প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৩ ০৮:১০
পাগলা বড় জামে মসজিদের নির্মাণ কাজে মূল কারিগররা ছিলেন ভারতীয়। মূল স্থপতির নাম মুমিন আস্তাগার। যার পূর্ব পুরুষ ভারতের তাজমহলে কাজ করেছেন বলে জানা যায়। মসজিদটি নির্মাণ করতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে।
পাগলা বড় জামে মসজিদ
সুনামগঞ্জ-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাগলা ইউনিয়নের রায়পুর গ্রামে শতবছরের পুরনো স্থাপত্য নিদর্শন মোগল প্রাসাদাকৃতির তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ। মহাশিং নদীর কূল ঘেঁষে রাজকীয় মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে স্থাপত্যকলার বিস্ময় হয়ে থাকা এই নিদর্শনটি। প্রথম দেখায় যে কারও নজর কেড়ে নেয় এই স্থাপত্য নিদর্শনটি। মসজিদের উত্তর পাশে মহাসিং নদী, দক্ষিণ পাশে পাগলা রায়পুর গ্রাম ও সিলেট-সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মসজিদটি দেখতে আসেন ভ্রমণ পিপাসু মানুষজন। শতবছর পরেও স্ব—গৌররে দাঁড়িয়ে আছে স্থাপনাটি।
মূলত নির্মাণ শৈলী ও অপূর্ব কারুকাজের জন্য এই মসজিদটি বিখ্যাত। এলাকায় এই মসজিদ রায়পুর বড় মসজিদ নামেও পরিচিত। দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি যে কারোর নজর কাড়বে। দোতলা এ মসজিদের বৈশিষ্ট্য হলো— এতে কোনো রড ব্যবহার করা হয়নি। সম্পূর্ণ ইটেরও পর নির্মিত স্থাপনাটি। ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৫ আশ্বিন (শুক্রবার) মসজিদটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পাগলা রায়পুর বড় মসজিদের নির্মাণ কাজে মূল কারিগররা ছিলেন ভারতীয়। মূল স্থপতির নাম মুমিন আস্তাগার। যার পূর্ব পুরুষ ভারতের তাজমহলে কাজ করেছেন বলে জানা যায়। মসজিদটি নির্মাণ করতে প্রায় ১০ বছর সময় লাগে।
মসজিদের উচ্চতা ৪০ ফুট। ছয়টি স্তম্ভের ওপর ছয়টি মিনার। তিনটি বিশাল গম্বুজ এবং ছোট সাইজের আরও ১২টি মিনার রয়েছে। ভূমিকম্প নিরোধক ব্যবস্থা হিসেবে ভূমি খনন করে বেশ মজবুত পাতের ওপর ভিত নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে অনেকগুলো বড় মাপের ভূমিকম্পও এখন পর্যন্ত মসজিদটিতে ফাটল ধরাতে পারেনি। শুধুমাত্র গম্বুজের এক জায়গায় আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে খানিকটা লিকেজ দেখা দিয়েছিল। তখন গম্বুজের উপরের দিকের কিছু পাথর পরিবর্তন করতে হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞ স্থপতিদের তত্বাবধানে বেশ সতর্কতার সাথে সংস্কার কাজ সম্পাদন করা হয়েছে, যাতে মূল গঠনে কোনো রূপ পরিবর্তন না ঘটে। মসজিদের ভেতরকার দৃশ্য আরও বেশি নান্দনিক কারুকার্য মন্ডিত। মসজিদে নামাজের জন্য নির্ধারিত মূল স্থান দোতলায়। মেহরাব অংশে জমকালো পাথর কেটে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আকর্ষণীয় ডিজাইন। পুরো মসজিদের চারপাশে তিনফুট উচ্চতার যে কারুকার্য খচিত টাইলস লাগানো হয়েছে তা উঁচুমানের স্থাপত্য শৈলীর ইঙ্গিত দেয়। টাইলসগুলো আনা হয়েছিল ইতালি ও ইংল্যান্ড থেকে।
প্রত্যেক প্রবেশ দ্বারে পাথর খচিত খিলান মসজিদটিকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। মসজিদের নিচতলার ছাদ ঢালাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছে রেলের স্লিপার। ছাদ ও গম্বুজের চারপাশে পাথর খোদাই করা পাতার ডিজাইন গ্রামীণ ঐতিহ্যের জানান দেয়। দোতলার মেঝেতে রয়েছে দুর্লভ শ্বেতপাথর। তখনকার অবিভক্ত ভারতের সঙ্গে নদীপথের যোগাযোগ সহজ ছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মসজিদটি নদীরকূল ঘেঁষে নির্মিত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাগলা রায়পুর গ্রামের ইয়াসিন মির্জা ও ইফসুফ মির্জা দুই ভাই মিলে মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। বেশ বিত্তবান এবং ধর্মপরায়ণ ছিলেন তারা। বিপুল জমির মালিকও ছিলেন। ইয়াসিন মির্জা ও ইফসুফ মির্জার বাবা আদিল হাজী ছিলেন বেশ ধার্মিক। আদিল হাজীকে সবাই পায়ে হেঁটে হজ পালনকারী হিসেবে জানতেন। ধর্ম কর্মের প্রতি অগাধ মনোনিবেশ থেকে তিনি নিজ বাড়িতে একটি টিনশেড মসজিদ তৈরি করেন। সে সময় ঐ এলাকায় এটিই ছিল প্রথম মসজিদ। আশপাশের গ্রামের মুসলমানরাও এখানে এসে নামাজ আদায় করতেন। পরে ১৩৩১ বঙ্গাব্দের পাগলা বড় জামে মসজিদটি নির্মাণ করেন আদিল হাজীর ছেলে ইয়াসিন মির্জা ও ইফসুফ মির্জা।
স্থানীয়রা জানান, ঐতিহ্যবাহী পাগলা বড় জামে মসজিদটি অযত্নে ও অবহেলায় থাকায় আনুষঙ্গিক কাজগুলো মসজিদের নিজস্ব ফান্ড বা চাঁদা সংগ্রহের মাধ্যমে সম্পাদন করা হয়। সরকারের তরফ থেকে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ পেলে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাটি পর্যটন শিল্পে একটা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারতো। ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনটি এখনও সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দৃষ্টিতে আসেনি। সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ না হলে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সাক্ষী সুনামগঞ্জ জেলার পাগলা বড় জামে মসজিদটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাবে।
মসজিদের উদ্যোক্তা ইয়াসিন মির্জা ও ইফসুফ মির্জার প্রপৌত্র ও স্থানীয় সাংবাদিক জামিউল ইসলাম তুরান মির্জা বলেন, মসজিদটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক। আমরা চাই এটি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় নেওয়া হোক।শান্তিগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ বলেন, পাগলা বড় জামে মসজিদ কালের সাক্ষী হয়ে মহাশিং নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি একটি ঐতিহাসিক জামে মসজিদ। আমি যখন চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তাম তখন এটি আমাদের পাঠ্য বইয়ে ছিল। মসজিদটি আমাদের ইতিহাসের জানান দেয়।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন