প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:০৭
শিশুদের শুদ্ধ ও দেশজ সংস্কৃতিচর্চায় যুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে হয়েছিল যাত্রা। দেশের গন্ডি পেরিয়েও সুনাম কুড়িয়েছে সংগঠনটি
শিশু-কিশোরদের শুদ্ধ ও দেশজ সংস্কৃতিচর্চায় যুক্ত করে দক্ষ ও পরিশীলিত শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করেছিল ‘স্পন্দন সাংস্কৃতিক সংস্থা ও শিশু সংগঠন’। হাঁটি হাঁটি পা পা করে সেই পথচলার তিন দশক পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে সংগঠনটি শুধু সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেই নয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নিজেদের স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছে। ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকাল ৫টায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাছন রাজা মিলনায়তনে আয়োজন করা হয়েছে বর্ষপূর্তি উৎসব ও বর্ণিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুল। সভাপতিত্ব করবেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন, সিলেটে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার শ্রী অনিরুদ্ধ দাস এবং সিলেটে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনের সেকেন্ড সেক্রেটারি শ্রী রাজেশ ভাটিয়া। সংগঠনের সভাপতি রুনা শাহীন আরা লেইছ ও সাধারণ সম্পাদক শ্রাবন্তী পুরকায়স্থ বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই আনন্দঘন অনুষ্ঠানে সুনামগঞ্জের সব সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষকে সপরিবারে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
যেভাবে শুরু ‘স্পন্দনের’ পথচলা
১৯৯৬ সাল। সুনামগঞ্জে জেলা শিল্পকলা একাডেমির নিয়মিত ক্লাসের কার্যক্রম অনেকটাই স্থিমিত হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় শিশুদের সংগীত শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন শহরের কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী। সেই উপলব্ধি থেকেই সংস্কৃতিকর্মী অলক ঘোষ চৌধুরী, দেবেশ কুমার শর্মা চৌধুরী, অঞ্জন, দেবদাস চৌধুরী, অলক চক্রবর্তী বাপ্পা, নীলেন্দু ভট্টাচার্য, অজন্তা ঘোষ চৌধুরী, তুলিকা ঘোষ চৌধুরীসহ কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মীর উদ্যোগ ও আলোচনার মধ্য দিয়ে ১৯৯৬ সালের ৭ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘স্পন্দন সাংস্কৃতিক সংস্থা ও শিশু সংগঠন’। সংগঠনের মূল লক্ষ্য ছিল নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের শুদ্ধ ও দেশজ সংস্কৃতিচর্চায় যুক্ত করা, তাদের দক্ষ ও পরিশীলিত শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলা এবং সাংস্কৃতিক চর্চাকে আরও বেগবান করা। প্রতিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই, ১৯৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর, সংগঠনের পরিচালনায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘স্পন্দন সঙ্গীত বিদ্যালয়’। প্রাজ্ঞ ও অভিজ্ঞ সংগীতজ্ঞদের নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এখান থেকে অসংখ্য তরুণ শিল্পী তৈরি হয়েছেন। তাদের অনেকেই বর্তমানে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষতার সঙ্গে অবদান রাখছেন। কেউ কেউ দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও সুনাম অর্জন করেছেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন অলক চক্রবর্তী বাপ্পা এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন নীলেন্দু ভট্টাচার্য। তিন দশক পর বর্তমানে সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন রুনা শাহীন আরা লেইস এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন শ্রাবন্তী পুরকায়স্থ।
‘স্পন্দন সঙ্গীত বিদ্যালয়’কে সমৃদ্ধ করতে বিভিন্ন সময় প্রদীপ কুমার চন্দ্র, দেবদাস শৌধুরী, রূপশ্রী রায়, অজন্তা ঘোষ চৌধুরী, রুনা শাহীন আরা লেইস, অরূপ চৌধুরী, রাজ নারায়ণ দাস, তুলিকা ঘোষ চৌধুরী, সোমা সাহা, দীপায়ন চৌধুরী, সোহেল রানা, অলক ঘোষ চৌধুরী, অনন্যা অগ্নিমল্লিক, বাবুল আচার্য্য, সৌরভ দাস, সুনয়না শ্যাম, অমিত বর্মন, দূর্বা শ্যাম পিরা, মাকসুদুন রহমান দীপু, সুবীর বণিক, প্রিয়া পাল ও সুবর্ণা দাম ঝুমা প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিন দশকের পথচলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নিয়ে পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন স্পন্দনের বহু সদস্য। সংগঠনটির সফল ও পুরস্কারপ্রাপ্ত সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অপরাজিতা চক্রবর্তী সোমা, পারশিতা দেব তিন্নি, সুমনা চৌধুরী কেনা, দীপায়ন চৌধুরী চমন, আহসান জামিল আনাম, আতাউর রহমান আতাব, অরুনিমা দাম, অরিজিৎ ঘোষ চৌধুরী, পূর্বা দে, প্রিয়ন্তি দাস, শ্রেয়া চৌধুরী কুহু, শুভ্রা তালুকদার, অদিতি দাস তিথি, সুমনা তালুকদার রিম্পি, ফারজানা চৌধুরী সোমা, ডালি আলুকদার, দেবশ্রী আলুকদার, শুভ তালুকদার এবং সোহেল রানা।
.jpg)
১৯৯৭ ও ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কাছ থেকে জেলার শ্রেষ্ঠ শিশু সংগঠনের স্বীকৃতি লাভ করে স্পন্দন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও সংগঠনটি নিয়মিতভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। ২০০৩ সালের ১২ থেকে ২৩ জানুয়ারি ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গ সংস্কৃতি উৎসবে আমন্ত্রণ পেয়ে অংশ নেয় স্পন্দনের শিল্পীরা। এ সময় পশ্চিমবঙ্গের ১২টি জেলায় সংগীত পরিবেশন করেন তারা। এছাড়াও ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং, আসাম রাজ্যের শিলচর, গৌহাটি ও ধর্মনগর, ত্রিপুরার আগরতলা, পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান ও কলকাতায় বিভিন্ন বাংলা সংস্কৃতি ও সিলেটি উৎসবে অংশ নিয়ে প্রশংসা অর্জন করেন সংগঠনটির শিল্পীরা। বাংলাদেশ হাইকমিশন, আগরতলার আমন্ত্রণে পরপর তিনবার সংগীত উৎসবে অংশগ্রহণ করেও সুনাম বয়ে আনেন স্পন্দনের শিল্পীরা।
সংগঠন সূত্রে জানা যায়, শুধু শিল্পী তৈরিই নয়, দীর্ঘ পথচলায় স্পন্দনের উদ্যোগ ও কর্মীদের প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আরও কয়েকটি সংগঠনের জন্ম হয়েছে। তুলিকা ঘোষ চৌধুরী ও শ্রাবন্তী পুরকায়স্থের প্রচেষ্টায় গড়ে উঠে ‘নৃত্যাঙ্গন, সুনামগঞ্জ’। সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, এটি সুনামগঞ্জের প্রথম নৃত্য সংগঠন। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশে ও দেশের বাইরে নৃত্যচর্চা ও পরিবেশনার মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে নৃত্যাঙ্গন। এছাড়া বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার, পিপলস থিয়েটার ও বাংলাদেশ পথনাটক পরিষদের অন্তর্ভুক্ত ‘বন্ধন থিয়েটার, সুনামগঞ্জ’—এর সঙ্গেও স্পন্দনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিক যোগসূত্র রয়েছে। বন্ধন থিয়েটার বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সুনামগঞ্জের প্রথম ও একমাত্র পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ লাভকারী সংগঠন হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। তিন দশকে স্পন্দনের সঙ্গে যুক্ত অনেক শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এদের মধ্যে রয়েছেন প্রয়াত পাগল হাসান, আশিকুর রহমান আশিক, রাকিবা ইসলাম ঐশী, মুবিন আহমেদ, মোহন রায়, দ্বীপময় চৌধুরী ডিউক, পৃথা দে, পাণ্ডব চন্দ কানু, আলী আফসার সায়েন, মাকসুদুর রহমান দীপু, হাবিবুর রহমান সামির পল্লব ও অমিত বর্মন।
সংগঠনের সাবেক সভাপতি অলক চক্রবর্তী বাপ্পা জাতীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় সুরকার হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেছেন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দেবদাস চৌধুরী ও তুলিকা ঘোষ চৌধুরী ভারতের রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগ আয়োজিত সংগীতবিষয়ক কর্মশালায় এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত নৃত্য প্রশিক্ষকদের ধামাইল নৃত্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত হয়ে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের প্রভাষক ফারজিয়া হক ফারিন, জনপ্রিয় টকশো উপস্থাপক শারমীন চৌধুরী, জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সংগঠক ও আবৃত্তিকার রূপশ্রী চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে স্পন্দনের সাবেক সদস্য ছিলেন। সংগঠনের সাবেক সদস্য পরমা দেব, বন্যা, নাহিদ সুলতানা টুসি, সুমনা, আমার তিথি, জাফরিন চৌধুরী ইমা ও তনুশ্রী চক্রবর্তী টুসিসহ অনেকে বর্তমানে নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। সংগঠনের সাবেক সভাপতি দেবেশ কুমার শর্মা চৌধুরীর অবদানও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছে স্পন্দন পরিবার।
স্পন্দনের সহসভাপতি অলক ঘোষ চৌধুরীর স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে সংগঠনটির শুরুর দিনের নানা কথা। তিনি বলেন, জীবনে প্রথম শিশুদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল স্পন্দনের মাধ্যমে। শুরুতে এ বিষয়ে তেমন পূর্বঅভিজ্ঞতা না থাকলেও শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে করতে একধরনের ভালো লাগা তৈরি হয়। ১৯৯৮ সালে শিশুরা নিজেদের রচনায় একটি নৃত্যনাট্য করার বায়না ধরে। শিশুদের সেই আগ্রহ থেকেই অলক ঘোষ চৌধুরী ও দেবদাস চৌধুরী মিলে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকাহিনি নির্ভর নৃত্যনাট্য ‘শ্যামের বাঁশি’ তৈরি করেন। পরে ‘বৈশাখী’ ও ‘সোনালী সকাল’ নামে আরও দুটি নৃত্যনাট্য মঞ্চস্থ করে স্পন্দন।
অলক ঘোষ চৌধুরী বলেন, শিশুদের সৃজনশীল ভাবনাকে গুরুত্ব দেওয়াটাই ছিল তাদের অন্যতম লক্ষ্য। শিশুদের ভাবনাকে গুরুত্ব দিলে তাদের মধ্যে যে অসাধারণ সৃষ্টিশীলতা প্রকাশ পায়, ‘শ্যামের বাঁশি’ মঞ্চায়নের অভিজ্ঞতা তারই প্রমাণ। প্রথমবার নৃত্যনাট্য মঞ্চায়নের সেই আনন্দ আজও তাকে পুলকিত করে।
এবার ৩০ বছরের পথচলা, অর্জন ও সাফল্যের নানা স্মৃতি তুলে ধরতে বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত হবে একটি প্রামাণ্যচিত্র—‘স্পন্দনের সাতকাহন’। সংগঠনটির ভাষায়, এই তিন দশকের সাফল্য শুধু পুরস্কার বা মঞ্চ পরিবেশনার হিসাব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য শিশু, তরুণ শিল্পী, প্রশিক্ষক, অভিভাবক, সংস্কৃতিকর্মী ও শুভানুধ্যায়ী মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতা। যারা স্পন্দনের সঙ্গে পথচলা শুরু করে বর্তমানে জীবনের প্রয়োজনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে কিংবা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে আছেন, তাদেরও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছে সংগঠনটি। একই সঙ্গে যেসব সাবেক সদস্য ও সংস্কৃতিকর্মী ইতোমধ্যে প্রয়াত হয়েছেন, তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করা হয়েছে।
তিন দশক পেরিয়ে ৩১তম বছরে পা দিয়েছে স্পন্দন সাংস্কৃতিক সংস্থা ও শিশু সংগঠন। দীর্ঘ এই পথচলায় প্রাপ্তি ও সাফল্যের পাশাপাশি সংগঠনটির সামনে রয়েছে নতুন প্রজন্মকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার আরও বড় দায়িত্ব। সেজন্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, সুনামগঞ্জের মানুষের ভালোবাসা, আস্থা ও সহযোগিতাই তাদের দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় শক্তি। ভবিষ্যতেও এই ভালোবাসা ও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে- এমন প্রত্যাশা তাদের। জানালেন, প্রত্যয়-লক্ষ্য স্থির থাকবে, সাংস্কৃতিক চর্চার প্রয়াসও অটুট থাকবে। আগামী প্রজন্মের শিল্পীরা একদিন আরও মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে এবং সুনামগঞ্জের সংস্কৃতিকে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বমঞ্চে আরও পরিচিত করে তুলবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন