প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:০৭
হিন্দু ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রধান ধর্মীয় আচার দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। শরতের শেষ ক্ষণে নির্মল প্রকৃতি, শুভ্রনীল আকাশ ও সাদা কাশ ফুলের আবহে সনাতনীরা এখন ভক্তি ও পবিত্রতা সহযোগে মাতৃবন্দনায় নিয়োজিত। গত শুক্রবার ষষ্ঠী বিহিত পূজার মধ্য দিয়ে দুর্গা পূজা শুরু, বুধবার দশমী তিথিতে দেবী প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিষাদঘন পরিবেশে শেষ হবে দেবিবন্দনাপর্ব। এই কয়দিন মণ্ডপে মণ্ডপে পূজাচার, সম্মিলন, বেড়ানো, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে আনন্দমুখর সময় কাটাবেন হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। দুর্গাপূজা বাঙালি সমাজে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সাথে সর্বজনের এক আনন্দ উপলক্ষে পরিণত হয়েছে। পূজা উপলক্ষে পূজার এলাকাগুলো সেজেছে বর্ণিল সাজে। আলোকসজ্জ্বা. মণ্ডপ সজ্জ্বিতকরণ, দেবী প্রতিমার শিল্পশোভন অবয়ব, ঢাক—ঢোল, কাঁসর—ঘণ্টার ঐকতান, মানুষের কলতান প্রভৃতি মিলিয়ে পূজার এই কয়দিন উৎসবের আমেজে ভরপুর থাকবে কিছু এলাকা। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ^াস মতে, অশুভ শক্তির বিনাস সাধন করে শুভশক্তির প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতেই দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটেছিলো। দশভুজা দেবীর সৃজন হয়েছিলো দেবতাদের সম্মিলিত তেজ ও শক্তি সহকারে। পুরাণমতে মহিশাসুর নামক এক প্রচণ্ড শক্তিধর দৈত্যের কবল থেকে দেবকূলকে রক্ষা করতেই তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন। অসুর তথা অশুভ নাশের মধ্য দিয়ে শুভশক্তিকে রক্ষার প্রতীক হিসেবে হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা দেবী দুর্গাকে আরাধনা করেন। সেই মহাতেজস্বী দেবী দুর্গাই আবার আটপৌঢ়ে মানুষের কাছে মাতৃস্বরূপা। মা যেমন নিজের সবকিছু দিয়ে সন্তানদের রক্ষা করেন, হিন্দুরাও বিশ^াস করেন দেবী দুর্গা এ—ভাবেই সকলকে রক্ষা করে থাকেন। ধর্মীয় বিশ^াস মতে আশি^ন মাসের শুক্লপক্ষের প্রথম দিন থেকে পরবর্তী ১৫ দিন দেবীপক্ষ বলে পরিচিত। কৃষ্ণপক্ষের শেষ দিবস যে দিনকে মহালয়া হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় সেই দিনই নাকি দেবী দুর্গা স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যলোকে রওয়ানা হন। দশমী তিথিতে দেবী মর্ত্যলোক ছেড়ে আবারও স্বর্গলোকের উদ্দেশ্যে প্রত্যাগমন করেন। দেবীর এই আগমনকে বাঙালি হিন্দুরা কন্যার পিত্রালয়ে আগমনের সাথে তুলনা করেন। এই জায়গায় দেবী দুর্গা হয়ে গেছেন কন্যাস্বরূপা। কন্যা পিতৃগৃহে আসলে যেরূপ আনন্দ তৈরি হয় দেবীর আগমনেও মর্ত্যধামে অনুরূপ আনন্দ সঞ্চরিত হয়। প্রধানত সর্বজনীন আয়োজন ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই মণ্ডপে মণ্ডপে দেবী দুর্গা পূজিত হন। কিছু পূজা সম্পন্ন ব্যক্তিরা ব্যক্তিগতভাবেও করে থাকেন। তবে দুর্গা পূজার সাধারণ বৈশিষ্ট্য হলো সর্বজনীন আয়োজন। এই সর্বজনীন আয়োজনই দুর্গা পূজাকে হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য ধর্মীয় ভক্তির সাথে ভেদাভেদহীন সামাজিক সম্মিলন ও উৎসবের মর্যাদা দান করেছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের তথ্য অনুসারে এ বছর সুনামগঞ্জ জেলায় মোট ৪৪৪ টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই সংখ্যাটি গত বছরের (২০২৫) তুলনায় ২০ টি বেশি। অর্থাৎ গত বছরের চাইতে এবার পূজার সংখ্যা বেড়েছে। সরকার ও প্রশাসন থেকে নিরাপত্তা ব্যবস্থাদি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। আমাদের দেশে সর্বধর্মের লোকজনের সহবস্থানের অতীত ইতিহাস সমৃদ্ধ। সম্প্রীতিময় সহবস্থানের সুনাম আমাদের জাতিগত গর্বের বিষয়। মাঝে—মধ্যে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা সম্প্রীতির এই পরিবেশকে কলুষিত করলেও সার্বিকভাবে এখনও বাংলাদেশের পরিচয় উদ্ভাসিত হয় পারষ্পরিক শান্তিপূর্ণ সহবস্থান, আন্ত—ধর্মীয় ঐক্য—সংহতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ দ্বারা। এই সংহতিই আমাদের মূল শক্তি, এগিয়ে যাওয়ার দুর্বার অনুপ্রেরণা। আমরা আশা করি শারোদৎসবটি প্রকৃতির নির্মল আবহের সাথে সাযুজ্য রেখে সুন্দর ও নির্বিঘ্নে সমাপ্তি ঘটবে। মণ্ডপে মণ্ডপে হিন্দু—সম্প্রদায় দেশ, জাতি ও সকল মানুষের মঙ্গলের জন্য দেবীর কৃপা প্রার্থনা করবেন। বর্তমান ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও যুদ্ধমাতাল বিশে^ শান্তির বাতাবরণ প্রতিষ্ঠার জন্য দেবীর কাছে মিনতি করবেন। যুদ্ধ, হিংসা, বৈষম্য, অত্যাচার, শোষণ প্রভৃতি মানব—সমাজের স্বাভাবিক বিকাশকে যুগে যুগে বাধাগ্রস্ত করেছে। আমাদের বর্তমান সময়ও এর ব্যতিক্রম নয়। এই সময়ের খারাপ উপসর্গকে জয় করেই সকলকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। মানুষের সহজাত ক্ষমতাই হলো বিরূপ পরিস্থিতিকে জয় করে বিকাশের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আজ যে অশুভ শক্তি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানুষের শান্তি হরণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে; সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে শান্তিকামী বিশ^বাসীর সৃদৃঢ় মানসিক ঐক্য স্থাপন অতীব জরুরি। এই ঐক্য ও সংযোগ আমাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে। সকলকে এক সুতোয় বেঁধে রাখতে সহায়ক হবে। শান্তি স্থাপনের মহান বার্তা দিকে দিকে ছড়িয়ে দিতে আসুন আমরা মানবতা ও বিকাশের পতাকাকে আরও শক্তভাবে ধরে রাখি।
হিন্দু সম্প্রদায়ের সকলকে দুর্গা পূজা উপলক্ষে প্রীতি ও শুভেচ্ছা। শারদোৎসবের নির্মল আনন্দে পূর্ণ হোক ধরণী।
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন