প্রকাশিত: ০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০০:২৯
এসএসসি ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ
সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় ফলাফলের ব্যাপক ধস নেমেছে। কোথাও পাসের হার ৯৮ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৫ শতাংশে, কোথাও আবার ৬০ শতাংশ থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশের ঘরে। সোমবার সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় জেলার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা এই ফলাফল বিপর্যয়ের নানা কারণ তুলে ধরেন এবং উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
সভায় উপস্থিত শিক্ষকরা মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, অভিভাবকদের অসচেতনতা ও অসহযোগিতা, প্রাইভেট কোচিংমুখী প্রবণতা এবং রাজনৈতিক—সামাজিক অস্থিরতাকে ফলাফল বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। পাশাপাশি অতিরিক্ত ক্লাস, নিয়মিত হোম ভিজিট, কঠোর ভর্তি ও প্রমোশন নীতি এবং অভিভাবক সচেতনতামূলক সভার মাধ্যমে পরিস্থিতি উত্তরণের পরিকল্পনার কথা জানান তাঁরা।
‘সুনামগঞ্জ জেলার প্রতিষ্ঠান প্রধানগণের সাথে এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬ এর ফলাফল পর্যালোচনা, ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক ওই সভায় সভাপতিত্ব করেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেটের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. শহীদ উল আলম। সভায় বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একে একে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ ব্যাখ্যা করেন।
আনুজানি জনকল্যাণ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জানান, তাঁদের বিদ্যালয়ের ৭০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২৭ জন উত্তীর্ণ হয়েছে, কোনো জিপিএ—৫ নেই। তিনি বলেন, গত ৫ আগস্টের পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উপস্থিত না থাকা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের কারণে শ্রেণিকক্ষে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখা যায়নি, ফলে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে মনোযোগী ছিল না। উত্তরণের উপায় হিসেবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, ছুটির পর নিবিড় পাঠদান এবং অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা সভার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
হায়দারপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইনামুল হক বলেন, গত বছর তাঁদের বিদ্যালয়ে পাসের হার ছিল ৯৮ শতাংশ, এবার ৪০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন মাত্র ৬ জন, পাসের হার ১৫ শতাংশ। তিনি জানান, শিক্ষকদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়েও অনেক শিক্ষার্থীকে পড়াশোনায় মনোযোগী পাওয়া যায়নি; রাতে হোম ভিজিটে গিয়ে ছেলেদের রাস্তায় আর মেয়েদের টিভি দেখতে বা আড্ডায় পাওয়া গেছে, প্রায় প্রত্যেকের কাছে মোবাইল ফোন ছিল। মোবাইল ফোন ব্যবহার রোধে চেষ্টা করেও অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে পুরোপুরি সফল হওয়া যায়নি বলে জানান তিনি। ইতোমধ্যে অকৃতকার্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে তিনটি বৈঠক করা হলেও ৯১ জনের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন অভিভাবক উপস্থিত হয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
আলহাজ্ব জমিলুন নূর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, গত বছর তাঁদের পাসের হার ছিল ৬১ শতাংশ, এবার তা নেমে এসেছে ২৫.৭৭ শতাংশে। উত্তরণের উপায় হিসেবে দশম শ্রেণির ১০৭ জন শিক্ষার্থীকে ১২ জন শিক্ষকের মধ্যে ভাগ করে দায়িত্ব বণ্টন এবং মেধা অনুযায়ী পৃথক ক্লাসের ব্যবস্থার কথা জানান তিনি।
চরমল্লা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাঁর ৩৩ বছরের শিক্ষকতা জীবন, নিজের কিছুটা দায় স্বীকার করে বলেন, ৭ আগস্ট আয়োজিত অভিভাবক সভায় বিশেষ ক্লাসের নির্দেশনা দিতে গেলে কিছু অভিভাবক ও শিক্ষার্থী দল বেঁধে বাধা দেন, ফলে অতিরিক্ত ক্লাস চালু করা যায়নি। তিনি মোবাইল ফোনের অপব্যবহারকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বলেন, বেতন দিতে না পারলেও শিক্ষার্থীদের কাছে দামি মোবাইল ফোন থাকে। এছাড়া প্রাইভেট কোচিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের ক্লাস ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা এবং অভিভাবকদের অসচেতনতাকেও তিনি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, তাঁর বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা আগের ১২০০ থেকে কমে সাড়ে চারশতে নেমেছে, আর অভিভাবক সভায় ডাকলেও উপস্থিতি থাকে সামান্যই।
উত্তরণের উপায় হিসেবে তিনি জানান, ভর্তির সময় থেকেই কঠোর নিয়ম কার্যকর করা হবে, টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হবে না, গত ১৬ তারিখ থেকে সকাল ৯টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিশেষ ক্লাস চালু করা হয়েছে এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনে রাতেও হোম ভিজিটের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
লামাটুকেরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রুহুল আমিন ভূইয়া বলেন, জগন্নাথপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এবং অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে এবারের ব্যাচ দুর্বল ছিল। তিনি জানান, টেস্ট পরীক্ষায় ৪২ জন শিক্ষার্থী ফেল করার পর চিঠি ও ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বেশিরভাগ অভিভাবকের সাড়া মেলেনি। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ফেল করা শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। মোবাইল ফোনের ব্যবহার করোনাকালীন অনলাইন ক্লাস এবং পরবর্তী আন্দোলনের সময় পড়াশোনা বন্ধ থাকার সুযোগে আরও বেড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও জানান, আগামী থেকে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে কাউকে চূড়ান্ত পরীক্ষায় বসতে দেওয়া হবে না এবং নিচু শ্রেণিতে কোনো অভিভাবকের সুপারিশে প্রমোশন দেওয়া হবে না, সুপারিশ নিয়ে এলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাহজালাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জানান, টেস্ট পরীক্ষার পর অভিভাবকরা যেকোনো উপায়ে সন্তানের ফরম পূরণের জন্য চাপ দেন, কিন্তু ফরম পূরণের পর তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কোচিং ক্লাসে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের ফোন করেও অনেক সময় ফোন বন্ধ পাওয়া যায় বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, এবার সিদ্ধান্ত হয়েছে টেস্ট পরীক্ষায় আটকে গেলে কোনো অবস্থাতেই সুযোগ দেওয়া হবে না। নিয়মিত হোম ভিজিট শুরু করা হয়েছে এবং তিনটি অভিভাবক সভা ডাকা হলেও উপস্থিতি ছিল যথাক্রমে ৩ জন, ২৭ জন এবং একটি সভায় কেউই আসেননি বলে জানান তিনি। এ পরিস্থিতিতে দিকনির্দেশনা চেয়ে তিনি সভায় অনুরোধ জানান।
গিলাছড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক জানান, গত বছর তাঁদের ফলাফল ৮০ শতাংশের বেশি থাকলেও এবার তা ২৮.২৮ শতাংশে নেমেছে। তিনি পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তন, প্রতিকূল পরিবেশ এবং মানবিক বিভাগে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়াকে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে মতবিনিময়ের কথা জানান তিনি।
হাজী কনু মিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের প্রধান শিক্ষক জানান, গত বছর তাঁদের ফলাফল ছিল ৬০.২৩ শতাংশ (২টি জিপিএ—৫সহ), এবার তা নেমে এসেছে ৩৩.২১ শতাংশে (১টি জিপিএ—৫)। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতিই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রাইভেট পড়ার অজুহাতে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার প্রবণতা রোধে সকালে প্রাইভেট বন্ধ রেখে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তাঁর বিরুদ্ধে মিছিল ও প্রধান শিক্ষকের অপসারণের দাবি উঠে বলে জানান তিনি। বিষয়টি সমাধানে ইউএনওর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও একাডেমিক সুপারভাইজারকে বিষয়টি নিয়ে বিদ্যালয় পরিদর্শনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন