প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৬
জাতীয় সংসদের হুইপ ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) মো. জি কে গউছ এমপি বলেছেন, বিএনপির কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি আর মাঠে থাকবে না। কাউন্সিলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়—এই নীতিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। সোমবার বিকেলে সুনামগঞ্জ পৌর শহরের একটি রেস্তোরাঁয় সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জি কে গউছ বলেন, খালেদা জিয়া দলের জন্য অনেক কষ্ট করেছেন, ত্যাগ স্বীকার করেছেন, কারাবরণ করেছেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি সরকারের কাছে মাথা নত করেননি। আজ তাঁর দলের জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাঁর সন্তান রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু এই শুভক্ষণে তিনি আমাদের মধ্যে নেই। আমরা সবাই খালেদা জিয়ার ত্যাগকে হৃদয়ে ধারণ করব।
তিনি বলেন, তারেক রহমানের চলাফেরা, কথাবার্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন লক্ষ্য করতে হবে। বিভিন্ন শ্রেণি—পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বললে তাঁর জনপ্রিয়তার বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তাঁর দাবি, বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা তারেক রহমান এবং তাঁর কর্মের মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি—পেশার মানুষের হৃদয় জয় করেছেন।
দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে জি কে গউছ বলেন, ‘তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা আমাদের ধরে রাখতে হবে। তাহলে কোনো চক্রান্ত—ষড়যন্ত্র আমাদের রুখতে পারবে না। এজন্য নিজেদের মধ্যে বিভেদ কমিয়ে আনতে হবে।’
তিনি জানান, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম ও কাউন্সিল শুরু হবে। ইউনিয়ন পর্যায়ের কাউন্সিল শেষ হলে উপজেলা এবং পরবর্তী ধাপে জেলা পর্যায়ে সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
জি কে গউছ বলেন, মাঠের ত্যাগী কর্মীদের কাছে যার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, কাউন্সিলের মাধ্যমে ভোট দিয়ে সেই নেতাকেই নির্বাচিত করতে হবে। দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত প্রভাব বা একতরফা সিদ্ধান্তের সুযোগ থাকবে না।
আহ্বায়ক কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো সুনামগঞ্জেও কোনো আহ্বায়ক কাউন্সিলে অংশ নিতে পারবেন না। আহ্বায়কদের দায়িত্ব হবে সম্মেলনের মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত করা, তারা নিজেরা কাউন্সিলে প্রার্থী হতে পারবেন না।
অঙ্গসংগঠনগুলোর মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির বিষয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে বিভিন্ন তথ্য—উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কোনো মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি আর মাঠে থাকবে না। নতুন নেতৃত্ব সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হবে—এটাই দলের প্রধানের বার্তা।
আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে জি কে গউছ বলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে। তবে স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে স্থানীয় প্রতীকে একক প্রার্থীকে দলীয়ভাবে সমর্থন দেওয়া হবে। একাধিক প্রার্থী থাকলে আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, যিনি দলীয় সমর্থন পাবেন, তাঁর পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে— ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। এটিই হবে দলের প্রতি আনুগত্যের প্রকৃত প্রকাশ।
প্রশাসনের সঙ্গে নেতাকর্মীদের আচরণ নিয়েও কঠোর সতর্কবার্তা দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, প্রশাসন আওয়ামী লীগের প্রশাসন নয়। কোনো নেতাকর্মী ইউএনও, ওসি, ডিসি বা এসপির কার্যালয়ে গিয়ে নিজের দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে অন্যায় সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করলে বিএনপি তার দায় নেবে না।
তিনি আরও বলেন, আপনি যতই ত্যাগী বা নির্যাতিত কর্মী হোন না কেন, ব্যক্তিগত অন্যায়ের দায় বিএনপি বহন করবে না, রাষ্ট্রও বহন করবে না। প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা অন্যায় করলে সেটি দেখার জন্য তাঁদের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা রয়েছেন। আমরা প্রয়োজনে তাঁদের শরণাপন্ন হব। কিন্তু অন্যায়ভাবে প্রশাসনের উপর প্রভাব বিস্তার করে বিএনপি করা যাবে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ টেনে জি কে গউছ বলেন, অতীতে ক্ষমতাসীনদের অন্যায়ের কারণে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। একইভাবে প্রশাসন থেকেও তাদের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছিল। ফলে সরকারি অফিস পাহারা দেওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। বিএনপি এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি চায় না।
তিনি বলেন, কোনো এমপি কিংবা সাধারণ কর্মী—কারও জন্যই প্রশাসনের উপর অন্যায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। দলের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে একই নিয়ম মেনে চলতে হবে।
মতবিনিময় সভার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য একটাই—কাউন্সিলের মাধ্যমে জেলা কমিটি পুনর্গঠন করা। এই প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব তা শেষ করা দলের জন্য মঙ্গলজনক।
নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জি কে গউছ বলেন, কেউ যেন নিজেকে দলের চেয়ে বড় মনে না করেন। যারা নিজেদের দলীয় সিদ্ধান্তের উর্ধ্বে মনে করেছেন, তাদের পরিণতি সবাই দেখেছেন। বিএনপির কোনো সহকর্মীর এমন পরিণতি তারা চান না।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ—সাংগঠনিক সম্পাদক (সিলেট বিভাগ) মিফতাহ সিদ্দিকী, সুনামগঞ্জ—৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ—৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, সুনামগঞ্জ—১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সুনামগঞ্জ—৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। সঞ্চালনা করেন জেলা বিএনপির সদস্য (স্বাক্ষর ক্ষমতাপ্রাপ্ত) অ্যাডভোকেট আব্দুল হক।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন