শাকসু নির্বাচন: কী ভাবছেন শিক্ষার্থীরা

প্রকাশিত: ১৬ নভেম্বর, ২০২৫ ২২:৫১

ডাকসু নির্বাচন হলে শাকসু হবে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) কর্তৃপক্ষের বরাতে এ রকম কথা ছিল। কিন্তু ডাকসুর পরেও শাকসু নির্বাচনে কোনো পদক্ষেপ নেই। প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি পালনের পর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে উপাচার্যের শাকসু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি মেলে। কিন্তু এরপরও নিশ্চিত নয়, বরং অনিশ্চয়তা। শাকসুতে শিক্ষকরা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে অবশেষে ১৩ সদস্যের নির্বাচন কমিশন গঠন হয়। ৬ দিনের মাথায় চার শিক্ষকের পদত্যাগ নিয়ে সর্বশেষ অনিশ্চয়তা। এদিকে নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসছে দিন দিন। নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে শাকসু নিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। 


গত ৬ নভেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে এক বৈঠক হয় শাকসু নির্বাচন কমিশনের। বৈঠকে জানানো হয়, এই সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাসহ বাকি কার্যক্রম শুরু করা হবে। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতোমধ্যেই নির্বাচনী একটা আমেজ চলে আসছে। পদ প্রত্যাশি প্রায় সবাই যার যার মতো শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নানা কার্যক্রম করে যাচ্ছেন। নির্বাচনী এই আমেজের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কেমন নেতৃত্ব চান এবং সেই নেতৃত্ব বাচাইয়ের প্রক্রিয়াটাই বা কেমন পরিবেশে চান। সেই বিষয়গুলো জানতেই কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে। 

 


জুলাই আন্দোলন পরবর্তী সময়ে প্রথম ব্যাচ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরশাসনের যুগ তারা দেখেনি। নতুন এই পরিবেশে নতুন প্রজন্ম কেমন নেতৃত্ব দেখতে চায় সেটা জানতে কথা হয় এই ব্যাচের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আদনান ফরহাদের সঙ্গে। বিগত বছরগুলোতে গণতান্ত্রিক কোনো প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে না পারার আক্ষেপ জানিয়ে আদনান বলেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মধ্যে শাবিপ্রবি আরেকটি রাষ্ট্র। শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করা শাবিপ্রবি প্রশাসনের দায়িত্ব। দীর্ঘ ২৮ বছর শিক্ষার্থীরা কথা বলার, তাদের অধিকার ও স্বার্থ আদায়ের কোনো প্ল্যাটফর্ম পায়নি। প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া সত্ত্বেও আমাদের নেই পর্যাপ্ত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। আমাদের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে নেই কোনো আধুনিকতার ছোঁয়া, নেই পর্যাপ্ত বইয়ের সংগ্রহ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬০ শতাংশ শিক্ষার্থীদের জন্য নেই আবাসন ব্যবস্থা। নেই পর্যাপ্ত রিসার্চ ফান্ড, দেওয়া হয় না জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণে প্রণোদনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি হলে খাবারের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। ক্যাম্পাসের অবকাঠামোগত অবস্থা দেখলে মনে হয় আমরা বসবাস করছি কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ইদানীং বিশ্ববিদ্যালয়ে সার্বিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে, যা থেকে সূত্রপাত ঘটছে নানা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার। বিশেষ করে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাজনীতির কালো অধ্যায় দেখে দেখে বড় হয়েছি। কোনো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে পারি নি। জীবনে প্রথমবারের মতো শাকসুর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে যাচ্ছি এবং নিজেদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাচ্ছি। একমাত্র শাকসুই নিশ্চিত করতে পারে শিক্ষার্থী-বান্ধব ক্যাম্পাস। তাই আমরা চাই একটা সুষ্ঠু সুন্দর পরিবেশের মধ্য দিয়ে যেনো আমাদের আগামীর নেতৃত্ব নির্বাচন করতে পারি।

 


বিশ্ববিদ্যালয়ের যে কোনো সমস্যায় এগিয়ে যেতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। জুলাই থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো সমস্যায় শিক্ষার্থীদের পাশে যাদের দেখা যায় তাদেরই একজন অর্থনীতি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী হাফিজুর ইসলাম হাফিজ। একই প্রশ্ন নিয়ে কথা হয় হাফিজের সাথে। আগামী শাকসুতে দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে থেকে ছাত্রদের অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নিতে সক্ষম এমন নেতৃত্বের প্রত্যাশা করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায়। গণতান্ত্রিক চর্চা ও নেতৃত্বের বিকাশের অন্যতম সুযোগ তৈরি করবে এই নির্বাচন। অথচ অনুপস্থিত প্রতিনিধিত্বের কারণে শিক্ষার্থীদের মৌলিক দাবি, শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অনেকটা দিশাহীন ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন নির্বাচনের আশ্বাস দিয়েছে, নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক সূচনা। এখন অপেক্ষা তপসিল ঘোষণার এবং একটি শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তার। শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব বেছে নেবেন যিনি দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে থেকে ছাত্রদের অধিকার ও স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নিতে সক্ষম। ক্যাম্পাস রাজনৈতিক প্রভাব আর দমন পীড়নের ক্ষেত্র হবে না। এটা হওয়া উচিত শিক্ষা, গবেষণা, চিন্তা ও সংস্কৃতির মুক্ত চর্চার স্থান। গ্রন্থাগারের আধুনিকীকরণ, গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি, উদ্ভাবনে সহায়তা, নিরাপদ ও মানবিক আবাসিক পরিবেশ এগুলোর দাবি উচ্চারিত হওয়া উচিত সর্বাগ্রে। একইসাথে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা নির্ভর ক্যাম্পাস কাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের জন্য টিচিং এসিস্ট্যান্ট ও রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজের সুযোগ তৈরি করার জোর দাবি থাকবে। সর্বোপরি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ তৈরি তৈরি হবে এবং আমরা সেই পথে আস্থাশীল।

 

 


সাংবাদিকদের বলা হয় সমাজের দর্পণ। নির্ভয়ে সত্য তুলে ধরাই সাংবাদিকদের পরম ধর্ম। বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা অনিয়ম থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীদের সকল সমস্যা তুলে ধরার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ সাংবাদিকদের ভূমিকা অনন্যা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সে ধর্মে নিয়োজিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন সমাজকর্ম বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মো. মোফাজ্জল হক। তিনি জাতীয় দৈনিক  বাংলাদেশ প্রতিদিনের শাবিপ্রবি প্রতিনিধি। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ধরনের হিংসা, ভয়ভীতি বা রাজনৈতিক প্রভাব না থাকে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ত্যাগ, সংগ্রাম ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে শিক্ষাঙ্গনের রাজনীতি হওয়া উচিত দায়িত্বশীল, আদর্শনির্ভর ও কল্যাণমুখী। রাজনীতি হবে সচেতনতা, ন্যায়বোধ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে ভিত্তিক, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থ নয়, বরং শিক্ষার্থী ও দেশের স্বার্থই হবে মূল প্রেরণা। শিক্ষাঙ্গনে এমন রাজনীতি দরকার যা জ্ঞান, সংস্কৃতি ও মানবিকতার চর্চাকে উৎসাহিত করবে। সহিংসতা ও লেজুড়বৃত্তিক সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হয়ে রাজনীতি হবে সেবার মাধ্যম। শিক্ষার্থীদের সমস্যা সমাধান, অধিকার রক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার অঙ্গীকার। আর সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের বৈধ এজেন্ডা হচ্ছে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বা নির্বাচিত প্রতিনিধি। আগামী শাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে বেশ সরগরম ছাত্র সংগঠনগুলো। এটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম সৌন্দর্য। তবে আমাদের প্রত্যাশা নির্বাচন যেন হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক। এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যেন কোনো ধরনের হিংসা, ভয়ভীতি বা রাজনৈতিক প্রভাব না থাকে, বরং শিক্ষার্থীদের মতামত ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়। আমরা চাই এমন একটি পরিবেশ, যেখানে প্রার্থীরা ভয়ের নয়, ভাবনার রাজনীতি করবে; ব্যক্তিস্বার্থ নয়, বরং শিক্ষার্থীদের কল্যাণ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকে প্রাধান্য দেবে। বিজয়ী প্রার্থী হোক এমন একজন, যিনি দক্ষ, সৎ, নেতৃত্বগুণসম্পন্ন এবং সত্যিকারের শিক্ষার্থীবান্ধব। তার কর্মকাণ্ডে যেন লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির ছাপ না থাকে, বরং বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আদর্শ শিক্ষাঙ্গন হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার থাকে। শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ, ও ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা হোক তার মূল লক্ষ্য। আমরা চাই কল্যাণমুখী, দায়িত্বশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতৃত্ব, যারা দলীয় স্বার্থ নয়, বরং শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ও অধিকারকে প্রতিনিধিত্ব করবে।

সিলেট থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার