কেন এই হামলা-ভাঙচুর?

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬ ২৩:৪৪

শাল্লা উপজেলায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী দুলাল মিয়ার বাড়ি—দোকানে হামলা—ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনায় ৩৩ জনের নামোল্লেখ করে শাল্লায় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। রবিবার বিকালে দুলাল মিয়ার মেয়ে ফরিদা খাতুন উজ্জ্বলা বাদী হয়ে এই অভিযোগ করেন। অন্যদিকে অভিযুক্তরা রবিবার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেছেন, তারা মাদক বিক্রেতার বাড়ি ভাংচুর করেছেন। থানার ওসি মোহাম্মদ সোহেল জানালেন, উজ্জ্বলার অভিযোগ গ্রহণ করে যাচাই করা হচ্ছে।

 


গেল বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে উজ্জ্বলার বাড়িতে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর ওই পরিবারের সদস্যরা মানবেতরভাবে দিন কাটাচ্ছেন। রবিবার স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা ওখানে সরেজমিনে গিয়ে দেখেছেন, উজ্জ্বলার পরিবারে ১৫ জনেরও বেশি সদস্য রয়েছেন। বসতঘর, রান্নাঘর, ল্যাট্রিন, টিউবওয়েলের বিদ্যুৎ সংযোগ, মোটরের পানির সংযোগ সবই ভেঙে উপড়ে ফেলায় এরা ভীষণ কষ্টে পড়েছেন। ঘটনার তিনদিন পার হলেও এখনো ঘর ঘুচাতে পারে নি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার। ঘরের সকল আসবাবপত্র ভাংচুর করা হয়েছে। লেপ—তোষক কেটে টুকরো টুকরো করা হয়েছে। আইপিএস, টিভি, ফ্রিজ, ফ্যান লুটপাট ও ভাংচুর করা হয়েছে।

 


এই ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেবার সময় উজ্জ্বলা এই প্রতিবেদককে বললেন, ২৫ বছরের গড়া সংসার তছনছ করে দিয়েছে অন্যপক্ষ। ১৯ জনের পরিবার তার। এখন  ব্যবহার করার কিছুই নেই। দুটি ফ্রিজ, ৪৩ ইঞ্চি এলইডি টিভি, দুটি আইপিএসের ব্যাটারিসহ সবকিছুই নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সিলিং ফ্যান, দুটি পানির মোটর, ডিপ টিউবওয়েলের উপরের অংশ, কাঠের ওয়ার ড্রপ, ফাইল কেবিনেট, ডায়নিং টেবিল, চেয়ার, পড়ার টেবিল, পাঁচ ভরি সোনা, নগদ টাকাসহ কিছুই নেই। ৪০ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে তার পরিবারে। তিনি ৩৩ জনের নামোল্লেখ করে ৭০/৮০ জন অজ্ঞাত দিয়ে মামলা দায়ের করতে শাল্লা থানায় এসেছেন।
উজ্জ্বলা জানালেন, মেয়ের এসএসসি টেস্ট পরীক্ষা ছিল রবিবার থেকে। পড়নের ড্রেস নেই। সকালে পাশের গ্রামের বিধান বিশ^াস ড্রেস এনে দিয়েছে। গোবিন্দনগরের দাস হাটি ও উজানগাঁওয়ের লোকজন খাবার—দাবার দিয়ে গেছে তাদেরকে। এখনো চুলোয় আগুন জ¦ালানো হয় নি বলে জানালেন তিনি।
উজ্জ্বলা বললেন, হামলা—লুটপাট—ভাংচুরের পর আমার পরিবারের বিরুদ্ধে মাদক বিক্রির অভিযোগ আনা হচ্ছে। অথচ. হামলাকারী জহিরুল ইসলাম ৪৬ কেজি ও হারুনুর রশিদ ভূইয়া ১০ কেজি গাঁজাসহ পুলিশের কাছে আটক হয়েছিল। তাদের বিরুদ্ধে থানায় মাদক বিক্রয়ের মামলা আছে। তিনি জানালেন, গর্ভবতী মহিলাকে নির্যাতন করেছে তারা। তিনি তার মেয়েকে নিয়ে দূরের একটি বাথরুমে ঢুকে জীবন বাঁচিয়েছেন। 

 


সরেজমিনে ঘুরে দেখার সময় স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীরা জানতে পারেন, গ্রামের পাশের দৌলতপুর অটোস্ট্যান্ডে উজ্জলার একটি দোকান রয়েছে। স¤প্রতি ওই দোকানে চুরির ঘটনা ঘটেছিল। এ ঘটনায় স্থানীয় মাদকবিরোধী ঐক্য পরিষদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে থানায় চুরির মামলা করেন উজ্জ্বলা। আবার মাদক বিরোধী ঐক্য পরিষদ উজ্জ্বলা মাদক বিক্রি করেন দাবি করে, মাদক বিক্রি বন্ধের শর্তে উজ্জ্বলার কাছ থেকে মুচলেকা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। 
উজ্জ্বলা এই অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে, মুছলেকা দিতে রাজি হন নি বলে জানিয়েছেন অনেকে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে বলে কেউ কেউ দাবি করেছেন। 

 


তবে হামলার ঘটনার ভিন্ন কারণ দাবি করেছেন উজ্জ্বলা। তাঁর দাবি, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর দাদা মাহমুদ আলী শহীদ হন এবং আপন ফুফু জমিলা খাতুন গেজেটভুক্ত বীরাঙ্গনা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী। এ কারণে যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি আব্দুল হেকিম মোড়ল, জোবায়ের মনির সহ অন্যান্য আসামির লোকজনের নির্দেশে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়েছে। 

 


উজ্জ্বলা বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে দোকান ব্যবসা করে আসছি। ২০২৪ সালের পাঁচ আগস্টের পর থেকে উল্লেখিত ব্যক্তিরা আমার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছেন। চাঁদা না দেওয়ায় বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়েছে। আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন এবং ফুফু যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী। এ কারণেই মূলত আমার বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও গরু লুটপাট করা হয়েছে। ১২টি গরুর মধ্যে ছয়টি নিয়ে গেছে এবং বাকি ছয়টি দাউদপুরের এক ব্যক্তির বাড়িতে জিম্মায় রাখা হয়েছে।

 


তবে উজ্জলার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আব্দুল হেকিম মোড়ল। তিনি বলেন, উত্তেজিত জনতা উজ্জ্বলার বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করেছে, এটা সত্য। তবে যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী হওয়ার কারণে হামলা হয়েছে, এমন অভিযোগ সঠিক নয়। উজ্জলা, তাঁর ভাই ও স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছে। আবার আমাদের নামেও চুরির মামলা দিয়েছে।

 


মাদকবিরোধী ঐক্য পরিষদের নেতা শাহীন আল কাউসার বলেন, মাদক বিক্রি করতে নিষেধ না মানাতেই এ ঘটনা ঘটেছে। এখন ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের স্যালুট করি। মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে বলেই আমরা স্বাধীন দেশে বসবাস করছি। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী হওয়ার কারণে এ হামলা হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়।

 


স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শাহজালাল মিয়া বলেন, উজ্জ্বলার বিরুদ্ধে মাদক বিক্রয়ের অভিযোগে মামলা আছে। সম্প্রতি উজ্জ্বলার দোকান চুরি হয়। চুরির ঘটনায় সে মামলা দায়ের করে। তাতে মাদক নিয়ন্ত্রণ কমিটির ১৫ জনকে আসামি করে। এলাকাবাসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, বিষয়টি শুক্রবার তিন গ্রামের বিশিষ্টজনেরা উজ্জ্বলাকে জিজ্ঞেস করবেন। এর আগেই বৃহস্পতিবার রাতে উজ্জ্বলার বাড়িতে হামলা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেও হামলা ঠেকাতে পারি নি।
শাল্লা থানার ওসি মোহাম্মদ মোহাম্মদ সোহেল আহমদ বলেন, উজ্জ্বলা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। যাচাই—বাছাই করে মামলা নেওয়া হবে।
পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন বলেছেন, উজ্জ্বলা, তার ভাই  সাদ্দাম মিয়া ও তার স্বামী হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এর আগে থানায় মামলা আছে। তবে আইন কেউ নিজের হাতে নিয়ে কারো বাড়ি—ঘর লুটপাট—ভাংচুর করতে পারেন না।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার