প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২০:০১
পর্যটনের অপার সম্ভাবনায় এগিয়ে সুনামগঞ্জ। টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক, নীলাদ্রি, যাদুকাটা নদী, বারেকের টিলা ও শিমুলবাগানসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে বাড়ছে পর্যটকের উপস্থিতি। তবে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, সড়কের স্থায়িত্ব এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবন—জীবিকা ও সংস্কৃতি রক্ষার বিষয়গুলোও সামনে এসেছে। এসব বিষয় নিয়ে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদ সংযোগ ‘খবরনামা’য় কথা বলেছেন এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক মি. এন্ড্রু জুয়েল সালমার। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: সুনামগঞ্জের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থার বর্তমান চিত্র কেমন?
আনোয়ার হোসেন: সুনামগঞ্জে পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়ছে। শহীদ সিরাজ লেক, বারেকের টিলা, যাদুকাটা নদী ও শিমুলবাগানসহ বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিদিন পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। সেই তুলনায় রাস্তাঘাট এখনও পর্যাপ্তভাবে উন্নত হয়নি। তাই পর্যটনকেন্দ্রগুলোর জন্য আলাদা আলাদা স্কিম নিয়ে প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা আরও উন্নত হবে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগ সহজ করতে এলজিইডির বড় কোনো প্রকল্প চলমান আছে কি?
আনোয়ার হোসেন: ধর্মপাশা, মধ্যনগর, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জকে নিয়ে উড়াল সড়ক প্রকল্পের কাজ চলমান আছে। এর মাধ্যমে বড় ও প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সীমান্ত সড়ক এবং যাদুকাটা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের কাজও পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: এবার আসি স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বিষয়ে। পর্যটনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কীভাবে দেখছেন?
এন্ড্রু জুয়েল সালমার: আমরা যারা আদিবাসী, তারা এখনও সরাসরি পর্যটনের সঙ্গে সেভাবে যুক্ত নই। কিছু পর্যটনকেন্দ্র আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার মধ্যে রয়েছে। যেমন রাজা ঝরনার এলাকায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। সেখানে পর্যটকদের জন্য কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না—এ বিষয়ে পর্যাপ্ত নির্দেশনা নেই। এ বিষয়ে প্রশাসনের আরও এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পর্যটকদের উপস্থিতিতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন ও সংস্কৃতিতে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে?
এন্ড্রু জুয়েল সালমার: প্রভাব পড়ছে। অনেক সময় স্থানীয় নারীরা গোসল করতে গেলে পর্যটকেরা তাদের ছবি তোলেন। এতে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হয়। স্থানীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও পর্যটনের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পর্যটন থেকে স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে কীভাবে উপকৃত হতে পারে?
এন্ড্রু জুয়েল সালমার: পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে টুরিস্ট গাইড হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে। পাশাপাশি তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা দরকার। এতে পর্যটকেরাও স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: বর্ষা শেষে পর্যটন এলাকার সড়কগুলোতে কী ধরনের সমস্যা দেখা দেয়?
আনোয়ার হোসেন: বর্ষা ও ফ্লাশ ফ্লাডের কারণে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মেঘালয়ের পাদদেশ থেকে হঠাৎ পানি নেমে আসাও সড়ক ক্ষতির একটি কারণ হতে পারে। বর্তমানে যেসব জায়গায় বেশি দুর্ভোগ হচ্ছে, সেখানে জরুরি ভিত্তিতে কিছু কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পর্যটন মৌসুমের আগে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সংস্কারে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয় কি?
আনোয়ার হোসেন: পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সারা দেশ থেকে পর্যটক আসেন। তাই এসব এলাকার সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা যেন বিচ্ছিন্ন না হয়, সেদিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজর দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়েও ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর মাধ্যমে জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখার কাজ করা হয়।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: প্রতিবছর সড়ক সংস্কারের পরও দ্রুত নষ্ট হওয়ার কারণ কী?
আনোয়ার হোসেন: এর পেছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। সুনামগঞ্জে বর্ষা দীর্ঘ হওয়া এবং মেঘালয় থেকে হঠাৎ পানি নেমে আসার কারণে ফ্লাশ ফ্লাড হয়। এতে সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পর্যটনকেন্দ্রিক উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
এন্ড্রু জুয়েল সালমার: যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে সড়ক প্রশস্ত হলে স্থানীয় মানুষের জমি বা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করার কথাও ভাবা হচ্ছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পর্যটনকেন্দ্রগুলোর যোগাযোগ উন্নয়নের কাজ কবে নাগাদ দৃশ্যমান হতে পারে?
আনোয়ার হোসেন: আগামী দুই অর্থবছরের মধ্যে চলমান কাজগুলো মোটামুটি শেষ করার আশা করছি। তবে সুনামগঞ্জে বছরে চার থেকে পাঁচ মাসের বেশি সময় কাজ করার মতো পরিবেশ থাকে না। বর্ষা ও ফ্লাশ ফ্লাডের কারণে নানা প্রতিকূলতা থাকে। এসবের মধ্যেই দুই সিজনের মধ্যে কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: পর্যটনকেন্দ্রগুলোর সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে তাৎক্ষণিকভাবে কী করা প্রয়োজন?
আনোয়ার হোসেন: যেসব সড়ক বর্তমানে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত, সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়েও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক চিহ্নিত করে জরুরি যোগাযোগ সচল রাখার কাজ করা হচ্ছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা করে সুনামগঞ্জে কীভাবে টেকসই পর্যটন গড়ে তোলা সম্ভব?
এন্ড্রু জুয়েল সালমার: বারেকের টিলায় একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র করা যেতে পারে। সেখানে সরকারি জায়গা রয়েছে। সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হলে পর্যটকেরা বিনোদনের সুযোগ পাবেন এবং স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের পরিচয় ও সংস্কৃতি তুলে ধরতে পারবেন। এর মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আমাদের সংস্কৃতি তুলে ধরা সম্ভব।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর: ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে এলজিইডির অবস্থান কী?
আনোয়ার হোসেন: এলজিইডি তৃণমূল পর্যায়ে মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজ করে। রাস্তা প্রশস্ত করার প্রয়োজন হলে সেটিও করা হয়। এতে কারও জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা আবেদন করতে পারেন। তাদের বিষয়টি বিবেচনা করে ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন