প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:১৫
সংগৃহীত ছবি
বিশ্ববাজারে আগামী দুই বছরের মধ্যে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন বিনিয়োগকারীরা। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন ডলারের ওপর আস্থার সংকটের মধ্যে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার চাহিদা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা। এরই মধ্যে গত সেপ্টেম্বরে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সোনা কেনার পরিমাণ প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার বিশ্ববাজারে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ২ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭৫ ডলারে নেমে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে, এমন প্রত্যাশায় দাম কমে। তবে কয়েকজন তহবিল ব্যবস্থাপক মনে করছেন, এ পতনের পর সোনার দাম আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ কেনার পরিমাণ প্রায় ৬৩ টনে পৌঁছেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর কোনো এক মাসে সোনা কেনার এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব তৈরি করেছে সংস্থাটি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ট্রয় আউন্স সোনার দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলারের বেশি উঠে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড গড়েছিল। এরপর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও ঐতিহাসিকভাবে উচ্চ অবস্থানে রয়েছে মূল্যবান এই ধাতু।
বিনিয়োগকারীদের মতে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক ও আর্থিক বাজারের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি ঋণের বোঝা বাড়ার কারণে সোনার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব পরিস্থিতি সোনার দামকে ঊর্ধ্বমুখী রাখতে পারে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমস আয়োজিত মূল্যবান ধাতুবিষয়ক এক সম্মেলনে ট্রয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের তহবিল ব্যবস্থাপক শার্লট ইয়ং বলেন, আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে সোনার দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
তিনি বলেন, সরকারি অর্থব্যবস্থার অবনতিশীল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সোনা কার্যকর সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ দ্রুত বাড়ছে। আবার অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিলে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নতুন করে অর্থ সরবরাহ বাড়াতে পারে। কিন্তু কাগুজে মুদ্রার মতো সোনা ইচ্ছামতো তৈরি করা যায় না।
অয়ন ইনভেস্টমেন্টসের ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলের প্রতিনিধি প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা পল কার্নও আগামী দুই বছরের মধ্যে সোনার দাম নতুন রেকর্ডে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দিয়েছেন।
তার মতে, ডলারকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলে বিভিন্ন দেশ ও বিনিয়োগকারী এর বিকল্প খুঁজতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সোনা গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
স্বর্ণখনি প্রতিষ্ঠান অ্যালায়েড গোল্ডের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী পিটার মারোনে বলেন, বিশ্ব কি নতুন কোনো আর্থিক সংকটের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে, তা বিনিয়োগকারীদের বিবেচনা করা উচিত।
তার ভাষ্য, বিশ্ব অর্থনীতি একটি বড় আর্থিক ঘটনার দ্বারপ্রান্তে থাকতে পারে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বিভিন্ন পারিবারিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সরকারি বন্ড থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে সোনার দিকে ঝুঁকছে।
স্বর্ণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এন্ডেভার মাইনিংয়ের প্রধান নির্বাহী ইয়ান ককারিল বলেন, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রচলিত মুদ্রার ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং নিজস্ব মুদ্রার মূল্য রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর উদ্বেগ সোনার দামের পক্ষে শক্তিশালী ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ডলারকে সর্বনিম্ন সীমা হিসেবে ধরে রাখা যাবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে তার ধারণা, সোনার দামের পরবর্তী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার আগে এ স্তরের কাছাকাছি দাম থাকতে পারে।
স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের পণ্যবাজারবিষয়ক গবেষণা বিভাগের বৈশ্বিক প্রধান সুকি কুপার বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনার চাহিদা এখনো শক্তিশালী। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরুর পর কিছু দেশ অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজনে সোনা বিক্রিও করেছে।
শার্লট ইয়ংয়ের মতে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মার্কিন ডলারের বিকল্প রিজার্ভ মুদ্রা খুঁজছে। এ ক্ষেত্রে ইউরো বা ইয়েনের তুলনায় সোনার প্রতি তাদের আগ্রহ বেশি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা কমলে এবং বিকল্প সম্পদের চাহিদা বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো আবারও সোনা কেনা বাড়াতে পারে।
বিশ্ব গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পিপলস ব্যাংক অব চায়না সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও সোনার মজুত বাড়িয়েছে। দেশটির মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সোনার অংশ এখন প্রায় ৯ শতাংশ। পরিমাণের হিসাবে চীনের সোনার মজুত প্রায় ২ হাজার ৪১০ টন।
সূত্র যুগান্তর .কম
আন্তর্জাতিক থেকে আরো পড়ুন