প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৪৮
শিক্ষার্থীর গায়ের জামাটি ছেঁড়া। বিষয়টি চোখে পড়তেই আর দেরি করলেন না তিনি। হাতে তুলে নিলেন সুঁই সুতো আর কাঁচি। নিজেই বসে পড়লেন জামাটি সেলাই করতে। সুঁই দিয়ে সেলাই করতে করতে প্রকাশ করলেন শিক্ষার্থীর প্রতি গভীর মমতা ও দায়িত্ববোধ। শিক্ষক শিক্ষার্থীর সম্পর্ক যে শুধু পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এই দৃশ্য যেন তারই এক অনন্য উদাহরণ।
বলছিলাম ধর্মপাশা উপজেলা পাইকুরাটি ইউনিয়নের বেরীকান্দী বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মাত নাইলা বেগমের কথা। গত বুধবার তাঁর এই মানবিক মুহূর্তের তিনটি স্থিরচিত্র ধারণ করেন তারই এক সহকর্মী। পরে ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সবার নজর কাড়ে। ছবিতে দেখা যায় এক কোমলমতি শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা সেলাই করে দিচ্ছেন প্রধান শিক্ষক নাইলা বেগম। তাঁর এই আন্তরিক উদ্যোগে ফুটে উঠেছে শিক্ষার্থীদের প্রতি স্নেহ, মমতা, ও দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
তবে নায়লা বেগমের কাছে এটি নতুন কিছু নয়। প্রচারের জন্য নয় বরং নিজের স্বভাবের অংশ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে এমন কাজ করে আসছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের বই খাতা সেলাই করে দেওয়া, ছোট শিশুদের ছেঁড়া জামা সেলাই করে দেওয়ার সহ এ ধরনের কাজ করে আসছেন।
নাইলা বেগম বলেন, আমি এগুলো সবসময়ই করি। কাউকে দেখানোর জন্য জন্য কিংবা প্রকাশ করার উদ্দেশ্যে এসব করি না। এগুলো আমার স্বভাবের অংশ। আমার এক সহকর্মী ছবিটি তুলে ফেসবুকে দিয়েছেন। কখনো চাইনি এসব কাজ গণমাধ্যমে প্রকাশ হোক। শিক্ষকতা একটি নৈতিকতার পেশা। দোয়া করবেন যেন চাকরিজীবনের বাকি সময়টুকুও শিক্ষার্থীদের মায়ের মমতায় এভাবেই পাশে থেকে শিক্ষা দিতে পারি।
শিক্ষকের এমন মানবিক উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রশংসা কুড়িয়েছে। ছবিটি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন শিক্ষক নেত্রী খাইরুন্নাহার লিপি। এ নিয়ে দেওয়া এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে যখন চারদিকে নানা সমালোচনা দেখি, ঠিক তখনই একজন প্রধান শিক্ষককে নিজের শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামাই সেলাই করে দিতে দেখে মনে হলো, এমন মানবিক দৃশ্য সবার হৃদয় ছুঁয়ে যাক। তিনি আরও লেখেন আমরা মানুষের ইতিবাচক গুণগুলো তুলে ধরার ক্ষেত্রে উদারতা দেখাতে পারি না, অথচ সমালোচনা করতে বেশ পটু। মানুষের ভালো গুণগুলো কম্বল দিয়ে ঢেকে রাখি,যাতে কেউ জানতে না পারে। অন্যদিকে কারো খারাপ দিক প্রচার করার ক্ষেত্রে বেশ পারদর্শী।
থানুরা পাছাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহ মোহাম্মদ এনামুল হক বলেন, একজন শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীর ছেঁড়া জামা নিজের হাতে সেলাই করে দেন তখন তিনি শুধু একটি জামা সেলাই করেন না। বরং শিশুটির হৃদয়ে আত্মবিশ্বাস ও ভালোবাসার বন্ধন তৈরি করেন। শিক্ষকতা কেবল পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিশুদের প্রতি মমতা ও মানবিক আচরণের মধ্য দিয়েও প্রকৃত শিক্ষার প্রকাশ ঘটনো সম্ভব। কোন বক্তৃতা না দিয়েই নায়লা ম্যাডাম তার কাজের মাধ্যমে মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন।
উপজেলা প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মোঃ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, একটি জামা সেলাই করে দেওয়া হয়তো খুব বড় কোনো কাজ নয়। কিন্তু একটি শিশুর কাছে এই ছোট্ট উদ্যোগ হয়ে উঠতে পারে ভালোবাসা ও আপনত্বের গভীর অনুভূতি।
তিনি আরো বলেন, শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ের পাতায় লেখা পাঠ থেকেই নয়, শিক্ষকদের এমন আচরণ থেকেও শেখে সহমর্মিতা, মানবিকতা ও অন্যের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা।
দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন নাইলা বেগম। কর্মজীবনের শুরুতে বাদশাগঞ্জ পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে চার বছর শিক্ষকতা করেন। এরপর ভাটাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দুই বছর এবং নিজের শৈশবের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫ বছর শিক্ষকতা করেন। পরে বালিজুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বেরীকান্দী বড়খলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন।
ব্যক্তিজীবনে তিন সন্তানের জননী নাইলা বেগম। তাঁর স্বামী খয়েরদিরচর আলীম মাদ্রাসার সহকারী সুপার হিসেবে কর্মরত। বড় ছেলে অনার্সে অধ্যয়নরত। ছোট ছেলে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে। সে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ —৫ পেয়েছিল। তাঁদের একমাত্র মেয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) অধ্যয়নরত।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন