খবরনামা

‘দালালদের দৌরাত্ম্যে এসব হচ্ছে’

প্রকাশিত: ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ২২:৫১

দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের নিয়মিত আয়োজন ‘খবরনামা’—তে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপগামী তরুণদের ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ হওয়া, অবৈধ অভিবাসনের ঝুঁকি এবং সরকারি উদ্যোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। গ্রীসে সাগরপথে যাওয়ার পথে জগন্নাথপুরের আরও পাঁচজন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আবারও আলোচনায় এসেছে ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের বিষয়টি। এই পর্যন্ত জেলার ৩ উপজেলার ১১ জনের নাম—পরিচয় পাওয়া গেছে। এই পরিস্থিতিতে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় যুক্ত ছিলেন জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ নাজমুস সাকিব। সঞ্চালনা করেছেন পত্রিকার সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সাগরপথে ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ বা গ্রীস যাওয়ার জন্য এই অঞ্চলের তরুণরা প্রতিনিয়ত মৃত্যুঝুঁকি নিচ্ছে। এই ঝুঁকি ঠেকাতে আসলে করণীয় কী?
নাজমুস সাকিব: প্রথমে যারা নিখোঁজ আছেন এবং যারা মারা গেছেন, তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। সুনামগঞ্জ থেকে তরুণরা অবৈধপথে ইউরোপে যাচ্ছে—এর দুটি প্রধান কারণ আছে। প্রথমত, এখানে একটি সক্রিয় দালাল চক্র কাজ করে। তারা সঠিক তথ্য না দিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখায়। পথে কতটা বাধা, কতটা মৃত্যুঝুঁকি এবং পুরো বিষয়টি যে আসলে একটি ফাঁদ—সেটা তারা কখনো প্রকাশ করে না। দ্বিতীয়ত, সামাজিক অনুপ্রেরণা। আগে কেউ ইউরোপে গিয়ে সফল হয়েছে, বাড়ি—গাড়ি করেছে—এটা দেখে অনেকে উৎসাহিত হয়। অনেক সময় বাবা—মাও বলেন, ‘ও পারলে তুমি কেন পারবে না?’ কিন্তু তারা বুঝতে পারেন না যে নিজের সন্তানকে মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দিচ্ছেন। পাচারকারীরা এই প্রক্রিয়াকে ‘গেম’ বলে, কারণ এখানে জেতা অথবা হারার বিষয় থাকে। 

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: হারা মানেই কি মৃত্যু?
নাজমুস সাকিব: হ্যাঁ, হারা মানে মৃত্যু। কার কপালে কী আছে বলা কঠিন, কিন্তু অবৈধপথে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সীমান্ত পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘ফ্রন্টেক্স’ জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইতালি বা গ্রীসে প্রবেশকারীদের মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশিদের সংখ্যা সর্বোচ্চ।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বাংলাদেশ থেকে এই প্রবণতা বেশি কেন? বিশেষত সিলেট অঞ্চলে?
নাজমুস সাকিব: এই প্রবণতা আগে মাদারীপুর—শরীয়তপুর বেল্টে বেশি ছিল। এখন সুনামগঞ্জ ও সিলেটে ছড়িয়ে পড়ছে। মূল কারণ দালালদের দৌরাত্ম্য এবং সামাজিক—মনস্তাত্ত্বিক চাপ। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দালালরা শুরুতে কখনো ৩০—৩৫ লাখ টাকার কথা বলে না। প্রথমে ৫—১০ লাখ টাকায় শুরু করে। তারপর ‘গেমঘর’ ও লিবিয়ায় নিয়ে গিয়ে অত্যাচার—নির্যাতনের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে আরও টাকা আদায় করে। শেষ পর্যন্ত ৩৫—৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেগে যায়। আর রাবারের বোটে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া প্রায় অসম্ভব একটি ব্যাপার। যতদিন মানুষ বুঝবে না যে জীবনের চেয়ে অর্থের মূল্য কম, ততদিন এই ঝুঁকি থেকে ফেরানো কঠিন।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: নিখোঁজদের বিষয়ে সরকারিভাবে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?
নাজমুস সাকিব: মিশরে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রবাসী কল্যাণ সেন্টার (সিলেট) ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড (ঢাকা)—এর মাধ্যমে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বেঁচে ফেরা একজনের সাথে ইতোমধ্যে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হয়েছে। বাকিরা এখনও মিশরে পুলিশ হেফাজতে মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন, তাই সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হয় নি। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড জানিয়েছে, সুস্থ হলে সবাইকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। ভিসা—পাসপোর্ট জটিলতা থাকলে দূতাবাস সেটা সমন্বয় করবে।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সাগর পাড়ি দেওয়ার পথে কী কী বিপদের মুখোমুখি হতে হয়?
নাজমুস সাকিব: ভূমধ্যসাগরে মানবপাচারকারীরা সীমিত ধারণক্ষমতার রাবার বোটে দ্বিগুণ—তিনগুণ মানুষ তুলে দেয়। যাত্রার আগে ‘গেমঘরে’ ১৫ দিন থেকে দুই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়—সুবিধাজনক আবহাওয়া ও কম টহলের সুযোগের জন্য। এই সময়ে খাবার সীমিত রেখে তাদের নিস্তেজ করা হয়।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, গেমঘরে মাফিয়ারা অমানুষিক নির্যাতন করে এবং সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে আরও অর্থ আদায় করে। পরিবার কাঁদতে কাঁদতে ধার—দেনা করে টাকা পাঠায়। তারপর ‘গেম’ শুরু হয়—সে বাঁচবে কি মরবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাই বারবারই বলব—জীবনের চেয়ে টাকার মূল্য বেশি নয়।

 


দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের আয়োজনে যুক্ত হওয়ার জন্য। আর অভিভাবক ও তরুণদের উদ্দেশ্যে আমাদের একটাই বার্তা—আগে জীবন, তারপর অর্থ। রঙিন প্রলোভনে পড়ে সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবেন না। যে স্বপ্ন আপনাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, সেই স্বপ্ন দেখার কোনো প্রয়োজন নেই। এ ধরনের ডেঞ্জার গেম ও অবৈধ পথ থেকে সবাইকে দূরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন


সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার