প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৫৫
সংগৃহীত ছবি
নিজের পৈতৃক সম্পত্তি নামজারি করতে গিয়ে বণ্টননামা দলিলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তিতে পড়েন অনেক উত্তরাধিকারী। বিশেষ করে, বাবা-মা বা পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া জমির একাধিক ওয়ারিশ থাকলে জমির মালিকানা রেকর্ড হালনাগাদ করা নিয়ে নানা জটিলতা দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে বণ্টননামা দলিল ছাড়াই পৈতৃক জমির নামজারি করা যায় কিনা, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিল সব পরিস্থিতিতে বাধ্যতামূলক নয়। তবে বণ্টননামা ছাড়া নামজারি করা যাবে কিনা, তা নির্ভর করে জমির ধরন, উত্তরাধিকারীদের মালিকানার অবস্থা, নামজারির আবেদন এবং প্রযোজ্য ভূমি আইন ও সরকারি নির্দেশনার ওপর। তাই বিষয়টি বুঝে আবেদন করা জরুরি।
নামজারি কী এবং কেন প্রয়োজন?
নামজারি বা মিউটেশন হলো জমির মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের নাম অন্তর্ভুক্ত বা হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার রেখে যাওয়া জমির মালিকানা আইন অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের কাছে যায়। এরপর উত্তরাধিকারীদের নামে ভূমি রেকর্ড হালনাগাদ করার প্রয়োজন হতে পারে।
নামজারি সম্পন্ন হলে ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান এবং জমিসংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হয়। তবে মনে রাখতে হবে, নামজারি নিজে মালিকানা সৃষ্টির চূড়ান্ত প্রমাণ নয়; জমির মালিকানা নির্ধারণে দলিল, উত্তরাধিকার, রেকর্ড ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচ্য।
বণ্টননামা দলিল ছাড়াই নামজারি সম্ভব?
পৈতৃক জমির একাধিক উত্তরাধিকারী থাকলে জমিতে তাদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অংশ থাকতে পারে। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি আনুষ্ঠানিকভাবে ভাগ না হলেও তাদের আইনগত অংশের ভিত্তিতে যৌথ মালিকানা থাকতে পারে।
এ ধরনের ক্ষেত্রে সব পরিস্থিতিতে আগে বণ্টননামা দলিল করে তারপর নামজারি করতে হবে—এমন নয়। প্রযোজ্য নিয়ম ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পূরণ সাপেক্ষে উত্তরাধিকারীদের যৌথ নামে নামজারির সুযোগ থাকতে পারে।
অন্যদিকে, কোনো ওয়ারিশ যদি উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নির্দিষ্ট আলাদা অংশ নিজের নামে পৃথকভাবে নামজারি করতে চান, সে ক্ষেত্রে জমি বণ্টনের প্রমাণ এবং প্রযোজ্য বিধান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষত, কে কোন দাগের কতটুকু জমি পেয়েছেন, তা নিয়ে বিরোধ বা অস্পষ্টতা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইতে পারে।
সুতরাং, বণ্টননামা ছাড়া নামজারির সুযোগ থাকা এবং প্রত্যেক ওয়ারিশের পছন্দমতো পৃথক জমিখণ্ডের নামজারি করা—দুটি এক বিষয় নয়।
পৈতৃক জমির নামজারি করতে যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
১. মৃত ব্যক্তির মৃত্যু সনদ।
২. ওয়ারিশ সনদ বা উত্তরাধিকারীদের পরিচয় ও সম্পর্কের প্রমাণ।
৩. সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান ও দাগসংক্রান্ত তথ্য।
৪. পূর্ববর্তী মালিকানার দলিল বা মালিকানার পক্ষে প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র।
৫. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য।
৬. ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের প্রাসঙ্গিক তথ্য বা দাখিলা, যেখানে প্রয়োজন।
৭. জমি বণ্টন করা হয়ে থাকলে বণ্টননামা দলিল বা বণ্টনসংক্রান্ত অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।
তবে সব আবেদনে একই তালিকার প্রতিটি কাগজ বাধ্যতামূলক নয়। জমির রেকর্ড, মালিকানার ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের যাচাই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভিন্ন হতে পারে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় কী বলা হয়েছে?
ভূমি মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত জমি বা স্থাবর সম্পত্তির নামজারি বিষয়ে একটি পরিপত্র জারি করে। এতে উত্তরাধিকারীদের যৌথ নামজারি এবং পৃথক খতিয়ান তৈরির প্রক্রিয়া স্পষ্ট করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, মৃত ব্যক্তির সব ওয়ারিশের নাম একটি খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করে যৌথ নামজারি করার ক্ষেত্রে বণ্টননামা দলিল না থাকার অজুহাতে আবেদন নামঞ্জুর করা যাবে না।
অর্থাৎ, উত্তরাধিকারীরা যদি তাদের প্রাপ্য হিস্যা অনুযায়ী যৌথভাবে জমির রেকর্ড হালনাগাদ করতে চান, তাহলে কেবল বণ্টননামা দলিল নেই—এই কারণে তাদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে ওয়ারিশ সনদসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে হবে।
নামজারির দুটি পদ্ধতি: যৌথ ও পৃথক
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি করতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে, ওয়ারিশরা যৌথ মালিকানা বজায় রাখতে চান, নাকি নিজেদের অংশ আলাদা করতে চান।
১. যৌথ নামজারি
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মৃত্যুর আগে ৬০ শতক জমি রেখে গেছেন। তার আইনগত ওয়ারিশ তিনজন। তারা এখনো নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করেননি।
এ অবস্থায় সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যৌথ নামজারির আবেদন করা যেতে পারে। প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা রেকর্ডে উল্লেখ করা হবে। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক নয়।
তবে উদাহরণে তিনজন ওয়ারিশের প্রত্যেকের সমান অংশ রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। প্রকৃত হিস্যা নির্ধারিত হবে প্রযোজ্য উত্তরাধিকার আইন ও পারিবারিক পরিস্থিতি অনুযায়ী।
২. পৃথক নামজারি
ওয়ারিশরা যদি নিজেদের মধ্যে জমি ভাগ করে নিয়ে প্রত্যেকের নামে আলাদা খতিয়ান করতে চান, তাহলে নিবন্ধিত বণ্টননামা দলিল প্রয়োজন হবে। আইন অনুযায়ী জমাভাগের মাধ্যমে পৃথক খতিয়ান সৃষ্টির ক্ষেত্রে এই দলিল গুরুত্বপূর্ণ।
আবেদন করবেন যেভাবে
পৈতৃক জমির নামজারি করতে আগ্রহী ওয়ারিশদের প্রথমে সংশ্লিষ্ট জমির পূর্ববর্তী খতিয়ান, মালিকানার কাগজপত্র এবং উত্তরাধিকারীদের তালিকা সংগ্রহ করতে হবে। এরপর তারা যৌথ নামজারি করবেন, নাকি জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান করবেন, তা নির্ধারণ করতে হবে।
যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সিটি করপোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে। আবেদন যাচাইয়ের সময় ভূমি অফিস মালিকানার ধারাবাহিকতা, ওয়ারিশদের পরিচয় এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা পরীক্ষা করতে পারে।
আবেদনের আগে সরকারি ভূমিসেবা পোর্টাল land.gov.bd থেকে প্রাসঙ্গিক সেবা ও নির্দেশনা দেখে নেওয়া যেতে পারে। জমির পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত নথিও প্রয়োজন হতে পারে।
কোনো ওয়ারিশ বাদ পড়লে কী হবে?
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারির ক্ষেত্রে সব প্রকৃত ওয়ারিশের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ওয়ারিশকে বাদ দিয়ে অন্যদের নামে জমির রেকর্ড করার চেষ্টা করলে বিরোধ ও আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে।
তাই আবেদন করার আগে সব ওয়ারিশের নাম, পরিচয় এবং আইনগত হিস্যা যাচাই করা উচিত। কোনো ওয়ারিশের আপত্তি বা মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। প্রয়োজন হলে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
নামজারি হলেই কী জমির চূড়ান্ত মালিকানা নিশ্চিত হয়?
নামজারির ক্ষেত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভূমি রেকর্ড হালনাগাদের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। নামজারি সম্পন্ন হওয়া মানেই সব ধরনের মালিকানা বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে যাওয়া নয়।
জমির মালিকানা নির্ধারণে মূল দলিল, উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত অধিকার, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বিরোধ থাকলে তা প্রযোজ্য আইন ও উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হতে পারে।
সাধারণ মানুষের জন্য কী সুবিধা?
বণ্টননামা দলিল ছাড়াই যৌথ নামজারির সুযোগ থাকায় উত্তরাধিকারীদের প্রাথমিকভাবে সরকারি রেকর্ডে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। এতে বণ্টননামা তৈরি না হওয়া পর্যন্ত নামজারি স্থগিত রাখার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে এড়ানো সম্ভব।
একই সঙ্গে সব ওয়ারিশের নাম এবং তাদের প্রাপ্য হিস্যা রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত হলে জমির প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের পরিচয় স্পষ্ট হয়। ফলে কোনো একজন ওয়ারিশের এককভাবে পুরো সম্পত্তি নিজের নামে রেকর্ড করানোর ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে।
তবে যৌথ নামজারি ও পৃথক খতিয়ান তৈরির নিয়ম এক নয়। জমির ভাগ-বণ্টন, মালিকানা কিংবা উত্তরাধিকার নিয়ে জটিলতা থাকলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
মোদ্দাকথা, পৈতৃক জমির নামজারি করতে বণ্টননামা দলিল সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয়। সব ওয়ারিশের নামে যৌথ নামজারির ক্ষেত্রে বণ্টননামা ছাড়াই আবেদন করা যায়; কিন্তু জমি ভাগ করে পৃথক খতিয়ান তৈরি করতে নিবন্ধিত বণ্টননামা প্রয়োজন।
সূত্র: যুগান্তর.কম
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন