প্রকাশিত: ৩০ আগস্ট, ২০২৫ ২২:৪০
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা—কর্মচারীরা যাতে বাসের অবস্থান জানতে পারে সেই লক্ষকে সামনে রেখে দেশে প্রথমবারের মতো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জিপিএস ট্রাকিংয়ের অন্তর্ভুক্ত পরিবহন সেবা চালু করার পরিকল্পনা করেছিলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)। পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধানের অভাবে বর্তমানে বন্ধ হয়ে আছে এই প্রকল্পটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের কর্মকর্তা—কর্মচারীদের যাতায়াতের জন্য পরিবহন সেবা থাকলেও অনেক সময় ট্রাফিক জ্যাম, যান্ত্রিক ত্রুটি সহ নানান কারণে বাসের সময়ের তারতম্য হয়। এতে করে বাসের সঠিক অবস্থান সম্পর্কে জানতে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। সময়ের তারতম্য হলে অনেকসময় বাসের স্টপেজে অপেক্ষারত অবস্থায় সেটি আসবে নাকি ইতোমধ্যে পার হয়ে চলে গেছে তা নিয়ে দ্বিধা ধন্দে ভুগতে হয়। এ সমস্যা থেকে পরিত্রাণের জন্যই শাবিপ্রবির তৎকালীন প্রশাসনের উদ্যোগে বাসে জিপিএস ট্রেকিংয়ের পরিকল্পনা করে। তৎকালীন সময়ে ‘মাই সাস্ট’ নামের এই সেবা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বলে জানিয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন প্রশাসন। এটা নিয়ে গত বছরের ৭ জানুয়ারি “হাতের মুঠোয় পরিবহন সেবা” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। কিন্তু দীর্ঘ দেড় বছরেও এই প্রকল্প সম্পূর্ণরূপে আসেনি। ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে অধিকাংশ ট্রেকিং ডিভাইস। চুক্তিবদ্ধ কোম্পানির সাথেও আর যোগাযোগ নেই বর্তমান প্রশাসনের। এতে করে অকেজো অবস্থায় পরে আছে ডিভাইসগুলো।
পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়ে আবার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়ছে জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নুর মোহাম্মদ আশিক বলেন, গতবছর পরীক্ষামূলকভাবে মাই সাস্ট অ্যাপ চালুর সময় বাস ট্র্যাকিং ফিচারটি ছিল আমাদের জন্য আশীর্বাদের মতো। এতে টিউশন শেষে সহজেই জানতে পারতাম বাস কোথায় আছে, কতক্ষণে আসবে। এখন ফিচারটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের ভোগান্তি বাড়ছে। যদি এটি আবার চালু করা যায়, আর এর সঙ্গে একটি চ্যাটবট যুক্ত হয়—যেখানে প্রশ্ন করলেই বাসের বর্তমান অবস্থান জানা যাবে— তাহলে শিক্ষার্থীরা আরও উপকৃত হবে। ট্রাফিক জ্যামের কারণে বাস দেরি হলেও আগে থেকেই খবর পেলে স্টপেজে দাঁড়িয়ে অযথা সময় নষ্ট করতে হবে না। আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের সুবিধার জন্য আবারও এই সেবা চালু করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক আ ফ ম জাকারিয়ার জানান, বিগত প্রশাসনের আমলে তারা একটা প্রাইভেট কোম্পানির মাধ্যমে এইরকম একটা প্রজেক্ট করার চেষ্টা করছিলো। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর ঐ কোম্পানি যখন বিল চায় তখন খোঁজ নিয়ে দেখি যে, তারা আসলে তেমন কোনো কাজই করে নি। এদিকে অধিকাংশ জিপিএস ট্রেকিং ডিভাইসগুলোও ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে কোম্পানির সাথে চুক্তি করা হইছিলো তারা ভালোভাবে সফটওয়্যার ডেভেলপ বা পাবলিশ করেনি। ট্রেকিংয়ের যে ডিভাইসগুলো দিয়েছিলো সেগুলোও নষ্ট। তাই পরে আমরা চুক্তি বাতিল করে দেই। পরবর্তীতে বিগত প্রশাসকের সাথেও আলোচনা করে জানতে পারলাম এই কোম্পানি ফলপ্রসূ কোনো কাজ করে নি তাই পরে এই চুক্তি বাতিল করা হয়।
এই প্রযুক্তিটা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো পরিকল্পনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই বিষয়টা নিয়ে আমরা আলোচনা করেছিলাম। পরবর্তীতে জানতে পারি এই কাজগুলো যারাই করে না কেনো কয়েকদিন পর পর ট্রেকিং ডিভাইসগুলো আর কাজ কেও না। এর ফলে বার বার ডিভাইস নষ্ট হওয়ায় খরচ বাড়ে। এতে করে যে সেবা পাওয়ার কথা সেটা ঠিকমতো পাওয়া যায় না। অতিরিক্ত খরচের কারণে এটা নিয়ে পরবর্তীতে আর আগানো হয়নি। বাজেট সল্পতা এবং কারিগরি ত্রুটির কারণে এটি এভাবেই পড়ে আছে। কিন্তু ভবিষ্যতে আমাদের পরিকল্পনা আছে এইটা নিয়ে কাজ করার। আমরা চেষ্টা করবো আবার শুরু করা যায় কি না।
বিগত প্রশাসনের আমলে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজ পরীক্ষামূলকভাবে চালুর পরেও কেনো এই প্রযুক্তিটি আর সম্পূর্ণতা পায়নি সেটি জানতে কথা হয় সাবেক পরিবহন প্রশাসক অধ্যাপক মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেনের সাথে। তিনি জানান, তৎকালীন সময়ে আমরা ডিভাইসগুলো সাময়িকভাবে চালু করেছিলাম। কিন্তু তখন ডিভাইসগুলোকে অ্যাপসের সাথে সিঙ্ক্রোনাইজ করতে একটু সময় লাগছিলো। পরবর্তীতে আমরা নতুন করে আবার অ্যাপসের অর্ডার দিয়েছিলাম। কিন্তু যাদের অ্যাপস দেওয়ার কথা ছিলো তারা সেটা দিতে দেরি করায় আন্দোলন পরবর্তী পরিস্থিতিতে কাজটা আর আগায় নি। সব ডিভাইসগুলো এখনো গাড়িতে লাগানো আছে এবং প্রশাসন চাইলে এখনো সেটি চালু করতে পারে। কিন্তু আন্দোলন পরবর্তী সময়ে যারা দায়িত্বে আসছেন তারা আর এটা নিয়ে কাজ না করায় এটি এভাবেই আটকে আছে। এ সম্পর্কিত সকল ফাইল প্রস্তুত করা সহ মোটামুটি সকল প্রসেসই কমপ্লিটেড। এখন শুধু একজন ভেন্ডরকে দিয়ে একটা সফটওয়্যার নিয়ে নিলেই হয়। এটার জন্য নতুন করে ফাইল ক্রিয়েট করা, অনুমোদন নেওয়া, নতুন করে কাজ শুরু করা বা অ্যালোকেশন নেওয়া এগুলোর দরকার নেই। বর্তমানে এই প্রযুক্তিটি খুবই জনপ্রিয়। প্রাইভেট যারা গাড়ি বা কোম্পানির মালিক মুটামুটি সবাই এটি ব্যবহার করে। এইযে বাস অনেক সময় দেরি করে আসে। আমি বাসায় থেকে দেখতে পারবো বাস এখন কোন জায়গায় আছে। এতে করে আমি কখন বের হবো, কোথায় দাড়াবো বা কোন জায়গায় গেলে বাসটা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এরকম অনেক উপকার আছে। আমি মনে করি এটা চালু হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা—কর্মচারী সকলেই উপকৃত হবে।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ শহিদুর রহমান বলেন, এই প্রযুক্তিটা আইসিটি সেলের আন্ডারে করা হয়নি। এটা ট্রান্সপোর্ট সেকশন করেছিলো। আইসিটি সেন্টার জড়িত ছিলো না এখানে। সফটওয়্যার হার্ডওয়্যার দুইটাই কোনো একটা কোম্পানির কাছ থেকে চুক্তি অধীনে নেওয়া হয়েছিলো ভাড়ার মতো। পরবর্তীতে পরিবহন প্রশাসক পরিবর্তন হওয়াতে এটা নিয়ে আর কাজ আগায়নি।
সিলেট থেকে আরো পড়ুন