মার্টফোনে ব্যবহার ওয়েব ব্রাউজারের ব্যবহার কমিয়ে দেয়। ওয়েবসাইটে একে একে সংযোজিত হতে থাকে গ্রাফিক্স, ইমেজ, ভিডিও, অডিও। একইসাথে প্রচণ্ড প্রতাপশালী হয়ে অনলাইনে আবিভূর্ত হয় ‘ই-কমার্স’। তবে ONS (the Office for National Spastics)-এর ডাটা এই বলে যে, ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধির ফলে অসাম্যও দেখা দিচ্ছে- যাকে বলা হয় ‘ডিজিটাল বিভাজন বা digital divides (Andreasson 2015; Ragnedda and Maschert 2013) । দেশভেদে পার্থক্য থাকলেও আমাদের সমাজে এখনও বিশাল সংখ্যক বিভিন্ন বয়সের নারী—পুরুষ আছেন যাঁরা এর সুফল ব্যবহারে অসমর্থ; মহানগর, নগর, শহর, বাজার, গ্রাম, মহল্লা বা পাড়া ও পরিবারভেদেও এর সদ্ব্যবহারে ভিন্নতা থাকবে।
ইন্টারনেটের প্রান্তিক ব্যবহারকারী শুধু সুবিধাভোগ করেন না, তিনি কিছু ঝুঁকিতেও থাকেন। কারণ অ্যাপলিকেশন, প্রোগ্রাম, ফাইল-সংরক্ষণ ও অপারেটিং সিস্টেম বৃহৎ কোনো ডাটাসেন্টার-নির্ভর, যার অবস্থান প্রান্তিক ব্যবহারকারী জানেন না; যে-কোনো ডিভাইস- ল্যাপটপ, টেবলেট, নেটবুক, স্মার্টফোন ব্যবহার করে সফ্টওয়ার ইনস্টল করে বা না-করে টাকা পাঠালেই কাজ হয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা (privacy), বিশ্বস্ততা ও ডাটা নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে প্রান্তিক ব্যবহারকারীর ঝুঁকি থাকে কারণ তারবিহীন ব্যবস্থায় তথ্য প্রেরণ ছাড়াও ডাটাসেন্টার সবকিছু সংরক্ষণ করতে পারছে। এইসবকিছুকে বলা হয় ‘মেঘ কম্পিউটিং বা cloud computing’। তবু বলা হয়ে থাকে যে, মানুষ Ôintercloud’-এর দিকে এগুচ্ছে- যাকে বলা হচ্ছে আন্তঃসংযুক্ত, বৈশ্বিক ‘মেঘেরও মেঘ’ (Rothenberg 2010)। বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ইন্টারনেটের আরও উপযোগী ব্যবহার বাড়তেই থাকবে।
ইন্টারনেটের সুবাদে আন্তঃসংযুক্ত এক বৈশ্বিক সমাজের আবির্ভাব হচ্ছে (Castells 2006)। এই মিথোষ্ক্রিয়া যে-ভাচুর্য়াল জগতে ঘটে তাকে বলে ‘সাইবার স্পেস’- কম্পিউটারের গ্লোবাল নেটওয়ার্কের একটি মিথোষ্ক্রিয়ার ক্ষেত্র- যা সম্ভব হয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে। এটি বাস্তবতার একটি বিকল্প রূপ। যাঁর বা যাঁদের সাথে সংযুক্ত হওয়া যায়, জানা যায় না তিনি নারী না পুরুষ অথবা তাঁর প্রকৃত অবস্থা ও অবস্থান। এক্ষেত্রে মতামত দু’ধরণের । কেউ কেউ বলেন এতে ইলেকট্রনিক সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, যা মুখোমুখি আন্তঃক্রিয়ার তুলনায় সম্পর্ক বৃদ্ধিতে সহায়ক। দূরে ভ্রমণ করতে গিয়েও বাড়ির বা কাছের লোকদের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ফলে দূরত্ব ও বিচ্ছিন্নতার কষ্ট ঘুচে। নতুন সম্পর্কও তৈরি হয়; বিভিন্ন ধরণের চ্যাটরুম ও ব্লগ সাইট ব্যবহারে পরস্পর উপকৃত হন। অনেকেই এরকম সম্পর্কের ক্ষেত্রে অনেক বেশি সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। অনেকে আবার বড় মাপের সমস্যায় পড়েন; বিশেষত অসংস্কৃতজন এক্ষেত্রে বড় সমস্যা। আমাদের দেশে অনেক সময় নারীরা সাইবার ক্রাইম এর শিকার হয়ে থাকেন। যাঁরা একে সদর্থকভাবে দেখেন তাঁদের অভিমত হলো - এটি সামাজিক যোগযোগকে সম্প্রসারিত ও সমৃদ্ধ করছে।
সাইবার স্পেস ব্যবহারে অনেকে আবার কম উৎসাহী। অনলাইনে অনেকটুকু সময় কাটানোর কারণে প্রকৃত জগতে ব্যবহারকারীর বিচরণ বা আন্তক্রিয়া কমে যায়। অনেক সমাজবিজ্ঞানী চিন্তিত এই ভেবে যে, ইন্টারনেটের ব্যবহারে একধরণের সামাজিক বিচ্ছেদ দেখা দেবে; লোকেরা ঘনিষ্ঠজন বা তাঁদের পরিবারের সদস্যকে গুণগত সময় (quality time) দিতে পারবেন না। কর্মক্ষেত্র আর গৃহ একাকার হয়ে যাবে; বাড়িতে গিয়েও কর্মক্ষেত্রের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। ব্যক্তিগত সম্পর্কে টানাপোড়ন, বিনোদনের প্রথাগত উপায় যেমন সঙ্গীতসন্ধ্যা বা থিয়েটারে যাওয়া, বই পড়া ইত্যাদি অনেককিছু বদলে সামাজিক বুনটই যাবে পাল্টে। টেলিভিশন প্রসঙ্গেও একই চিন্তা ছিল তবে অনেকের মতে টেলিভিশনও বিভিন্নভাবে সামাজিক জগতকে সমৃদ্ধ করেছে।
Howard Rheingold তাঁর The Virtual Community (২০০০) গ্রন্থে কম্পিউটারের মাধ্যমে যোগাযোগকে সদর্থক সম্ভাবনায় দেখেছেন এবং মন্দ দিককে মেনেও নিয়েছেন Ñ ইচ্ছে করে বাদ দেয়া যায় না বলে। ইন্টারনেটে অপ্রীতিকর কিছু দিকও আছে; বিশেষ করে অপরাধের অন্ধকার জগত; ব্যক্তির তথ্যকে পণ্য হিসেবে বিক্রি করে সুবিধা নেয়া, ব্যক্তির উপর কতৃর্ত্ববাদীর নজরদারী বৃদ্ধি ইত্যাদি। সমস্যাগুলো রাতারাতি সমাধান না—করা গেলেও মানুষকে ঘিরে এই ভাচুর্য়াল জগতকে সদর্থক সম্ভাবনায়ই দেখা হয়।
Manuel Caste (২০০১) যুক্তিসঙ্গতভাবে বলেন যে ইন্টারনেট কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থান, ব্যক্তির একক মতামত, সহযোগিতা ও সঙ্গপ্রিয়তার মধ্যে সংমিশ্রণ সম্ভব করে তুলবে। রাজনীতি-সক্রিয় মানুষের জন্য ইন্টারনেট অনেক গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে; বিশাল সংখ্যক মানুষের কাছে তাঁরা তাঁদের বার্তা নিয়ে পৌঁছাতে পারছেন। ২০১০-২০১২ সাল অব্দি ঘটে যাওয়া ÔArab Spring’সম্ভব হয়েছিল কারণ সক্রিয় অংশগ্রণকারীরা তাঁদের চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা বিশ্বব্যাপী শেয়ার করতে পেরেছিলেন ব্লগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদি ব্যবহারের মাধ্যমে। সংবাদ ও পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন শেয়ার করে নাগরিকরাও সংবাদিকের ভূমিকা রাখেন মূলধারার মিডিয়ায়, যদিও উইকিলিকস্ যখন অনলাইনের রাজনৈতিক গোপনীয়তা, সামরিক তথ্য হুবহু প্রকাশ করে তখন তথ্যের নাটকীয় প্রকাশ নিয়ে স্বাধীনতা ও আইনসিদ্ধতা বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। তথ্যের প্রকাশেও মানুষ যৌক্তিকতা ও শিল্পসম্মত রূপ আশা করে।
সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে সব বয়সের মানুষরা সক্রিয়ভাবে সংযুক্ত হয়ে পড়েছেন; বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউব-এর ব্যবহার আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী Kagan (২০১১) এর মতে, তাঁরাই এসব সামাজিক মাধ্যমে বেশি বেশি জড়িয়ে পড়ছেন যাঁরা আর্থ-সামাজিক ও শিক্ষাদীক্ষা বিবেচনায় ভালো অবস্থানে আছেন। টিভি দেখার চেয়ে মানুষ অনলাইন কন্টেন্ট ও ইউটিউব অবিরাম ব্যবহার করতে শুরু করেছেন। McLuhan-এর কথা ‘মিডিয়াই হলো বাতার্’ ভাবনায় এনে Castellsn বলেন আজকাল ‘নেটওয়ার্কই হলো বার্তা’।
সিনেমা জগতেও শুরু থেকে এই পর্যন্ত ঘটে গেছে ব্যাপক পরিবর্তন। সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখার প্রচলন প্রায় উঠেই গেছে। টাকা খরচ করে সিনেমা দেখা শুরু হয় ফ্রান্সের প্যারিসে ১৮৯৫ সালে। যুক্তরাজ্যে ১৮৯৬ সালে স্থাপিত হয় প্রথম সিনেমা হল। কলকাতায় থিয়েটারে প্রথম বায়োস্কোপ ব্যবহৃত হয় ১৮৯০ দশকের শেষ দিকে। বাংলাদেশে শুরু হয় ১৮৯৮ সালে। সিনেমাকে ঘিরে গড়ে উঠে বিশাল বাণিজ্য। টঘঊঝঈঙ (২০০৯) এর মতে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, নাইজেরিয়া ও হংকং সিনেমার জগতে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করেছিল সবচেয়ে বেির্শ। বলিউড, হলিউড এর মতো ঢালিউড অভিধার সাথেও আমাদের পরিচয় হয়। এরপর ভিসিআর, ভিসিপি, ডিভিডি প্লেয়ার এসে সিনেমার জগতে আরও গতি সঞ্চার করে। একসময় সেলুলয়েড ফিল্মে এনালগ সিস্টেমে ছবি ও শব্দ ধারণ করে এডিট করা হতো; পরে ডিজিটাল সিস্টেমে রেকর্ড করা শুরু হয়। ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর সিনেমা নিয়ম ও অনিয়মে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপকভাবে । ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে এডিটিং ও শেয়ারিং সুযোগ বৃদ্ধি পায়; বিশেষ করে ইউটিউব—সহ মুভিসম্পর্কিত বিভিন্ন অনলাইন মুভি স্ট্রিমিং সাইট যেমন—নেটফ্লিক্স, সোলারমুভি, Yes!Movies ইত্যাদি এগিয়ে আসায় হয়ে উঠে সহজলভ্য এবং ই-কমার্সের বিষয়।
টেলিভিশন আর সিনেমা ভিন্ন উপায়ে মানুষকে ছুঁয়ে গেলো। টেলিভিশন জায়গা করে নিল গৃহে গৃহে। তাজা সংবাদ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন মেটাতে শুরু করে টেলিভিশন, যা সিনেমা পারেনি। তবে বাংলাদেশে অনেককাল প্রবল আধিপত্য বিস্তার করেছিল রেডিও। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’র ভূমিকার কথা আমরা স্মরণ করি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতায়। একসময় আমরা নির্ভর করেছি মাল্টিব্যান্ড রেডিওতে বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকা প্রচারিত বাংলা খবরে। বাংলাদেশে প্রথমে সাদাকালো, পরে শুরু হয় রঙিন টেলিভিশন । টেলিভিশন হয়ে পড়ে গৃহ-ফ্যাশন। মানুষের প্রাত্যহিকতার বিষয় হয় সম্প্রচারিত সংবাদ, সাপ্তাহিক নাটক-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান এমনকি বিচিত্র বিজ্ঞাপনও। শুধু দেখা নয়, আলাপ—আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হতে থাকে প্রদর্শিত বিষয় নিয়ে। ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ গভীরভাবে প্রভাবিত হয় টেলিভিশনে প্রচারিত বিভিন্ন প্রচারণায়। তবে টেলিভিশনের আধিপত্যে প্রিন্ট মিডিয়ার বিকাশ থেমে যায়নি। ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর তরুণরা টেলিভিশনে কম আগ্রহী হয়ে পড়েন। ডিজিটাল টেলিভিশন প্রচার শুরু করলো স্যাটেলাইট ডিস বা কেবলের মাধ্যমে। বাড়তে থাকে টেলিভিশন চ্যানেলের সংখ্যা। ইন্টারনেট সুবিধার সাথে সাথে ডিজিটাল টেলিভিশন সম্প্রচার হয়ে উঠলো সহজলভ্য।
মানুষ যেদিন থেকে সমাজবদ্ধ হলো সেদিন থেকেই সঙ্গীত মানুষের সাথী হলো; এমনকি ভাষার জটিল বিকাশের পূর্বেও সঙ্গীত ছিল মানুষের প্রধান শৈল্পিক বিনোদন। কণ্ঠের সাথে যুক্ত হলো যন্ত্র। ভারত ও চিনে পাওয়া গেল প্রাচীনতম সঙ্গীত-যন্ত্র। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সঙ্গীতের ব্যবহার সবচেয়ে পুরানো বিষয়। ব্রিটিশরা প্রথমে কলকাতায় গ্রামাফোন রেকর্ডের প্রচলন করে। পরে এলো অডিও-ক্যাসেট ও টু-ইন-ওয়ান। মানুষ বিষ্ময়ে খেয়াল করলো টু-ইন-ওয়ান এর রেকর্ড বাটনের সামর্থ্য। অল্পকাল পরে যখন লাউডস্পিকার এলো তখন রেস্টুরেন্ট, সুপারমার্কেট, বাসস্টেশসহ বিভিন্ন জনসমাগমে শুরু হলো বিচিত্র সঙ্গীতের বিচিত্র ব্যবহার। যানবাহনেও শুরু হলো সঙ্গীত শুনানোর প্রতিযোগিতা। পূজামণ্ডপও হয়ে উঠলো শব্দপ্রধান; অনেক ক্ষেত্রে সঙ্গীত রূপান্তরিত হলো কোলাহলে। আর সব মিডিয়ার মত সঙ্গীতও যুক্ত হলো ডিজিটাল বিপ্লবে। সিডি প্লেয়ার উঠে গেছে, এখন স্মার্ট ফোনেই চমৎকার সঙ্গীত শ্রবণ শুধু নয় সহজে ডাউনলোডও করা যায়। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে সঙ্গীত সামাজিক গঠনের শুধু আয়না নয় সঙ্গীত সমাজের ভবিষ্যত অবস্থারও ইঙ্গিত দেয়।
সংবাদপত্রের উন্নতি ঘটতে শুরু করে উনবিংশ শতাব্দী থেকে। ইউরোপে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সংবাদপত্র প্রকাশের প্রয়োজন বৃদ্ধি পায়। রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে মতামত বিশদভাবে প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠলো সংবাদপত্র। সংবাদপত্র আধুনিক মিডিয়ার মধ্যে অন্যতম। অল্প পরিসরে সহজেই পুনরায় তুলে ধরা যায় এরকম ভিন্ন ভিন্ন অনেক তথ্য একত্রে পত্রিকার মাধ্যমে প্রকাশ করা সম্ভব হয়। চলতি ঘটনা, পুরানো বিষয়ে নতুন ব্যাখ্যা, বিনোদন, মতামত এরকম অনেক বিষয় পাঠক অল্প ব্যয়ে দ্রুততর সময়ে পেয়ে যান। এটি পাঠ করার ক্ষেত্রেও পাঠক সুবিধা ভোগ করেন; একই পরিবারের ভিন্ন ভিন্ন পাঠক ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনে এটি পাঠ করেন নিজ গৃহে, অফিসে, বাসে, ট্রামে, ট্রেনে, নৌকোয় বহন করে। বাংলাদেশে সংবাদপত্র প্রকাশের রয়েছে ঐতিহ্যমণ্ডিত ইতিহাস। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অর্জন অব্দি সংবাদপত্রের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতা পরবতীর্ সময় থেকে আজ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাছে পত্রিকা প্রধান একটি গণমাধ্যম। টেলিভিশন চালু হওয়ার পর এর প্রভাবে কিছুটা পরিবর্তন আসে। লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন দেখা যায় ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর। পত্রিকা ও টেলিভিশন ‘সেলিব্রিটি সংস্কৃতি’র উত্থান ও বিকাশে রাখতে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। সমাজবিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘সেলিব্রেটি শিল্প’। ষাটের দশকে Daniel Boorstin বলেন ‘সেলিব্রেটি হলেন একজন ব্যক্তি, যিনি তাঁর ভালো জানার জন্য সুপরিচিত।’ বর্তমানে সেলিব্রেটি হলেন শোবিজ ও ক্রীড়াজগতের স্টাররা। নিয়মিত প্রচার প্রকাশনায় আবিভূর্ত হয়েও অনেকেই সেলিব্রেটি হয়ে উঠেন। এই সেলিব্রেটি সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আছে আগ্রহ, উচ্ছ্বাস। সেলিব্রেটি সংস্কৃতিতে সেলিব্রেটির জনপ্রিয়তাও সময়ের সাথে দ্রুত বদলায়। মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক সেলিব্রেটিরা পাঠকের কাছে ভোগ্যপণ্যের মতই ভূমিকা রাখেন। সংবাদপত্র সেলিব্রেটি-সংবাদ ব্যতীতও অনেক দেশি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের উপর পাঠকের কাছে তুলে ধরে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত ও বিচার-বিশ্লেষণ।
ডিজিটাল বিপ্লব সংবাদপত্রের শিল্পেও অভাবনীয় পরিবর্তন এনেছে। বিভিন্ন ধরণের অনলাইন নিউজ সার্ভিসে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেবা দিয়ে সংবাদপত্র শিল্প পরিবর্তিত সময়ে আবিভূর্ত হচ্ছে নতুন রূপে। QR কোড-এর ব্যবহার থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সুবিধার সংযোজনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনলাইন ভার্সানের পরও কাগজে ছাপা সংবাদপত্রের পাঠকের সংখ্যা সহসাই কমছে না। গণমাধ্যম নিয়ে অনেক তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে সদর্থক ও নঞর্থক বক্তব্য উপস্থাপিত হলেও এই পর্যবেক্ষণগুলোই শেষ কথা নয়। অনেকেই ‘media imperialism’-এর কথা বলছেন উচ্চকণ্ঠে- অর্থাৎ সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্য গড়ে উঠছে; কারণ কম উন্নত দেশগুলো ঝঁুকির মুখে, এরা এদের স্বাধীন সংস্কৃতির উৎসগুলোকে ধরে রাখতে পারবে না। ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কারণে পাশ্চাত্য প্রচারণা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাপকভাবে। এক্ষেত্রেও আন্তর্দেশীয় প্রতিযোগিতা কাজ করছে; বিশেষত দুর্যোগ, অন্যান্য সংকট ও সামরিক সংঘাত নিয়ে একপ্রকার নঞর্থক প্রভাব বিস্তারের বিষয়গুলো বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করছেন। একই সাথে অনেকে এই অবস্থায় সদর্থক সম্ভাবনাও দেখে থাকেন। তাঁরা বিশ্বায়নে (globalization) বিশ্বায়ন ও স্থানীয় শক্তির এক সংমিশ্রণে (globalization) সদর্থকতা খুঁজে পান। মিডিয়া ইমপেরিলিয়েজিম প্রতিরোধে অনেক সমস্যা ও সীমাবদ্ধতায় বিকল্প ব্যবস্থা ইনডাইমিডিয়া (indymedia) অনলাইন প্ল্যাটফরমে যাত্রা শুরু করেছে ১৯৯৯ সাল হতে। নিজেদের রিপোর্ট, ভিডিও, ইমেজ ইত্যাদি প্রচারের মাধ্যমে নিজকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। একক ব্যক্তিও চেষ্টা করছেন অনলাইনে তাঁর চিন্তা, মতামত তুলে ধরার। এক্ষেত্রে সফলতা ব্যর্থতা নির্ধারণ করবে সময়। মানুষের আর সব পরিবর্তনের সাথে মিডিয়ার ধরণ ও প্রভাবের পরিবর্তনও স্বাভাবিক; প্রযুক্তির উন্নতি ও সুবিধা মানুষ ভোগ করবেই; এর রোধ সম্ভব নয়। সার্বিক অবস্থার অনুধাবনও অত্যন্ত জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে; আগামী দিনগুলোতে মানুুষকে গবেষণা-পদ্ধতি নিয়েই হয়তো বেশি বেশি গবেষণা করতে হবে।
ভালো-মন্দ, পক্ষ-বিপক্ষ অনেক কিছু কাজ করলেও একথা সত্যি যে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বা পরিবর্তনে একক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণ নেই। প্রথাগত ও ইলেকট্রনিক পদ্ধতি পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলেও এই বিষয়টি বলা জরুরি যে, এরপরও মানুষ তাঁর মানুষতা নিয়েই থেকে যাবে। মানুষকে পুরোপুরি মেশিনে পরিণত করা যাবে না; মেশিন মানুষের জন্য, মানুষ মেশিনের জন্য নয়।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ।
বর্ষপূর্তি সংখ্যা থেকে আরো পড়ুন