প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ২৩:৪৩
সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট, অ্যাম্বুলেন্স অচল, আলট্রাসনোগ্রাফি কার্যক্রম বন্ধসহ নানা সমস্যায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। ২৫০ শয্যার জনবল ও বরাদ্দ দিয়ে প্রতিদিন কয়েকগুণ বেশি রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে গণমাধ্যমকর্মীদের সহযোগিতা চেয়েছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আশরাফুল ইসলাম সোহাগ।
বৃহস্পতিবার দুপুরে হাসপাতালের মিলনায়তনে জেলা সদরে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এই সহযোগিতা চান। সভায় হাসপাতালের জনবল সংকট, চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা, রোগীর চাপ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, ১০০ শয্যার জনবল কাঠামো দিয়ে কার্যক্রম শুরু হলেও বর্তমানে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে সেবা দিতে হচ্ছে। বাস্তবে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৯০০ জনের বেশি রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এতে ওষুধ, পথ্য, চিকিৎসক ও অন্যান্য সুযোগ—সুবিধার সংকট দেখা দিচ্ছে।
সভায় তত্ত্বাবধায়ক ডা. আশরাফুল ইসলাম সোহাগ বলেন, একজন নাগরিকের পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া তার অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এজন্য জনবল বৃদ্ধি, ওষুধ ও পথ্যের বরাদ্দ বাড়ানোসহ কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অ্যাম্বুলেন্সের সমস্যা, হাসপাতালের লিফট, রোগী পরিবহনের জন্য র্যাম্প সিঁড়ি নির্মাণ এবং বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের বিষয়গুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করা হচ্ছে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় এসব সমস্যার সমাধানে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। এই ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকর্মীরা সমস্যাগুলো তুলে ধরলে সমাধানের উদ্যোগ আরও জোরালো হবে।
হাসপাতালের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, হাসপাতালকে কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, গণমাধ্যমকর্মী এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সহযোগিতা প্রয়োজন। সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্যদের সহযোগিতায় সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের ৪২১টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ২৫৫ জন। শূন্য রয়েছে ১৬৬টি পদ, যা মোট অনুমোদিত পদের ৩৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। চিকিৎসকের ৭৪টি পদের মধ্যে শূন্য ৪৯টি, অর্থাৎ প্রায় ৬৬ দশমিক ২২ শতাংশ। নার্সের ২৬৫টি পদের মধ্যে ৬৯টি শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের প্রায় ৮০ শতাংশ পদ শূন্য বলে জানানো হয়। হাসপাতালের কাজে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৬৪ জন এবং স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ২৮ জন যুক্ত রয়েছেন।
মতবিনিময় সভায় হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় বিভাগের ঘাটতি পূরণ করা জরুরি। তিনি বলেন, হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেবা চালু থাকলেও নেফ্রোলজি বিভাগ ও কিডনি বিশেষজ্ঞ না থাকায় জটিল রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ডায়ালাইসিস চলাকালে কোনো রোগীর জটিলতা দেখা দিলে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেটে পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে। এ জন্য ডায়ালাইসিস ইউনিটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সহায়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
মেডিকেল অফিসার ডা. নিশাত তাসনীমের উপস্থাপিত গত সেপ্টেম্বর মাসে স্বাস্থ্যসেবার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হাসপাতালের বহির্বিভাগে ২৫ হাজার ৮৯০ জন, জরুরি বিভাগে ১৪ হাজার ৯০ জন এবং অন্তর্বিভাগে ৫ হাজার ৪৬৯ জন রোগী সেবা নিয়েছেন। একই মাসে হাম আক্রান্ত ১ হাজার ১৩৮ জন, ডেঙ্গু আক্রান্ত ৩৪ জন এবং আইসিইউতে ৬৩ জন রোগী সেবা পেয়েছেন। এ ছাড়া এএনসি সেবা ৮৯৫ জন, এনসিডি সেবা ৩ হাজার ১৯৯ জন, স্কানু সেবা ৩৬ জন এবং নবজাতক সেবা ৫৬৬ জনকে দেওয়া হয়েছে।
উপস্থাপিত তথ্যে আরও বলা হয়, গত ১৩ অক্টোবর হাসপাতালে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ৭৫৭ জন। এর মধ্যে শিশু ওয়ার্ডে ১৮৯ জন, মহিলা মেডিসিন ও সার্জারি ওয়ার্ডে ১৩৫ জন, হাম ওয়ার্ডে ১২৩ জন এবং পুরুষ মেডিসিন ও সার্জারি ওয়ার্ডে ৮৯ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এছাড়া গাইনি ওয়ার্ডে ৭০ জন, ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ৬৩ জন, নবজাতক ওয়ার্ডে ৩৭ জন, কেবিন ব্লকে ৩৫ জন, আইসিইউতে ৯ জন, স্কানু ওয়ার্ডে ৬ জন এবং ডেঙ্গু ওয়ার্ডে ২ জন চিকিৎসাধীন ছিলেন।
সেপ্টেম্বর মাসে গাইনি ওয়ার্ডে ১ হাজার ২৬৭ জন রোগী ভর্তি হন। এ সময় ৩৫৭টি স্বাভাবিক প্রসব, ১০টি ব্রিচ ডেলিভারি, ৬৯টি সিজারিয়ান, লাইগেশন ৮টি এবং অন্যান্য ২টি অপারেশন সম্পন্ন হয়। একই মাসে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে ১৫৮টি বড় ও ৯৮টি ছোটসহ মোট ২৫৬টি অস্ত্রোপচার করা হয়। এছাড়া ৯৫০ জনের এক্স—রে, ২ হাজার ৫০০ জনের রক্ত পরীক্ষা এবং ৭৫ জন রোগীকে ডায়ালাইসিস সেবা দেওয়া হয়।
হাসপাতালে এক্স—রে মেশিন ও আইসিইউ সেবা সচল থাকলেও সনোলজিস্ট চিকিৎসক না থাকায় আলট্রাসনোগ্রাফি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স নষ্ট থাকায় জরুরি রোগী পরিবহনের এ সেবাটিও বর্তমানে বন্ধ বলে সভায় জানানো হয়। হাসপাতালের পাঁচটি ডায়ালাইসিস মেশিনের মধ্যে তিনটি সচল এবং দুটি অচল রয়েছে। ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস ইউনিটের অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও মেশিনের ঘাটতি রয়েছে। এসময় ভবিষ্যতে ডায়ালাইসিস ইউনিট পাঁচ শয্যা থেকে ১০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
সভায় হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা, জবাবদিহি এবং বিদ্যমান সংকটগুলো সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগের উপর গুরুত্বারোপ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, ১০ শয্যার আইসিইউ ও ১০ শয্যার স্কানু ইউনিট চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি এনসিডি কর্নারের কার্যক্রম চলছে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে হাসপাতাল চত্বরে বহুমুখী ভবন নির্মাণ, প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার পরিধি বৃদ্ধি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্ল্যান্ট স্থাপন, র্যাম্প সিঁড়ি নির্মাণ এবং কর্মীদের নিরাপত্তায় আনসার সদস্য নিয়োগ।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের অসহযোগিতা, জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালনের ঘাটতি, রোগীদের ওষুধ ও খাবারের সংকট এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা—নিরীক্ষার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়ানো এবং দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সাংবাদিকরা বলেন, অতিরিক্ত রোগীর চাপের বিপরীতে জনবল ও বরাদ্দের ঘাটতি যেমন রয়েছে, তেমনি সেবার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি। বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসা, হৃদ্রোগের পরীক্ষা এবং রোগী পরিবহনের ব্যবস্থা উন্নত করার উপর তারা গুরুত্ব দেন। জবাবে তত্ত্বাবধায়ক ডা. আশরাফুল ইসলাম সোহাগ বলেন, হাসপাতালের যেসব ক্ষেত্রে অনিয়ম ও অসংগতি রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত কর্মীদের মধ্যেও কেউ কেউ নিয়মবহির্ভূত কাজে জড়িত থাকলে তাদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিরাপত্তা জোরদারেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মতবিনিময় সভায় হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম, ডা. বিষ্ণু প্রসাদ চন্দ, ডা. জহর লাল দাস শিপলুসহ বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিৎসক ও জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
উপজেলার খবর থেকে আরো পড়ুন