প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৫৪
সুনামগঞ্জের তরুণদের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যাওয়ার প্রবণতা, দালাল চক্রের প্রলোভন, লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার ভয়াবহতা এবং অনিরাপদ অভিবাসন ঠেকাতে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ নিয়ে কথা বলেছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কো—অর্ডিনেটর মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারটি সঞ্চালনা করেছেন জাহাঙ্গীর আলম।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জের মানুষ কেন এখনো দালালদের প্রলোভন এবং এই ভয়ঙ্কর সমুদ্রপথে পা বাড়াচ্ছেন এবং এই ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে কি কি করা জরুরি?
মো.নজরুল ইসলাম: আপনার প্রশ্নে আসার আগে একটি পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করি। আমাদের একটি গবেষণা বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৮২ শতাংশ তরুণ সুযোগ পেলে বিদেশে যেতে চায়। বিদেশ যাওয়ার জন্য তারা এতটাই মরিয়া হয়ে উঠছে যে, অনেক ক্ষেত্রে যাচাই—বাছাইও করছে না। ফলে তারা বিভিন্ন প্রলোভন ও প্রতারণার শিকার হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে গত তিন—চার বছর ধরে আমরা সুনামগঞ্জের চিত্রও দেখছি। সুনামগঞ্জ থেকে প্রচুর মানুষ লিবিয়া হয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি প্রায় সাত বছর ধরে অভিবাসন নিয়ে কাজ করছি। আমার অভিবাসন কার্যক্রম শুরু হয়েছিল শরীয়তপুরে। আপনারা জানেন, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর থেকে প্রচুর মানুষ লিবিয়া হয়ে ইতালিতে যাওয়ার চেষ্টা করে।
সেই সময় আমরা দেখেছি, প্রায় প্রতিটি পরিবারেই একজন না একজন ইউরোপে অবস্থান করছে। এমনকি সপ্তম বা অষ্টম শ্রেণিতে পড়া একটি ছেলেও চিন্তা করছে, সেও সমুদ্রপথে ইউরোপে যাবে।
আমরা ২০২৩ সালে সুনামগঞ্জে এসে কাজ শুরু করি। শুরুর দিকে এখানে এ ধরনের প্রবণতার তেমন প্রভাব আমরা দেখিনি। কিন্তু ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে এসে আমরা দেখলাম, সুনামগঞ্জের কয়েকটি উপজেলায় প্রচুর তরুণ্য যাদের কেউ সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দেবে, আবার কেউ স্কুল থেকে ঝরে পড়েছেÑতারা ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথে ইউরোপ যাওয়ার জন্য খুবই উদগ্রীব।
সচেতনতার কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, তাদের ক্ষেত্রে একটি বিষয় খুব বেশি কাজ করছে। একজন কোনোভাবে ইউরোপে গিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তার পারিবারিক ও আর্থিক পরিবর্তন আশপাশের তরুণদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করছে। একজনকে দেখে আশপাশের আরও ১০ জন অনুপ্রাণিত হচ্ছে। এই অনুপ্রেরণা থেকেই তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, আমিও তাহলে দালালের মাধ্যমে সমুদ্রপথে বিদেশে যাব।
এবার ২০২৬ সালের পরিসংখ্যানের দিকে আসি। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে সমুদ্রপথে গ্রিসে যাওয়া বাংলাদেশির সংখ্যা ৩ হাজার ৬০০—এর বেশি। শুধু গ্রিস নয়, একই সময়ে ইতালিতে পৌঁছানো বাংলাদেশির সংখ্যা ৪ হাজার ২৪৯।
প্রতি মাসেই এ ধরনের কয়েকটি নৌযাত্রা হচ্ছে। আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ের একটি ঘটনার কথা চিন্তা করি, তাহলে দেখবেন, দুই দিন আগেও ৩৮ থেকে ৪২ জনকে নিয়ে একটি নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে রওনা হয়েছিল। পরে ওই নৌকাটি গ্রিসের উপকূল থেকে ফেরত আসে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায় কিভাবে কিভাবে মানুষকে সচেতন করা যায়?
মো.নজরুল ইসলাম: আমি গতকাল শান্তিগঞ্জে দুজনের বাসায় গিয়েছিলাম। তাঁদের মধ্যে একজন সুস্থ অবস্থায় ফিরে এসে ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, ওই তরুণ আগে সৌদি আরবে থাকতেন। সৌদি আরব থেকে তিনি লিবিয়া হয়ে সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ইউরোপে যাওয়া। সৌদি আরবে তাঁর ভালো আয় ছিল এবং পারিবারিক অবস্থাও ভালো ছিল।
আমাদের তরুণদের মধ্যেও একটি ধারণা তৈরি হয়েছে কোনোভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশ করতে পারলে পরিবারের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হবে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। এটি একটি রঙিন স্বপ্ন।
এই রঙিন স্বপ্নকে অনেকে পুঁজি করে। কিছু দালাল তাদের এই স্বপ্নকে আরও দৃঢ় করে বলে, অল্প টাকা দিয়ে, পাঁচ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে খরচ পাঁচ—দশ লাখ টাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তা বেড়ে ২২ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চলে যায়। আমরা এমন ঘটনাও পেয়েছি, যেখানে একজন লিবিয়াফেরত ব্যক্তি চারবার সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। চারবার চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁর মোট ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি ইউরোপে যেতে পারেননি।
এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য লিবিয়া থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যারা ফিরে আসছেন এবং সমুদ্রপথে যারা মারা যাচ্ছেন, তাদের ঘটনাগুলো আরও বেশি মানুষের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাহলে কেউ রঙিন স্বপ্ন দেখার আগে এর নেতিবাচক দিকটাও চিন্তা করতে পারবে। এই পথে গিয়ে সে নিজেও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে, এমনকি তার পরিবারও ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। শুধু সুনামগঞ্জের ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ব্যক্তিদের সংখ্যা প্রায় ৪০০। শুধু ২০২৬ সালের জুন ও জুলাই মাসে লিবিয়া থেকে ৬৬ জন ফিরে এসেছেন।
সুনামগঞ্জ থেকে এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো জীবনযাত্রার মানউন্নত করার আকাঙ্ক্ষা। পাশাপাশি সুনামগঞ্জ ভৌগোলিকভাবে একটি হাওরাঞ্চল হওয়ায় এখানে কাজের সুযোগ খুবই সীমিত। মানুষের আয়ের উৎসের দিকে তাকালে দেখা যায়, কেউ মাছ ধরেন, কেউ কৃষিকাজ করেন। কৃষিকাজের সুযোগও সীমিত, বছরে একবার ফসল হয়। এখানে তেমন কোনো কলকারখানা নেই এবং অন্যান্য ব্যবসার সুযোগও কম। এ কারণে অনেকে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও সফলতার গল্পই বেশি সামনে আসে। কেউ বলে, অমুক বিদেশে গেছে এবং ভালো আছে। কিন্তু সমুদ্রপথে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে যারা মরণফাঁদে পড়েছে বা মারা গেছে, সেই ঘটনাগুলো সামনে আসে না।
তাই এ ক্ষেত্রে সচেতনতা খুবই জরুরি। প্রচার—প্রচারণার মাধ্যমে সবাইকে জানাতে হবে যে, অনিয়মিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা একটি মরণফাঁদ হতে পারে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সে বিষয়ে এখন ব্র্যাক দীর্ঘদিন যাবত কাজ করে যাচ্ছে। এখন আপনাদের বিকল্প চিন্তা কি আছে?
মো.নজরুল ইসলাম: আমরা ব্র্যাক থেকে ২০০৬ সাল থেকে অভিবাসন নিয়ে কাজ করছি। সুনামগঞ্জে কাজ শুরু করেছি ২০২৩ সালে। এখানে আমরা দেখেছি, অনেক নারী—পুরুষ বিদেশে যায়। আগে নারীদের বিদেশ যাওয়ার সংখ্যা বেশি থাকলেও বর্তমানে তা কমছে। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে অনিরাপদ অভিবাসনের প্রবণতা বাড়ছে।
সুনামগঞ্জে ব্র্যাকের ‘প্রত্যাশা’—২ প্রকল্প রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের আওতায় ইউরোপ বা লিবিয়া থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফিরে আসা অভিবাসীদের পুনঃএকত্রীকরণে আমরা কাজ করছি। এ পর্যন্ত শুধু সুনামগঞ্জেই প্রায় ১৫০ জন লিবিয়াফেরত ব্যক্তিকে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সহযোগিতা করেছি।
পুনঃ একত্রীকরণে আমরা মূলত তিনটি ভাগে দেখি। বিদেশ থেকে ফিরে আসা ব্যক্তিদের অনেকেরই মনোসামাজিক সেবা, সামাজিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। এই তিন ধরনের সহায়তা সমন্বিতভাবেই আমরা পুনঃএকত্রীকরণের কাজ করে থাকি।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: অধিবাসী যারা মনস্থির করেছে সে যাবেই, সে ক্ষেত্রে প্রচার প্রচারণা কীভাবে করেন
মো.নজরুল ইসলাম: যারা বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাদের সচেতনতার বিষয়টিকেও আমরা খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে এবং গ্রামে গ্রামে ভিডিও প্রদর্শন করছি। অনিয়মিত পথে, বিশেষ করে সমুদ্রপথে বিদেশ গেলে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে, সে বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি আমরা পটগানের মাধ্যমেও সচেতনতা তৈরির কাজ করছি। সুনামগঞ্জ সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় পটগানের আয়োজন করা হয়েছে। পটগান মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয় হওয়ায় এর মাধ্যমে সহজে অভিবাসনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদেরও আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। নবম শ্রেণি থেকে কলেজের একাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই ভবিষ্যতে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাদের আগেভাগেই সচেতন করার জন্য স্কুল কুইজ ও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করছি।
এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়ে কর্মশালা করছি। উপজেলাতেও কর্মশালা করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে সচেতনতার বার্তা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সভা ও বৈঠকে অনিরাপদ অভিবাসনের বিষয়গুলো জানানো হচ্ছে।
তবে শুধু ব্র্যাক বা শুধু সরকারের একার পক্ষে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। অনিরাপদ অভিবাসন বন্ধে সরকারি—বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আমরাও বিশ্বাস করি যে এখানে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এখানে শুধুমাত্র একটা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন