মাদক নির্মূলে তরুণদের প্রতিরোধ: ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগেই স্থায়ী সমাধান

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:৫৪

‎‎সুনামগঞ্জ শহরে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রশাসনের অভিযানের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলছেন একদল তরুণ। বিভিন্ন মহল্লায় সংগঠিত হয়ে মাদকবিরোধী সচেতনতা তৈরি, মাদক বিক্রির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছেন তারা। দীর্ঘদিনের এমন কার্যক্রমে পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় মাদকের আগ্রাসন আগের তুলনায় কমেছে বলে দাবি করেছেন মাদক বিরোধী আন্দোলনের সংগঠক আবদুল্লাহ আল মামুন।‎

 


‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের বিশেষ আয়োজন ‘খবরনামা’য় সুনামগঞ্জ শহরের মাদক পরিস্থিতি, তরুণদের সামাজিক প্রতিরোধ, মাদক ব্যবসায়ীদের প্রভাব, প্রশাসনের ভূমিকা এবং মাদক নির্মূলে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।

 


‎‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জ শহরের পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন। বর্তমানে ওই এলাকার মাদক পরিস্থিতি কেমন? আগের তুলনায় কি কোনো পরিবর্তন এসেছে?

‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: আমাদের এলাকায় উইনার ক্লাবের মাধ্যমে ২০২০ সাল থেকে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে বড়পাড়া উন্নয়ন কমিটি ও প্রত্যয় যুবসংঘ এ কাজে যুক্ত হয়। সম্মিলিতভাবে কাজ করার ফলে বড়পাড়া, মুকামবাড়িসহ আশপাশের এলাকায় মাদকের আগ্রাসন আগের তুলনায় অনেকটাই কমেছে। তবে এখনো পুরোপুরি নির্মূল হয়নি।‎

 


‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে কোনো এলাকায় ইতিবাচক পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে?
‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: বড়পাড়া—মুকামবাড়ি এলাকায় আগে নদীর পাড়ের নিচে মাদক বিক্রি ও সেবনের স্থান তৈরি হয়েছিল। এমনকি সিঁড়ির নিচেও মাদক সেবনের জায়গা করা হয়েছিল। প্রত্যয় যুবসংঘসহ তরুণদের উদ্যোগে সেখানে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়। এখন ওই এলাকায় মাদকের পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

 


‎‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনাদের এই উদ্যোগকে স্থানীয় মানুষ কীভাবে দেখছেন? তারা কি সহযোগিতা করছেন?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: এলাকার মুরব্বি ও সিনিয়র ব্যক্তিরা আমাদের কাজকে প্রশংসা করেন। তাদের সহযোগিতা ও সমর্থনের কারণেই আমরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে পারছি।‎

 


‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তাহলে কি বলা যায়, ওই এলাকায় মাদক বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: না, পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। আগের তুলনায় কমেছে। তবে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা সম্ভব হয় নি। কারণ মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে অনেকেই প্রভাবশালী। অনেকে মাদক ব্যবসা করলেও তাদের সম্পৃক্ততা প্রকাশ্যে বোঝা যায় না।

 


‎‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনারা কাজ করতে গিয়ে কোন বয়সী মাদকসেবীদের বেশি দেখতে পাচ্ছেন?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: মাদকের ধরন অনুযায়ী বয়সের পার্থক্য রয়েছে। ইয়াবা সেবনকারীদের মধ্যে ১৫ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের বেশি দেখা যায়। আর গাঁজা সেবনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বয়সী মানুষ রয়েছে। ৫০ থেকে ৬০ বছর এমনকি ৭০ থেকে ৮০ বছর বয়সী ব্যক্তিকেও গাঁজা সেবন করতে দেখা যায়।‎

 


‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: মাদকবিরোধী কার্যক্রম করতে গিয়ে আপনাদের ওপর কোনো চাপ বা ভয়ভীতি এসেছে কি?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: সরাসরি কোনো চাপ নেই। তবে যারা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা আমাদের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত। আমাদের কারণে তারা আগের মতো সহজে ব্যবসা করতে পারছে না। তাদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি কোনো সংঘাত বা বাকবিতণ্ডা হয়নি।

 


‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: আপনি ব্যক্তিগতভাবে কবে থেকে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছেন?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: আমি ব্যক্তিগতভাবে ২০১৪ সাল থেকে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করছি। তখন আমার ‘যাত্রী ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন ছিল। এলাকায় একজন মাদকসেবীর করুণ পরিণতি দেখে আমি মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। পরে খেলাধুলার দল ‘যাত্রী টিম’—এর জার্সিতেও মাদকবিরোধী বিভিন্ন স্লোগান ব্যবহার করতাম। বিভিন্ন জায়গায় খেলতে গিয়ে মানুষ এসব স্লোগান দেখত। সেখান থেকেও আমি আরও কাজ করার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।

 


‎‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: দীর্ঘদিন কাজ করার পর আপনার চোখে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: আমার হিসাবে প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবর্তন এসেছে। তবে এখনো ৪০ শতাংশ সমস্যা রয়েছে। মাদকের সঙ্গে প্রভাবশালী চক্র জড়িত থাকায় পুরোপুরি নির্মূল করা কঠিন হচ্ছে। তবে সবাই একসঙ্গে কাজ করলে পরিস্থিতি আরও ভালো করা সম্ভব।

 


‎‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: মাদক নির্মূলে অভিভাবকদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: অভিভাবকদের অবশ্যই সন্তানদের খেঁাজখবর রাখতে হবে। একটি পরিবার যদি সন্তানের প্রতি যথাযথ নজর না রাখে, তাহলে সে মাদকের দিকে ঝুঁকতে পারে। একটি সন্তান মাদকাসক্ত হলে শুধু তার পরিবার নয়, পুরো সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।‎

 


‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষকে কি একই প্ল্যাটফর্মে এনে কাজ করা সম্ভব?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: অবশ্যই সম্ভব। মাদকবিরোধী ঐক্য পরিষদ, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষ সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কেউ একা মাদক নির্মূল করতে পারবে না। সম্মিলিতভাবে কাজ করলে বর্তমান ৬০ শতাংশ পরিবর্তনকে আরও অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

 


‎‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: মাদকসেবী বা ব্যবসায়ীদের আটক করার পর তারা আবার একই কাজে ফিরে আসার বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: আমরা দেখি, মাদকসেবী বা ব্যবসায়ীদের পুলিশ আটক করে কিংবা প্রশাসনের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনা হয়। কিন্তু অনেক সময় তারা এক—দুই দিন পর আবার বের হয়ে একই ব্যবসা বা কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এ কারণে শুধু অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে তুলতে হবে।

 


‎‎দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: তাহলে মাদক নির্মূলে এখন সবচেয়ে জরুরি কী?
‎‎আব্দুল্লাহ আল মামুন: প্রশাসন, মাদকবিরোধী সংগঠন, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। সঠিকভাবে নির্বাচন করে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে সুনামগঞ্জ শহরকে মাদকমুক্ত করার পথে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সম্পাদক মণ্ডলীর উপদেষ্টা : স্বপন কুমার দেব, কুমার সৌরভ

সম্পাদক ও প্রকাশক : পঙ্কজ কান্তি দে

অনলাইন সম্পাদক : মাহবুবুল হাছান শাহীন

সম্পাদক কর্তৃক অক্ষর মুদ্রণ অফসেট প্রেস, জোয়াহের রাজা ট্রেড সেন্টার, পুরাতন বাসস্টেশন, সুনামগঞ্জ।

মোবাইল : ০১৭১৮৩৪৫৯৭৫

বিজ্ঞাপন : ০১৩২৫৪৬২৪৯৫

ই-মেইল : [email protected]

সুনামগঞ্জের খবর পরিবার