প্রকাশিত: ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১২:৪১
সংগৃহীত ছবি
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ ছাড় দিয়েছে সরকার। নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমিত দরপত্রে কেনাকাটার সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে তিন পক্ষের চুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ চুরি, ক্ষতিসাধন ও অবৈধ সংযোগের জন্যও শাস্তির বিধান রয়েছে।
গত ১৯ অক্টোবর ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। ওই দিন থেকেই এটি কার্যকর হয়েছে।
অধ্যাদেশে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি কোম্পানি এবং বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। ভবনের ছাদ, আঙিনা, সংলগ্ন অব্যবহৃত জমি ও জলাশয় এবং চা বাগানে এ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। এর আওতায় রয়েছে সৌরচালিত সেচপাম্প, হিমাগার, বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জ কেন্দ্র, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ও কৃষিকাজের সঙ্গে সমন্বিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা। প্রতিটি ব্যবস্থার উৎপাদনক্ষমতা সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট হতে পারবে। তবে বড় ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র এ অধ্যাদেশের আওতায় পড়বে না।
বেসরকারি বিনিয়োগে অগ্রাধিকার
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে দুটি পদ্ধতি রাখা হয়েছে। প্রথমটিতে বেসরকারি বিনিয়োগকারী নিজের অর্থে ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন। উৎপাদিত বিদ্যুতের বণ্টন ও মূল্য চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। ফলে গ্রাহককে শুরুতেই পুরো প্রকল্পের খরচ বহন করতে হবে না।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনা করবে এবং মালিকানা নিজের কাছে রাখবে। নিজস্ব তহবিল বা নিয়মিত আয় রয়েছে—এমন প্রতিষ্ঠান এ পদ্ধতি বেছে নিতে পারবে।
জেলাভিত্তিক যোগ্য সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সেবাদাতা নির্বাচন করা যাবে। তালিকার বাইরের প্রতিষ্ঠানকেও উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত সীমিত দরপত্র
নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ক্ষেত্রে পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা কেনায় সীমিত দরপত্র ব্যবহার করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি অনলাইন ক্রয়ব্যবস্থা ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। চুক্তি অনুমোদন করবেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এক ধাপ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। চুক্তির মেয়াদ সরকার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারণ করবে।
গ্রাহক, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে তিন পক্ষের চুক্তি করতে হবে। এতে বিদ্যুতের বণ্টন, গ্রাহকের ন্যূনতম প্রাপ্য, অতিরিক্ত বিদ্যুতের মূল্য, বিল পরিশোধ, রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রপাতির মান ও নিরাপত্তা, যন্ত্রাংশ বদল, চুক্তি বাতিল এবং বিরোধ নিষ্পত্তির শর্ত থাকবে। ব্যবহারের অনুপযোগী যন্ত্রপাতি ফেরত নেওয়া ও বর্জ্য নিরাপদে অপসারণের ব্যবস্থাও চুক্তিতে উল্লেখ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় পরিষদ
সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রমের নীতিগত দিকনির্দেশনা ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জাতীয় নীতিনির্ধারণী পরিষদ গঠনের বিধান রয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। উপজেলা কমিটি প্রতি মাসে জেলা কমিটিতে এবং জেলা কমিটি প্রতি তিন মাসে জাতীয় পরিষদে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ ও সেগুলোর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করবে।
চুরি ও ক্ষতিসাধনে শাস্তি
সৌরবিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরি কিংবা চোরাই যন্ত্রাংশ কেনাবেচা ও হেফাজতে রাখার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধনে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। লিখিত অনুমতি ছাড়া অবৈধ সংযোগ দেওয়া এবং স্থাপন, পরিদর্শন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের বাধা দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অপরাধে সহায়তা, ষড়যন্ত্র বা প্ররোচনার জন্যও শাস্তি হতে পারে। এসব অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির বা মহানগর ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হবে। মোবাইল কোর্ট আইনের তপশিলভুক্ত অপরাধের বিচার ভ্রাম্যমাণ আদালতেও করা যাবে।
দেশে সৌরবিদ্যুতের বর্তমান অবস্থা
স্রেডার প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, দেশে সৌরবিদ্যুতের মোট উৎপাদনক্ষমতা প্রায় এক হাজার ৮৫২ মেগাওয়াট। এর মধ্যে প্রায় এক হাজার ৪৭৪ মেগাওয়াট জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বাকি প্রায় ৩৭৯ মেগাওয়াট গ্রিডের বাইরে ব্যবহৃত হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান উৎস সৌরবিদ্যুৎ হলেও দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার তুলনায় এর অংশ এখনও সীমিত।
সরকারি হিসাবে, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের উৎপাদনক্ষমতা ছিল প্রায় ৪১৮ মেগাওয়াট। ছোট ছোট স্থাপনাসহ হিসাব করলে এ সক্ষমতা আরও বেশি হতে পারে। ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আলাদা জমির প্রয়োজন হয় না। ফলে বাড়ি, কারখানা ও বাণিজ্যিক ভবনের অব্যবহৃত জায়গা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
প্রণোদনা ও সম্প্রসারণের লক্ষ্য
ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে সরকার। ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে নিজস্ব চাহিদা মেটানোর পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে নির্দিষ্ট শর্তে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা পাওয়া যাবে। এ সুবিধার জন্য ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। যোগ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এ মূল্য ২০৩০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০ সালের মধ্যে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে পাঁচ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট এবং বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চার হাজার ৫০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতা অর্জন। এ লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় সংযোগ ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের বাধা দূর করতে হবে। নতুন অধ্যাদেশে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কেনাকাটার প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি চুক্তি, তদারকি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, বিদ্যুতের চাহিদা মেটানো ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসার জরুরি। প্রতি ইউনিট চার থেকে চার টাকা ১৫ পয়সা ব্যয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হলে এটি তুলনামূলক সাশ্রয়ী বিদ্যুতের উৎস হতে পারে। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে যন্ত্রপাতি কেনা ও প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগের বাধা, অনিয়ম ও অপচয় দূর করে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সূত্র: সমকাল .কম
এমডি
জাতীয় থেকে আরো পড়ুন