প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:৩৬
তাহিরপুরে পারিবারিক কলহের জের ধরে তিন শিশুসন্তানকে বিষপান করানোর পর নিজেও বিষপান করেছেন এক মাদকাসক্ত পিতা। এতে তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাদের পিতা সরাফত আলীকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শনিবার ভোররাতে উপজেলার সীমান্তবর্তী রজনী লাইন গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুরা হলো— সরাফত আলীর মেয়ে মাওয়া আক্তার (১০), ছেলে শামিম মিয়া (৭) ও তামিম মিয়া (২)। হৃদয়বিদারক এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, প্রায় ১২ বছর আগে শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নের লাকমা গ্রামের ভুট্টো মিয়ার মেয়ে ফাতেমা বেগমের সঙ্গে রজনী লাইন গ্রামের সরাফত আলীর বিয়ে হয়। তাদের সংসারে এক মেয়ে ও দুই ছেলে সন্তান জন্ম নেয়। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে তিন বছর আগে ফাতেমা সৌদি আরবে যান। সেখানে থেকে তিনি স্বামীর কাছে ১০/১২ লাখ টাকা পাঠান। কিন্তু ফাতেমার পাঠানো টাকা সরাফত মাদক ও অনলাইন জুয়ায় ব্যয় করতেন। এ নিয়ে স্বামী—স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া—বিবাদ হতো। প্রায় দুই বছর পর দেশে ফিরে ফাতেমা সংসারের আর্থিক অবস্থার তেমন পরিবর্তন না দেখে স্বামীর সঙ্গে মনমালিন্য হয়। তিনদিন আগে ফাতেমা আবার সৌদি আরব যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঢাকায় যান। শনিবার রাত ২টার দিকে তিনি ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে রওনা হন। এদিকে রাত দুইটার দিকে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটান স্বামী সরাফত আলী। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহ, ক্ষোভ ও ক্ষণিক আক্রোশ থেকেই পিতা তার নিজের সন্তানদের বিষ খাইয়ে নিজে বিষপানের মতো এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। তবে বিস্তারিত কারণ তদন্তের পরই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
নিহতদের দাদি বলেন, সরাফত আলী প্রথমে তিন সন্তানকে লিচুর সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাওয়ান। পরে নিজেও বিষপান করেন। রাত আড়াইটার দিকে তিনি ঢাকায় স্বরুপা বেগম নামে এক ফুফুকে ফোন করে সন্তানদের বিষ খাওয়ানোর কথা জানান। পরে ওই ফুফু বাড়িতে বিষয়টি ফোনে জানালে তারা ঘরের দরজা খুলে তিন শিশুকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সকলকে উদ্ধার করে বাদাঘাট বাজারের একটি চিকিৎসাকেন্দ্র ও তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। চিকিৎসকরা ওখানে তিন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর অসুস্থ সরাফত আলীকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
শনিবার সকালে শিশুদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। একটি ঘর তালাবদ্ধ অবস্থায় ছিল। পরিবারের এক নারী জানান, ওই ঘরেই শিশুদের বিষপান করানো হয়েছে। পরে ঘরটি খোলা হলে ভেতরে বিষাক্ত পদার্থের গন্ধ পাওয়া যায়। ঘরের মেঝেতে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও লিচুর একটি খালি বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়।
দুপুরে তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফারুক আহমেদ ঘটনাস্থলে গিয়ে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম ও লিচুর বোতলসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করেন।
প্রতিবেশী রফিকুল ইসলাম বলেন, সরাফত আলী মাদক ও জুয়ায় আসক্ত ছিলেন। তার ঘরে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম রয়েছে। স্ত্রী বিদেশে চলে যাওয়ার পর তিনি সন্তানদের বিষপান করিয়ে নিজেও বিষপান করেছেন। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
শরাফতের চাচাতো ভাই ফজলু মিয়া জানান, তার ভাই মদ ও জুয়ায় আসক্ত। তিনি স্ত্রীর কষ্টার্জিত টাকা খরচ করে ফেলায় চরম অনিশ্চয়তা ও সংসারের অভাব অনটন দূর করতে দ্বিতীয়বারের মতো সৌদিআরবে গেছেন ফাতেমা বেগম।
প্রতিবেশী নূরজাহান আক্তার বলেন, ১৮ সেপ্টেম্বর শরাফত আলী বড়ছড়া বাজার থেকে পোল্টি্র মুরগি, পোলাওয়ের চাল কিনে এনে নিজ হাতে রান্না করে সন্তানদের নিয়ে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। রাত দুইটার দিকে ঢাকায় কর্মরত পোষাক কারখানার শ্রমিক শরাফতের বোন পাশের ঘরে ফোন দিয়ে বলেন, শরাফতের ঘরে কি হচ্ছে তা দেখতে। এর আগে ঢাকায় থাকা বোনকে ফোন দিয়ে শরাফত আলী জানান, তার তিন শিশু ও তাকে আর জীবিত পাওয়া যাবে না।
আয়না বিবি জানান, গভীর রাতে শরাফতের ঘর থেকে শিশুদের চিৎকারের শব্দ শুনে তারা ঘরে ঢুকে দেখেন তিন শিশু মেঝেতে নিস্তেজ পড়ে আছে। পাশেই শরাফত তীব্র বিষক্রিয়ায় ছটফট করছেন। পরে তাদেরকে উদ্ধার করে বাদাঘাট বাজারের গ্রাম্য চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে তিন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন ও শরাফত আলীকে চিকিৎসার জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপালে প্রেরণ করেন। সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ডাক্তার স্টমাক ওয়াশ করে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করেন।
রজনীলাইন গ্রামের শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রামে মদ, গাঁজা খাওয়ার প্রচলন থাকলেও এখন পুরো সীমান্ত জুড়ে ইয়াবার রমরমা ব্যবসা। উঠতি বয়সের কিশোর যুবকদের বেশ বড় একটি অংশ এখন অনলাইন জুয়া ও ইয়াবা সেবনে ঝুঁকেছে।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. নাসাদ আহমেদ বলেন, সকাল ৮টার দিকে তিন শিশুকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, তাদের বিষপান করানো হয়েছে। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
স্থানীয় চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া বলেন, ভোরে নিহত শিশুদের পরিবারের লোকজন তাকে বিষয়টি জানান। তাদের বাবা সন্তানদের বিষ খাইয়ে নিজেও বিষপান করেছেন। শিশুদের মা কয়েকদিন আগে বিদেশ থেকে এসে আবার চলে গেছেন।
তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ ফারুক আহমেদ বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহের জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘর থেকে ইয়াবা সেবনের সরঞ্জামসহ বিষ মেশানো লিচুর বোতল জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার বলেন, শুক্রবার রাত (১৯ সেপ্টেম্বর) ১টার দিকে আমাদের নিকট অত্যন্ত মর্মান্তিক খবর আসে। সংবাদ পাই যে, এক পিতা তার তিন শিশুসহ নিজে বিষপান করেছেন। খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তাদেরকে উদ্ধার করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। স্থানীয় হাসপাতালেই ৩ শিশুরই মৃত্যু হয়। শিশুদের পিতাকে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরবর্তীতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে দ্রুত সিলেট এম. এ. জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
তিনি বলেন, মৃত তিন শিশুর মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে এবং এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আমরা আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেব।
অভিযুক্ত ব্যক্তির স্ত্রী সম্প্রতি সৌদি আরবে গিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্ত্রীর বিদেশে যাওয়াকে কেন্দ্র করে স্বামী—স্ত্রীর মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরে পারিবারিক কলহ চলছিল, কারণ স্বামী এতে সম্মত ছিলেন না। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক কলহ, ক্ষোভ ও ক্ষণিক আক্রোশ থেকেই পিতা তার নিজের সন্তানদের বিষ খাইয়ে নিজে বিষপানের মতো এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটিয়েছেন। তবে বিস্তারিত কারণ তদন্তের পরই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয়ভাবে মাদকাসক্তির বিষয়ে যে গুঞ্জন রয়েছে, সে সম্পর্কিত কোনো সুনির্দিষ্ট বা নিশ্চিত তথ্য এখনো আমাদের হাতে পৌঁছায়নি। তবে আমাদের তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে, তদন্তে যদি মাদকাসক্তি বা অন্য কোনো বিষয়ের প্রমাণ মেলে, তবে সেই অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন