কবে খুলবে বর্ডার হাট?

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ২২:৫৩

বন্ধ দুই বছর ধরে

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গতিশীল করতে বন্ধ থাকা বর্ডার হাট চালু এবং স্থলবন্দরগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনার বিষয়ে সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠক হয়েছে। এর ফলে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সুনামগঞ্জের বন্ধ থাকা তিনটি বর্ডার হাট ডলুরা—বালাট, বাগানবাড়ি—রিংকু ও লাউড়েরগড় (শাহিদাবাদ)—নালিকাটা এবং সিলেটের কালাইছড় ও ভোলাগঞ্জ। এদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বন্ধ থাকা বর্ডার হাট পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্য সরকারও। 

 


মেঘালয়ের উপমুখ্যমন্ত্রী স্নিয়াবালাং ধর জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পাঁচটি সীমান্ত হাট পুনরায় চালুর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে রাজ্য সরকার। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের তিনটি এবং সিলেটের দুইটি বর্ডার হাট রয়েছে। একই সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণে স্থল শুল্ক স্টেশনগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন ও কয়েকটি স্টেশনকে পূর্ণাঙ্গ ইন্টিগ্রেটেড চেক পোস্টে (আইসিপি) উন্নীত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।  

 

 

 

 

 

 


সংশ্লিষ্টরা জানান, মেঘালয়ের সঙ্গে সুনামগঞ্জ ও সিলেটের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এই সীমান্ত দিয়ে পাথর, চুনাপাথরসহ বিভিন্ন পণ্যের আমদানি—রপ্তানি হয়ে থাকে। সেজন্য সীমান্ত বাণিজ্যের অবকাঠামো উন্নয়ন ও কার্যক্রম সম্প্রসারণ হলে দুই অঞ্চলের ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী, শ্রমজীবী মানুষ এবং সীমান্তবর্তী এলাকার স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে দুই দেশের সরকারের সমন্বয় ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি। 
সুনামগঞ্জের প্রথম বর্ডার হাট হিসেবে ২০১২ সালের ২৪ এপ্রিল সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ডলুরা এবং ভারতের মেঘালয়ের বালাট বর্ডার হাটটি চালু হয়। দেশের দ্বিতীয় বর্ডার হাট হিসেবে পরিচিত এই বাজারটি স্থানীয় ব্যবসা—বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি করেছিল। পরে ২০২২ সালের ১২ মে দোয়ারাবাজার উপজেলার বোগলা ইউনিয়নের বাগানবাড়ি ও ভারতের মেঘালয়ের রিংকু সীমান্তে জেলার দ্বিতীয় এবং দেশের পঞ্চম বর্ডার হাট চালু হয়। ২০২৩ সালের ২৪ মে তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড় (শাহিদাবাদ) ও ভারতের মেঘালয়ের নালিকাটা সীমান্তে জেলার তৃতীয় এবং দেশের ১৪তম বর্ডার হাটের যাত্রা শুরু হয়। 

 


প্রতিটি বর্ডার হাটে বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য ২৫টি করে মোট ৫০টি দোকান ছিল। সীমান্ত এলাকার তালিকাভুক্ত কার্ডধারী বাসিন্দারা এসব হাটে পণ্য কেনাবেচার সুযোগ পেতেন। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি ও উদ্যানজাত পণ্য, সবজি, শুকনো মাছ, গৃহস্থালি ও ক্ষুদ্র কৃষিপণ্য, কুটিরশিল্পের সামগ্রী, কাঠের আসবাব, তাঁত ও হস্তশিল্পের পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরি হয়েছিল এসব বাজারে। বর্ডার হাটগুলো শুধু পণ্য কেনাবেচার কেন্দ্র ছিল না, এগুলো সীমান্তবর্তী মানুষের কর্মসংস্থান, বাড়তি আয় এবং দুই দেশের স্থানীয় জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রেখেছিল। হাটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। 

 


সুনামগঞ্জের তিনটি বর্ডার হাটই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। করোনা মহামারির সময় প্রথমে হাটগুলো বন্ধ করা হয়। পরে কিছু সময়ের জন্য পুনরায় চালু হলেও ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সীমান্তবর্তী এলাকার নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির কারণে আবারও কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সুনামগঞ্জের সীমান্তবর্তী এলাকার ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রত্যাশা, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বন্ধ থাকা বর্ডার হাটগুলো আবার চালু হবে। এতে স্থানীয় উৎপাদকদের পণ্য বিক্রির সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা, পরিবহন ও শ্রমনির্ভর কর্মসংস্থানও ফিরে আসতে পারে।  

 


গত ২৯ অক্টোবর ভারতের মেঘালয়ের রাজধানী শিলংয়ে ‘লিভারেজিং এফটিএস—আউটরিচ প্রোগ্রাম’ শীর্ষক এক কর্মশালায় সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণের এসব পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন উপমুখ্যমন্ত্রী স্নিয়াবালাং ধর। পরদিন ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত মেঘালয়ের সংবাদমাধ্যম ‘দ্য শিলং টাইমস’ এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত—বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য বাড়াতে রাজ্য সরকার স্থল শুল্ক স্টেশনগুলোর অবকাঠামো শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। 

 


প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব এবং বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকায় কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। স্নিয়াবালাং ধর জানান, আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের অবকাঠামো পুরোপুরি কার্যকর করতে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে ভারতের দিকের অবকাঠামোও সম্পূর্ণভাবে চালু করা কঠিন। এছাড়াও মেঘালয়ের বাগলি, ভোলাগঞ্জ, মহেন্দ্রগঞ্জ ও ডলুরা স্থল শুল্ক স্টেশনকে পূর্ণাঙ্গ ইন্টিগ্রেটেড চেক পোস্টে উন্নীত করার প্রস্তাবও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। 

 


অন্যদিকে, গত ২৪ আগস্ট সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর বৈঠকেও সীমান্ত বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। তবে গত দেড় বছরে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি এসেছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাণিজ্য আরও সহজ ও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

 


বৈঠকে বন্ধ থাকা বর্ডার হাট পুনরায় চালু, স্থলবন্দরগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনা এবং স্থলপথে সুতা আমদানির ওপর বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন ও ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাবও উঠে আসে। 
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুনজিত কুমার চন্দ বলেন, জেলার বর্ডার হাটগুলো পুনরায় চালুর বিষয়ে এই মুহূর্তে প্রশাসনের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে দুই দেশের সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সাম্প্রতিক কোনো যোগাযোগ বা সিদ্ধান্তের তথ্যও তাঁদের জানা নেই। বর্ডার হাটগুলো কবে চালু হতে পারে, সে বিষয়ে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, বর্ডার হাট চালুর বিষয়টি দুই দেশের সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও পারস্পরিক আলোচনার ওপর নির্ভরশীল।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার