প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৫ ২৩:০৮
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) জুলাই—আগস্ট আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, অস্ত্র ও মাদক রাখা এবং র্যাগিংয়ের দায়ে ৭৯ জন শিক্ষার্থীকে আজীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় একবছর তদন্তের শেষে সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইছে সমালোচনার ঝড়। শিক্ষার্থীদের দাবি দীর্ঘ একবছর তদন্তের পরেও শাস্তি পেয়েছে অনেক নিরপরাধ শিক্ষার্থী। এ নিয়ে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং হলে অস্ত্র ও মাদক রাখার দায়ে ছাত্রলীগের ৬২ জন নেতাকর্মীকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১৯ জনকে আজীবন বহিষ্কার, ২ জনকে দুই বছর, ৬ জনকে ৪ সেমিস্টার, ১ জনকে ৩ সেমিস্টার, ১১ জনকে ২ সেমিস্টার, ১৫ জনকে সাময়িক বহিষ্কার ও ৮ জনকে সতর্ক করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অন্যদিকে গত বছরের নভেম্বরে নবীন শিক্ষার্থীদের র্যাগিংয়ের ৩টি বিচ্ছিন্ন ঘটনার দায়ে অর্থনীতি ও পরিসংখ্যান বিভাগের মোট ২৫ জন শিক্ষার্থীদের আজীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি বিভাগ ও ব্যাচ থেকে বিবৃতি প্রদান করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৭তম সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে। সিন্ডিকেট সভার কয়েকদিন পর এক এক করে এই সিদ্ধান্তগুলো শিক্ষার্থীদের সামনে আসলে নিরপরাধ অনেক শিক্ষার্থীদের শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ এনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তুমুল সমালোচনা শুরু হয়।
নানা প্রশ্ন ও সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ৪ অক্টোবর প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে সংক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার বরাবর আপিল করার জন্য বলা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘বিভিন্ন গুরুতর ইস্যুতে ইতোমধ্যে গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে সংক্ষুদ্ধ শিক্ষার্থী বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে রেজিস্ট্রার বরাবর আপীল আবেদন করলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে নিষ্পত্তি করণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
বিশ্ববিদ্যাললের আবাসিক হলে অস্ত্র ও মাদক রাখার দায়ে দুই বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে খোদ সাবেক বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) সংগঠক নিপেশ চন্দ্র গোপকে। তার দাবি, হলে যে রুমে অস্ত্র ও মাদক পাওয়া গেছে, সেখানে সে ভর্তি থাকলেও সেখানে একাই থাকতেন নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের শাবিপ্রবি শাখার সভাপতি খলিলুর রহমান। তৎকালীন সময়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এভাবেই জুনিয়রদেরকে নেতাদের রুমে ভর্তি করিয়ে অন্য রুমে রাখতো।
এ ব্যাপারে নিপেশ বলেন, ‘২০২৪ ছাত্র—জনতার অভ্যুত্থানে আমি সরাসরি অংশগ্রহণ করি। এমনকি শাবিপ্রবি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আমাকে সংগঠক হিসাবে রাখা হয়। আমাকে শাহপরাণ হল ২০৯ নম্বর রুমে অস্ত্র ও মাদক পাওয়ার কারণে ২ বছরের জন্য বহিস্কার করা হয়। কিন্তু ২০৯ এ একাই থাকতেন নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি খলিলুর রহমান। আমি ছিলাম শাহপরাণ হলের ১০৫ নম্বর রুমে, যেইটা ছিল গণরুম। আমাদের রুমে কোন প্রকারের অস্ত্রই ছিল না, এমনকি কখনো কোন ঝামেলায় আমি জড়াই নি। তাই শাবিপ্রবি প্রশাসনের নিকট অনুরোধ, আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগটি পুনরায় যেন বিবেচনা করা হয়।’
বৈছাআর সাবেক সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বলেন, হামলা, ‘অস্ত্র ও মাদক নিয়ে সামগ্রিক যে বহিষ্কারটা হয়েছে সেখানে আমরা দেখেছি যে অনেক বড় বড় নেতারা পার পেয়ে গেছে। অন্যদিকে কম অপরাধ করে অনেকে বড় শাস্তি পেয়ে গেছে। আমরা ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে প্রশাসনের সঙ্গে আলাপ করেছি। আমরা চাই না কারো সাথে যেনো অবিচার হয়। অন্যদিকে পূর্বে দেখা যেতো ছাত্রলীগ জুনিয়রদের ভর্তি করতো এক রুমে আর রাখতো অন্য রুমে। এই কারণেও যদি কেউ শাস্তি পায়, তাহলে এটা তাদের উপর অন্যায় হবে। তাই আমরা চাই প্রশাসন যেনো কোনো নির্দোষ শিক্ষার্থীকে শাস্তি না দেয়।’
অন্যদিকে, নবীন শিক্ষার্থীদের র্যাগিংয়ের দায়ে অর্থনীতি ও পরিসংখ্যান বিভাগের ২৫ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারর নিয়েও চলছে সমালোচনা। বহিষ্কারের তালিকা প্রকাশের পর ভুক্তভোগীরাই আঙুল তুলছেন প্রশাসনের দিকে। অর্থনীতি বিভাগের ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি তাদেরকে ম্যানিপুলেট ও জোর করে বক্তব্য নেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে ঐ ব্যাচের তৎকালীন সিআর আবরার বিন সেলিমের সাথে কথা হয় সুনামগঞ্জের খবরের প্রতিনিধির। প্রক্টরিয়াল বডি তাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ম্যানিপুলেট করে বক্তব্য নিয়েছিলো দাবি করে তিনি বলেন, ‘ওই রাতে প্রক্টরিয়াল বডির চাপে আমরা নবীন শিক্ষার্থী হওয়ায় বুঝে উঠতে পারিনি আমাদের কি করা উচিত। ভয়ভীতি দেখিয়ে ম্যানিপুলেট করে আমাদের থেকে বক্তব্য নেওয়া হয়েছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে আমরা যখন আমাদের ভুল বুঝতে পারি তখন বিভাগীয় প্রধানের সঙ্গে কথা বলে ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে নিই এবং পরবর্তীতে সে বিষয়টি বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষরসহ একটা চিঠির মাধ্যমে প্রক্টর অফিসে জানাই। বিভাগীয় প্রধানের পক্ষ থেকেও এই ব্যাপারে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। আমরা চাই না আমাদের ভুলের কারণে আমাদের সিনিয়ররা শাস্তি পাক। তাই প্রশাসনের নিকট বিনীত অনুরোধ থাকবে, উনারা যেনো বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করেন।’
প্রাথমিক বা অধিকতর তদন্ত চলাকালীন বিভাগের কোনো মতামত নেওয়া হয় নি বলে জানিয়েছেন অর্থনীতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘তৎকালীন সময়েই শিক্ষার্থীদের স্ব—প্রণোদিত আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি মিটমাট হয় এবং তারা অভিযোগ তুলে ফেলার জন্য আবেদনও করে। বিভাগের পক্ষ থেকে এ বিষয়টি জানিয়ে প্রক্টরকে চিঠিও প্রেরণ করা হয়েছিল। এসবের পরেও তদন্ত চলাকালীন বিভাগের কোন মতামত নেওয়া হয়নি।’
বছর গড়িয়ে তদন্ত ও দণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করলে প্রক্টর অধ্যাপক মো. মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘তদন্ত কমিটি যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। এক্ষেত্রে তদন্ত কমিটির কার্যক্রমে কোনো ঘাটতি ছিল না। এমনকি আমরা যথাসময়ের মধ্যেই রিপোর্ট জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে সিদ্ধান্ত আসতে কেনো দেরি হয়েছে সে ব্যাপারে জানি না। তারপরও যদি কোনো শিক্ষার্থী মনে করে তাদের সঙ্গে অন্যায় হয়েছে তাহলে তারা হায়ার অথোরিটির কাছে আপিল করতে পারে। এক্ষেত্রে হায়ার অথোরিটি চাইলে যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
সিলেট থেকে আরো পড়ুন