প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৯
আইনশৃঙ্খলা সভায় হুইপ জি কে গউছের কঠোর বার্তা
সুনামগঞ্জের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি বাড়াতে প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ও সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন জাতীয় সংসদের হুইপ মো. জি কে গউছ এমপি। একই সঙ্গে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা, নাশকতা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা ঠেকাতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পূজামণ্ডপগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, আনসার সদস্যদের রোটেশনের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন এবং রাতে মণ্ডপের নিরাপত্তা জোরদারের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন হুইপ।
সোমবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সুনামগঞ্জের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা, উন্নয়নমূলক ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সমন্বয়ের লক্ষ্যে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় হুইপ বলেন, ভিন্ন মত ও ভিন্ন পথের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে চলাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তবে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কেউ দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করলে তার দায় সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে। জনগণের দুর্ভোগ বাড়ায়— এমন কোনো কর্মকাণ্ডকে দলীয় পরিচয়ের কারণে ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন।
তিনি প্রশাসনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে মূল্যায়ন না করে তার বর্তমান কর্মকাণ্ডকে গুরুত্ব দিতে হবে। ছাত্রজীবনে কে কোন রাজনৈতিক দল করতেন বা অতীতে মাঠে কার অবস্থান কী ছিল, সেটি বিবেচনায় না এনে বর্তমানে তিনি সরকারের মঙ্গল ও জনগণের কল্যাণে কাজ করছেন কি না, তা তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই প্রমাণিত হবে।
এসময় আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা যাতে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন হুইপ জি কে গউছ। তিনি বলেন, দুর্গাপূজাকে কোনো পক্ষ যেন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বা দেশকে অস্থিতিশীল করার কাজে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ প্রশাসনকে চোখ—কান খোলা রেখে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি না করার উপরও গুরুত্ব দেন তিনি। হিন্দু বৌদ্ধ কল্যাণ পরিষদ ও হিন্দু বৌদ্ধ কল্যাণ ফ্রন্টকে একসঙ্গে বসে কাজ করার পরামর্শ দেন। প্রয়োজনে পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসককে পৃথকভাবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে সমন্বয় করার নির্দেশ দেন।
প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসি ক্যামেরা স্থাপন নিশ্চিত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, মণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ক্যামেরা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মণ্ডপ কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানিয়ে রেকর্ড রাখার পরামর্শ দেন তিনি। হুইপ আরও বলেন, কোনো মণ্ডপে সিসি ক্যামেরা না থাকলে এবং পরবর্তীতে সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তাই আগেই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালনকারী আনসার সদস্যদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু নির্দেশনা দেন হুইপ। তিনি বলেন, ডিউটির সময় যেন নামাজ বা খাবারের সময়ের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়। একদল সদস্য দায়িত্ব পালন করবে এবং অন্যদল নামাজ বা খাবারের বিরতিতে যাবে—এভাবে রোটেশনের মাধ্যমে দায়িত্ব পরিচালনার পরামর্শ দেন তিনি। নারী ও পুরুষ দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়েও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন তিনি। বিশেষ করে পূজামণ্ডপে নারীদের স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোন হারানোর মতো ঘটনা যাতে না ঘটে, সে বিষয়ে নজরদারি বাড়ানোর কথা বলেন।
রাতের নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে হুইপ বলেন, দর্শনার্থীরা চলে যাওয়ার পর মণ্ডপগুলো যখন অনেকটা নির্জন হয়ে পড়ে, তখনই দুর্ঘটনা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। তাই রাতের দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যদের কোনোভাবেই দায়িত্বে শিথিলতা দেখানো যাবে না। পুলিশ নিয়মিত টহলে থাকবে এবং আনসার সদস্যরা যাতে কোনো বিপদে না পড়েন, সেদিকেও পুলিশকে নজর রাখতে হবে।
সরকারি কর্মকাণ্ডে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান হুইপ। তিনি বলেন, প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজেরা কোনো অনৈতিক কাজে জড়াবেন না এবং কাউকে অনৈতিক কাজ করার সুযোগও দেবেন না। সরকারি অর্থ যেন নির্ধারিত খাতেই ব্যয় হয়, সে বিষয়ে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে নজরদারি করার আহ্বান জানান তিনি।
শিক্ষার পরপরই স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য জেলা প্রশাসনকে নিয়মিত হাসপাতাল পরিদর্শনের পরামর্শ দেন তিনি। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দ থেকে মধ্যস্বত্বভোগীরা যাতে কোনো ধরনের সুবিধা নিতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে বলেন। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের সুবিধা যেন সাধারণ মানুষ সরাসরি পায়। কোনো মধ্যস্বত্বভোগী যেন এখান থেকে লাভবান না হতে পারে।
সরকারের বিভিন্ন উৎস থেকে আসা রাজস্ব যথাযথভাবে সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেন হুইপ। পৌরসভার হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত কর ও ফি যথাযথভাবে নেওয়া হচ্ছে কি না, তা দেখার পরামর্শ দেন তিনি।
পে—অর্ডারসহ বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গোপন বা অনিয়মিত লেনদেন হচ্ছে কি না, সেটিও নজরদারিতে রাখার কথা বলেন তিনি। তার মতে, ব্যক্তিগতভাবে কেউ সুবিধা নিয়ে চলে গেলেও অনিয়মের রাজনৈতিক দায় শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন দলের উপর পড়তে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর খবরদারি নয়, বরং তথ্য জানা ও সহযোগিতা করার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বর্ষাকালে মাছের পোনা অবমুক্তকরণ কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন হুইপ। তিনি বলেন, সরকারি অর্থে কেনা মাছের পোনা সঠিকভাবে অবমুক্ত করা হচ্ছে কি না, সেটি কীভাবে গণনা ও তদারকি করা হবে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তা জানতে হবে। একইভাবে খেলার মাঠের জন্য বরাদ্দ অর্থও প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করার পরামর্শ দেন তিনি। কোনো মাঠে বেশি অর্থের প্রয়োজন হতে পারে, আবার কোনো মাঠে কম—তাই সব মাঠে সমানভাবে অর্থ ব্যয় না করে প্রয়োজন অনুযায়ী বরাদ্দ ব্যবহারের কথা বলেন। সরকারের দেওয়া বরাদ্দের বিষয়টি জনগণকে জানিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
সুনামগঞ্জের বনভূমি রক্ষায় প্রশাসনকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন হুইপ। বন কেটে উজাড় করে দেওয়া এবং অবৈধভাবে গাছ কাটার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। বৈধ করাতকল থাকলেও সেখানে অবৈধ বা চোরাই গাছ কাটা যাবে না উল্লেখ করে তিনি নিয়মিত পরিদর্শনের পরামর্শ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের। বনভূমি ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রশাসনের নীরব থাকার সুযোগ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গরু, ছাগল ও কয়লা আনা—নেওয়া বন্ধে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন হুইপ। তিনি বলেন, অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চোরাচালানে জড়ালে আইনগত সহায়তা পাওয়া যাবে না—এ বার্তা সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। এ জন্য সীমান্তবর্তী এলাকায় উঠান বৈঠক চালু রাখা এবং স্কুল—কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে সচেতন করার পরামর্শ দেন তিনি। মাদক প্রতিরোধেও একই ধরনের জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানোর কথা বলেন।
তিনি বলেন, সীমান্তে চোরাচালানের সময় কেউ মারা গেলে তা শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সীমান্ত এলাকার মানুষকে অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে প্রশাসন, পুলিশ, বিজিবি ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে বলেও সভায় উল্লেখ করেন হুইপ। তিনি বলেন, সম্ভাব্য অপরাধ বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির বিষয়ে শুধু নিষিদ্ধ সংগঠন নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও নজরদারি প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, আমরা দিনের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি, রাতের ভোটে নির্বাচিত হইনি। তাই আমাদের জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা বেশি। কর্মকর্তা বা জনপ্রতিনিধি—সবাইকে সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় আইনশৃঙ্খলা ও জনস্বার্থ রক্ষা করতে পারলে দেশের সার্বিক চিত্র বদলে যাবে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন সুনামগঞ্জ—৫ আসনের সংসদ সদস্য কলিম উদ্দিন আহমেদ, সুনামগঞ্জ—৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম, সুনামগঞ্জ—৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ এবং সুনামগঞ্জ—১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল, জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মো. মিজানুর রহমান চৌধুরী, পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন, ২৮ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এ কে এম জাকারিয়া কাদির, স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক অসীম চন্দ্র বনিক, সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্বাবধায়ক ডা. আলী আশরাফ সোহাগ সহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের কল্যাণে নেওয়া বিভিন্ন কর্মসূচি দ্রুত ও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়। সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন, হুইপের দেওয়া নির্দেশনাগুলো ইতোমধ্যে সভার রেজুলেশনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং সরকারি দপ্তরগুলো এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে প্রতিপালন করবে। সরকারের ভাবমূর্তি যেন সর্বোচ্চ চূড়ায় আমরা পৌঁছাতে এবং এই সরকারকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সরকারে পরিণত করতে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকব।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন